অর্থকাগজ ডেস্ক ●
২ এপ্রিল ট্রাম্পের শুল্ক ঘোষণার পরবর্তী দুই দিনে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ার বাজারের সূচকগুলোর বড় পতন ঘটেছে। ব্যাপক দরপতনে মার্কিন শেয়ার বাজারের মূলধন ৫ লাখ কোটি ডলার কমেছে। ট্রাম্পের শুল্ক ঘোষণার পর থেকে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক ৬ শতাংশের বেশি কমেছে। একই অবস্থা নাসডাক ও ডাও জোন্সের মতো সূচকের। ২০২০ সালের পর এ ধরনের পরিস্থিতি দেখা যায়নি মার্কিন বাজারে।

ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক আরোপের জেরে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা পণ্যের দাম বেড়ে যাবে সেই আশঙ্কা আছে। এর জেরে মন্দা দেখা দিতে পারে মার্কিন অর্থনীতিতে। জেপি মর্গ্যানসহ একাধিক সংস্থা ইতিমধ্যে এমন আশঙ্কার কথা শুনিয়েছে। ফলে বিনিয়োগকারীরা একধরনের আতঙ্কে ভুগছেন। লোকসান এড়াতে তারা বাজার থেকে বিনিয়োগ সরিয়ে নিচ্ছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাল্টা শুল্কের প্রভাবে বৈশ্বিক শেয়ার বাজার নাস্তানাবুদ। ঈদের ছুটির কারণে লেনদেন বন্ধ থাকায় বাংলাদেশের শেয়ার বাজারে এখনো অবশ্য ট্রাম্পের শুল্কের ধাক্কা লাগেনি। লম্বা ছুটি শেষে ৬ এপ্রিল দেশের শেয়ার বাজারে খুলছে। তবে বিশ্ব শেয়ার বাজারের টালমাটাল অবস্থা দেখে দেশের শেয়ার বাজারের বিনিয়োগকারীরা উদ্বেগ-আতঙ্কে আছেন বলে জানান।

বাংলাদেশের বড় রফতানিবাজার যুক্তরাষ্ট্র। দেশ থেকে যত তৈরি পোশাক রফতানি হয়, তার প্রায় ১৮ শতাংশের গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র। পোশাক ছাড়া এই বাজারে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রফতানি চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের। সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে যুক্তরাষ্ট্রে ৬৬৩ কোটি মার্কিন ডলারের তৈরি পোশাক রফতানি করে বাংলাদেশ। আর চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি হয়েছিল প্রায় ২৮ কোটি ডলারের। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে হোমটেক্সটাইল, হিমায়িত মৎস্য, পাট ও পাটপণ্য, প্লাস্টিক পণ্যসহ আরও বেশ কিছু পণ্য রফতানি করে বাংলাদেশ। গত অর্থ বছরে সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশ প্রায় ৭৬০ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি করেছিল। যার বড় অংশই ছিল তৈরি পোশাক।

ট্রাম্পের পাল্টা শুল্কের কারণে বাংলাদেশের রফতানি যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তার ধাক্কা সবচেয়ে বেশি লাগবে পোশাক খাতে। এরপর চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যসহ অন্যান্য রফতানি খাতেও বড় প্রভাব পড়বে। পাল্টা শুল্কের কারণে দেশের রফতানি খাতে কী প্রভাব পড়ে, তা বুঝতে অবশ্য আরও কয়েক মাস লাগবে। কিন্তু তার আগেই এ নিয়ে শেয়ার বাজারের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। কারণ, দেশের রফতানি খাতের বেশ কিছু কোম্পানি শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত। তাই বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন, রফতানি কমলে তাতে এসব কোম্পানির আয়ও কমতে পারে। যার সরাসরি প্রভাব পড়বে কোম্পানির শেয়ারের দাম ও বছর শেষের লভ্যাংশে।

শেয়ার বাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন, ট্রাম্পের শুল্কের সরাসরি প্রভাব পড়ার আগেই মনস্তাত্ত্বিক চাপে বিশ্বজুড়ে শেয়ার বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিশ্বের বড় বড় শেয়ার বাজারের দরপতনের খবর প্রচারিত হচ্ছে। তাতে দেশের শেয়ার বাজারের বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। এ কারণে ঈদের ছুটির পর প্রথম কার্যদিবসে আজ রোববার দেশের শেয়ার বাজারে কী প্রভাব পড়ে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। বৈশ্বিক ও দেশীয় যেকোনো বড় ধরনের ঘটনায় শেয়ার বাজারের বিনিয়োগকারীদের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব দেখা যায়।

