অমিত পাল
সাংবাদিকতা রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত। ক্ষমতার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, জনস্বার্থে তথ্য তুলে ধরা এবং সত্য অনুসন্ধানের মাধ্যমে জনগণকে সচেতন করাই এই পেশার মূল লক্ষ্য। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা দৃশ্যমান হয়েছে; সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে এক শ্রেণির ব্যক্তি নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন, সামাজিক হয়রানি, চরিত্রহনন এবং ডিজিটাল ব্ল্যাকমেইলের মতো কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে। এরা কি সত্যিই সাংবাদিক, নাকি তথ্য সন্ত্রাসী?
ধরা যাক, কোনো নাগরিক রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। আশপাশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি অভিযান চলছে। সন্দেহবশত তাঁকে থামিয়ে দেহ তল্লাশি করা হলো। তল্লাশিতে কিছুই পাওয়া গেল না। কিন্তু সেই সময় কয়েকজন ব্যক্তি সাংবাদিক পরিচয়ে তাঁর ভিডিও ধারণ শুরু করলেন, ফেসবুকে লাইভ করলেন, উসকানিমূলক প্রশ্ন করলেন এবং তাঁর আপত্তি সত্ত্বেও সেই দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করলেন। পরবর্তীতে সম্পাদিত বা খণ্ডিত ভিডিওর সঙ্গে মনগড়া বর্ণনা জুড়ে তাঁকে সন্দেহভাজন বা অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করা হলো।
আবার কোনো পার্কে বন্ধু বা সহকর্মীর সঙ্গে বসে থাকা একজন নারী বা পুরুষের ভিডিও অনুমতি ছাড়া ধারণ করা হলো। ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ দাবি করা হলো। অর্থ না দিলে ভিডিওর সঙ্গে কল্পিত গল্প জুড়ে ফেসবুক বা ইউটিউবে প্রচার করা হলো। সেখানে অপরাধের কোনো উপাদান না থাকলেও সামাজিক বিচার সম্পন্ন হয়ে গেল মুহূর্তেই।
এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং ডিজিটাল যুগে ক্রমবর্ধমান এক সামাজিক ব্যাধির লক্ষণ।
সাংবাদিকতা কখনোই জনসম্মুখে কাউকে অপমান করা, বিচার শেষ হওয়ার আগেই অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা কিংবা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ভঙ্গ করার লাইসেন্স নয়। বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকতার নৈতিকতার অন্যতম ভিত্তি হলো-সত্যতা, নিরপেক্ষতা, মানবিক মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধা এবং ক্ষতি কমানোর নীতি। কোনো ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশের ফলে যদি অযৌক্তিক সামাজিক ক্ষতি, নিরাপত্তাহানি বা মর্যাদাহানি ঘটে, তবে সেই তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে সাংবাদিককে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়।
বাংলাদেশের সংবিধানও নাগরিকের এই অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। সংবিধানের ৪৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা ও আইন দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত সীমাবদ্ধতা সাপেক্ষে প্রত্যেক নাগরিকের গৃহে নিরাপত্তা এবং চিঠিপত্র ও যোগাযোগের অন্যান্য উপায়ের গোপনতা রক্ষার অধিকার রয়েছে। যদিও অনুচ্ছেদটিতে সরাসরি "প্রাইভেসি" শব্দটি ব্যবহৃত হয়নি, তবুও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সাংবিধানিক ভিত্তি হিসেবে এটি বহুল স্বীকৃত।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের সাংবাদিক আচরণবিধি সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত মর্যাদা, সামাজিক সুনাম এবং ব্যক্তিগত জীবনের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের নির্দেশনা দেয়। একইভাবে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সোসাইটি অব প্রফেশনাল জার্নালিস্টস-এর নীতিমালায় বলা হয়েছে—সংবাদ সংগ্রহের সময় ব্যক্তির মানবিক মর্যাদা ও সম্ভাব্য ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার তথ্য প্রচারের গণতন্ত্রীকরণ ঘটালেও এর সুযোগে গড়ে উঠেছে এক ধরনের "ভিউ অর্থনীতি"। এখানে সত্যের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ক্লিক, শেয়ার ও ভাইরাল হওয়া। ফলে কিছু ব্যক্তি নিজের নামে ফেসবুক পেজ খুলে তার সঙ্গে "টিভি", "নিউজ", "মিডিয়া" ইত্যাদি শব্দ যুক্ত করে সাংবাদিক পরিচয় দিচ্ছেন। নিজেরাই প্রেস কার্ড তৈরি করছেন, বুম বানাচ্ছেন, মোটরসাইকেলে প্রেস স্টিকার লাগাচ্ছেন। কোথাও কোথাও টিকটকারদের জন্যও প্রেস কার্ডের নামে বাণিজ্যের অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। সভা-সমাবেশে এই শ্রেণির অনুপ্রবেশে মূলধারার গণমাধ্যমকর্মীরাও বিব্রত হচ্ছেন।
