কামরুল হাসান জনি>
সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে দেশে ফেরা প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভিসা অটো ক্যানসেল হয়ে যাচ্ছে। ছুটিতে থাকা প্রবাসীদের মধ্যে ভুক্তভোগীর সংখ্যা বেশি। কেউ কেউ ছুটি শেষে দেশটিতে ফেরার পথে জানতে পারছেন তার ভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে- কয়েকদিন বা কয়েক মাস দেশে অবস্থানরত এমন ভুক্তভোগীর সংখ্যা কয়েকশ ছাড়িয়ে গেছে। যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ‘শোনা যাচ্ছে, আমিরাত প্রবাসীরা দেশে ফিরলে ভিসা অটো ক্যানসেল হয়ে যাচ্ছে! এমন ভুক্তভোগী কেউ আছেন?’ - এমন একটি পোস্ট দেয়ার পর প্রায় শতাধিক প্রবাসী বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগ করেছেন। জানান ঘটনার সত্যতা। পাঠান প্রয়োজনীয় কাগজপত্র।
পোস্টের নিচে কামাল হোসেন নামে একজন লিখেছেন- ‘আমার পরিচিত আট থেকে দশজনের ভিসা ক্যানসেল হয়েছে গতকাল পর্যন্ত।’ মেজবা উদ্দিন নামের আরেক প্রবাসী লিখেছেন- ‘আমাদের আজমান চায়না মলে আমার জানা মতে ৬/৭ জন ভিসা ক্যানসেল হয়েছে। এরমধ্যে অনেকে ব্যবসায়ী।’ মোহাম্মদ জাহেদ লিখেছেন- ‘আমার দুইটা বন্ধুর ২২/০৭/২৬ তারিখে ক্যানসেল হয়ে গেছে’। আর এইচ রবিউল নামের আরেক প্রবাসী লিখেছেন- ‘আমার মায়ের মৃত্যুর জন্য আসলাম, এখন আমার কি সেম সমস্যা হবে? আল্লাহ রহম কর।’
আমিরাত প্রবাসী এস আলম মানিক জানান- ভিসা বাতিল হওয়ার সংখ্যা অনেক। কী কারণে ভিসা বাতিল হচ্ছে কারণ অজানা সবার। ডোমেস্টিক ওয়ার্কার, পার্টনার/ইনভেস্টর, লেবার ভিসা -সবধরণের ভিসা বাতিলের আওতায় পড়ছে। কারও কারও নিজের প্রতিষ্ঠানের ভিসা হওয়ার পরও বাতিল হয়েছে। বেশির ভাগই দেশে ছুটিতে থাকা অবস্থায় ভিসা বাতিল হচ্ছে।
প্রবাসীদের ভিসা দেদারে ক্যানসেল হওয়ার সত্যতা জানতে দেশটিতে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত তারেক আহমেদ, কনসাল জেনারেল রাশেদুজ্জামান ও প্রেস সচিব জিয়াউল হক মীরের সাথে যোগাযোগ করা চেষ্টা করি। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠালেও তারা কোন উত্তর দেননি। প্রবাসীদের এমন সংকটকালে তাদের নীরবতা আরও বেশি উদ্বেগের। যদিও তাদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে ইতোমধ্যে অনেক প্রবাসী বিরক্ত। অথচ নীরবতা নয়, এখনই সময় প্রবাসীদের পাশে দাঁড়ানোর।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশি কর্মীদের ভিসা বাতিলের খবর এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। দেশের বিভিন্ন রিক্রুটিং এজেন্সি, বিদেশ যেতে প্রস্তুত কর্মী এবং তাদের পরিবারের সঙ্গে কথা বললেই বোঝা যায়—উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই পরিস্থিতির প্রকৃত কারণ সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই কারও কাছে।
এই অনিশ্চয়তার সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন সাধারণ শ্রমিক। ভিসা বাতিল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুধু একটি কাগজের অনুমোদন হারিয়ে যাচ্ছে না, ভেঙে যাচ্ছে একটি পরিবারের ভবিষ্যতের পরিকল্পনাও।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান অনস্বীকার্য। প্রতি বছর তারা যে রেমিট্যান্স দেশে পাঠান, তা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শীর্ষ রেমিট্যান্স প্রেরণকারী প্রবাসীদের মধ্যে আমিরাত প্রবাসীরা এখন প্রথমদিকে অবস্থান করছে। অথচ সেই প্রবাসী শ্রমিকদের একটি বড় অংশ যখন অনিশ্চয়তার মুখে, তখন সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর দৃশ্যমান তৎপরতা খুব একটা চোখে পড়ছে না।
প্রশ্ন উঠতেই পারে—সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত, দুবাইয়ের কনসাল জেনারেল কিংবা সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক মিশন কি এই পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে? যদি করে থাকে, তাহলে সমস্যার প্রকৃতি ও সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে জনসাধারণকে জানানো হচ্ছে না কেন? তথ্যের অভাব গুজবকে শক্তিশালী করে, আর গুজব পুরো অভিবাসন খাতকে আরও অস্থির করে তোলে।
কূটনীতির অন্যতম উদ্দেশ্য হলো বিদেশে দেশের নাগরিকদের স্বার্থ রক্ষা করা। কোনো দেশে যদি বাংলাদেশি কর্মীদের ভিসা ইস্যু বা বাতিল নিয়ে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়, তবে সেটি দ্রুত সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে কারণ জানা এবং সমাধানের পথ খোঁজা দূতাবাসের অন্যতম দায়িত্ব। একই সঙ্গে সেই তথ্য সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় পৌঁছে দেয়াও জরুরি।
আমিরাত প্রবাসীদের এমন সংকটে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু দূতাবাসের ওপর নির্ভর না করে উচ্চপর্যায়ে কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়াতে হবে। প্রয়োজনে যৌথ বৈঠক, কারিগরি আলোচনা কিংবা বিশেষ প্রতিনিধি পাঠিয়ে সমস্যার প্রকৃত কারণ নির্ণয় করতে হবে। একটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু কর্মসংস্থানে নয়, দেশের অর্থনীতিতেও পড়বে।
অবশ্য এটিও মনে রাখতে হবে, প্রতিটি ভিসা বাতিলের পেছনে একই কারণ নাও থাকতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিয়োগদাতার সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক জটিলতা, নীতিগত পরিবর্তন বা নিরাপত্তা যাচাইয়ের বিষয় থাকতে পারে। তাই যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যেমন ঠিক নয়, তেমনি দীর্ঘ নীরবতাও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে স্বচ্ছতা ও নিয়মিত তথ্য প্রদান অপরিহার্য।
প্রবাসীদের উদ্বেগকে গুরুত্ব দিয়ে বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বৈধভাবে বিদেশগামী কর্মীরা যেন অযথা হয়রানির শিকার না হন এবং বাংলাদেশ যেন তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজারে আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখতে পারে—সেই লক্ষ্যেই দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। এই বিষয়ে প্রবাসীরা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দ্রুত পদক্ষেপ আশা করছেন।
প্রবাসীরা শুধু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের উৎস নন; তারা বাংলাদেশের উন্নয়নের নীরব কারিগর। তাদের স্বার্থ রক্ষা করা কোনো অনুগ্রহ নয়, এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে যত দ্রুত ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে, ততই দেশের জন্য মঙ্গল।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও অভিবাসন বিশ্লেষক
সর্বশেষ হালনাগাদ 48 minutes আগে