দেশের প্রধান রফতানি খাত বস্ত্র ও পোশাকের ৫৪টি কোম্পানি প্রধান শেয়ার বাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত। এর বাইরে যুক্তরাষ্ট্রে শীর্ষস্থানীয় জুতা রফতানিকারক কোম্পানি অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারসহ হিমায়িত মৎস্য, পাট ও পাটজাত পণ্য ও সিরামিক খাতের আরও কিছু তালিকাভুক্ত কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রফতানির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। এসব কোম্পানির কারণেই ট্রাম্পের শুল্ক নিয়ে উদ্বিগ্ন বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা থাকলেও দেশের শেয়ারবাজারে শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প শুল্কের উত্তাপ পড়বে কি না- এ নিয়ে সন্দিহান অনেকে। তারা বলছেন, ‘এমনিতেই আমাদের শেয়ার বাজারে দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে মন্দা বিরাজ করছে। তাতে ভালো মানের অনেক কোম্পানির শেয়ারের দামও অবমূল্যায়িত পর্যায়ে রয়েছে। এই অবস্থায় শেয়ার বাজারে বড় ধরনের দরপতনের আশঙ্কা কম। এ ছাড়া শেয়ার বাজারের মূল্যসূচকে রফতানি খাতের কোম্পানিগুলোর সমন্বিত প্রভাবও কম। এ কারণে পোশাক খাতসহ রফতানিসংশ্লিষ্ট কিছু কোম্পানির শেয়ারের দাম কমলেও অন্যান্য শেয়ারের দাম যদি ঊর্ধ্বমুখী থাকে, তাতে সূচকে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।

২০০৭-০৮ সালে বিশ্বজুড়ে যখন অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিয়েছিল, তখন দেশের শেয়ার বাজারে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। ওই সময় রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। বিশ্বজুড়ে মন্দার ওই সময়টাতেই দেশের শেয়ার বাজারে বড় ধরনের উত্থানের ভিত্তি তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে ২০১০ সালে শেয়ার বাজার ধসের মাধ্যমে সেই উত্থানের যবনিকা ঘটে। ২০০৭-০৮ সালের মন্দা যেখানে বিশ্ব অর্থনীতিকে কাবু করে ফেলেছিল, সেখানে ট্রাম্পের পাল্টা শুল্কের সিদ্ধান্ত প্রাথমিক ধাপ পেরোয়নি। ফলে রফতানিমুখী তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো আদৌ ক্ষতিগ্রস্ত হবে নাকি উল্টো লাভবান হবে, সেটি এখনো নিশ্চিত নয়। তাই রফতানিকারক কোম্পানির আয়ে এখনই শুল্কের কোনো প্রভাব পড়ার কথা নয়। তাই এ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের দুশ্চিন্তার যৌক্তিক কোনো কারণ নেই।

বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলো গত বছরের লভ্যাংশ ঘোষণা করতে শুরু করেছে। এরই মধ্যে কয়েকটি ব্যাংক লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, গত বছর ব্যাংকগুলো খুব ভালো মুনাফা করেছে। ফলে এ সময়ে এসে ব্যাংকের শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের বাড়তি আগ্রহ রয়েছে। এই আগ্রহ যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে ঈদ-পরবর্তী শেয়ারবাজারে নেতৃত্বের অবস্থানে থাকবে ব্যাংক খাতের শেয়ারগুলো। সেটি হলে সূচকে তার ইতিবাচক প্রভাবই দেখা যাবে।

বিশ্ব শেয়ার বাজারের দরপতনের প্রভাব দেশের বাজারে পড়বে কি না—এ নিয়ে ৫ এপ্রিল কথা হয় দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি ব্রোকারেজ হাউসের শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে। তারা বলেন, ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণার পর থেকে বিনিয়োগকারীরা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় আছেন। অনেকে ফোন করে নিজেদের করণীয় বিষয়েও জানতে চাইছেন। এ ছাড়া ঈদের ছুটির পর নতুন করে যারা বিনিয়োগে আসার ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন, তাদের সেই আগ্রহেও ভাটা পড়তে পারে। ●

অকা/পুঁবা/ফর/দুপুর/৬ এপ্রিল, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 11 months আগে

Leave A Reply

Exit mobile version