এখানে একটি মৌলিক বিষয় স্মরণ রাখা জরুরি। সাংবাদিকতা কোনো পদবি নয়; এটি একটি দায়িত্বশীল পেশা। একটি ক্যামেরা, একটি ফেসবুক পেজ বা একটি ইউটিউব চ্যানেল কাউকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাংবাদিক বানায় না। সাংবাদিক হওয়ার জন্য প্রয়োজন নৈতিকতা, পেশাগত দক্ষতা, সত্য যাচাইয়ের সক্ষমতা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচালিত এই তথাকথিত "বিচার" বিচারব্যবস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। আমাদের রাষ্ট্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজ তদন্ত ও গ্রেপ্তার করা, আদালতের কাজ বিচার করা। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু কনটেন্ট নির্মাতা নিজ উদ্যোগে অভিযোগকারী, তদন্তকারী, প্রসিকিউটর এবং বিচারক—সব ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছেন। ফলে নিরপরাধ মানুষও সামাজিকভাবে অপরাধীর তকমা বহন করতে বাধ্য হচ্ছেন।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অবশ্যই গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি। কিন্তু স্বাধীনতা কখনো দায়িত্বহীনতার সমার্থক নয়। একজনের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অন্যজনের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার অধিকারকে পদদলিত করতে পারে না। নাগরিকের সম্মতি ছাড়া ভিডিও ধারণ, বিকৃত উপস্থাপন, অপপ্রচার, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা অর্থ আদায়—এসব কোনোভাবেই সাংবাদিকতা নয়; বরং তা ডিজিটাল হয়রানি, মানহানি এবং ক্ষেত্রবিশেষে চাঁদাবাজির পর্যায়েও পড়তে পারে।
এ অবস্থায় কয়েকটি বিষয়ে রাষ্ট্র, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান এবং সমাজকে গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে।
প্রথমত, সাংবাদিক পরিচয়ের অপব্যবহার রোধে কার্যকর নীতিমালা ও প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, অনুমতিবিহীন ভিডিও ধারণ ও ডিজিটাল অপপ্রচারের বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে হবে। তৃতীয়ত, মূলধারার গণমাধ্যমকে নিজেদের নৈতিক মানদণ্ড আরও সুস্পষ্টভাবে জনসমক্ষে তুলে ধরতে হবে। চতুর্থত, নাগরিকদের ডিজিটাল সাক্ষরতা বৃদ্ধি করতে হবে, যাতে তারা যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো ভিডিও বা প্রচারণাকে সত্য হিসেবে গ্রহণ না করেন।
সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় শক্তি মানুষের বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস এক দিনে অর্জিত হয় না; বছরের পর বছর সততা ও দায়বদ্ধতার মাধ্যমে গড়ে ওঠে। কিন্তু কিছু দায়িত্বজ্ঞানহীন ব্যক্তির কারণে যদি পুরো সাংবাদিক সমাজ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে, তবে তার ক্ষতি শুধু একটি পেশার নয়; ক্ষতিগ্রস্ত হয় গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার এবং নাগরিক স্বাধীনতা।
তবে খুশীর বিষয় হচ্ছে যে বিষয়টি সরকারের আমলে এসেছে। রবিবার জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশ নিয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন নোয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক। তিনি বলেছেন, দেশের প্রায় সব উপজেলা, এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়েও সাংবাদিকতার কার্ড পাওয়া যাচ্ছে। অথচ অনেকেরই সাংবাদিকতা বিষয়ে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান নেই; কেউ রিপোর্টারও নন, এমনকি মেট্রিক পাসও না। ইউটিউবসহ বিভিন্ন মাধ্যমে যা খুশি তাই প্রচার করা হচ্ছে। কারা এসব সাংবাদিকতার কার্ড দিচ্ছে, এদের লেখাপড়া কতটুকু এবং কারা সেই পরিচয় ব্যবহার করছে- এসব বিষয় তদন্ত করা দরকার।
এটির উত্তরে তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী সংসদে বলেন, আমরা মিসইনফরমেশন (ভুল তথ্য) ও ডিসইনফরমেশন (অপতথ্য) নিয়ে কাজ করছি। যারা সাংবাদিক হিসেবে নিবন্ধিত নয়, মূলত তারাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন মিসইনফরমেশন ও ডিসইনফরমেশন উপস্থাপন করেন।
যাইহোক এই তথ্য সন্ত্রাসীদের যত দ্রুত থামানো যায় ততই মঙ্গল। তথ্য পরিবেশন আর তথ্যের নামে সন্ত্রাস এক জিনিস নয়। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা যেমন রক্ষা করতে হবে, তেমনি নাগরিকের গোপনীয়তা ও মর্যাদাও সমানভাবে সুরক্ষিত রাখতে হবে। কারণ, যারা বিচার ব্যাবস্থার আগেই ফেসবুক রায় দেয়, সেখানে শেষ পর্যন্ত কোনো ব্যাক্তি কিংবা রাষ্ট্র কোনটাই নিরাপদ থাকবে না ।
লেখক : গণমাধ্যমকর্মী
সর্বশেষ হালনাগাদ 2 hours আগে

