অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
পুঁজি বাজারের চলমান সঙ্কট উত্তরণে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) গঠিত পুঁজি বাজার সংস্কার টাস্কফোর্স কমিশনের কাছে বিভিন্ন বিষয়ে তাদের মতামত ও সুপারিশ জমা দিয়েছে। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল আইপিও-সংক্রান্ত টাস্কফোর্সের সুপারিশ। পুুঁজি বাজারে আইপিও ব্যবস্থাপনা, এর সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকাণ্ড কিভাবে স্বচ্ছতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হওয়া কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্তির ব্যবস্থা করবে সেসব বিষয় সুপারিশে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ টাস্কফোর্স মনে করে পুঁজি বাজারকে সমৃদ্ধ ও বিনিয়োগবান্ধব করতে দরকার আইপিও প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
কোনো দেশের পুঁজি বাজারকে তখনই বিনিয়োগবান্ধব মনে করা হয় যখন সে পুঁজি বাজার দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের মতো সমৃদ্ধ থাকে। আর এর জন্য প্রয়োজন বাজারের গভীরতা তথা ভালো কোম্পানির শেয়ার ও অন্যান্য সিকিউরিটিজের অন্তর্ভুক্তি। আর এ দিক থেকেই সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে রয়েছে দেশের পুঁজিবাজার। প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও এখনো সিকিউরিটিজ-নির্ভর ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) খুব বেশি ভালো ও মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির তালিকাভুক্তি সম্ভব হয়ে ওঠেনি। হাতে গোনা কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানি ও কয়েকটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ছাড়া বেসরকারি মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির খুব কমসংখ্যকই বাজারে তালিকাভুক্ত। এতে সবসময়ই বাজারটি শেয়ার-স্বল্পতায় ভোগে। আর ফলস্বরূপ বিদেশী বিনিয়োগতো নেই বললেই চলে। এমনকি দেশীয় কোনো প্রতিষ্ঠিত ফান্ড বা এ-জাতীয় উল্লেখ করার মতো কোনো বিনিয়োগকারী বাজারে নেই। শুধু কিছু তফসিলি ব্যাংকই নিজস্ব মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকার হাউজের মাধ্যমে কিছুটা বিনিয়োগ করে থাকে। তাও খুবই সীমিত পরিসরে এবং সীমিত সময়ের জন্য।
দেশের পুঁজি বাজার প্রথমবার বিপর্যয়ের শিকার হয় ১৯৯৬ সালে। সে সময় কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ড মিলিয়ে শ’খানেক সিকিউরিটেজের লেনদেন হতো। এ অবস্থায় মাত্র দু’মাসেরও কম সময়ে বাজারটির মূলধন কয়েকশ’ গুণ বেড়ে যায়। ওই সময় আইপিও ব্যবস্থাপনায় বর্তমান সময়ের মতো প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা না থাকলেও মোটামুটি স্বচ্ছতা ছিল। তাই খুব বেশি মানহীন কোম্পানির বাজারে তালিকভুক্তির সুযোগ ছিল না। কিন্তু ২০০০ সালের পর পুঁজি বাজারের গভীরতা বাড়াতে গিয়ে বেশ কিছু মানহীন কোম্পানি বাজারে তালিকাভুক্তির সুযোগ পায়। সেই থেকে শুরু। এর পর নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভেতরে ও বাইরে যোগসাজশের মাধ্যমে একের পর এক মানহীন কোম্পানি তালিকাভুক্তির সুযোগ তৈরি করে নেয়, যার অনেকগুলোই তালিকাভুক্তির শর্ত পূরণে বছরের পর বছর ব্যর্থ হওয়ায় ইতোমধ্যে পুঁজিবাজার থেকে তালিকাচ্যুতি ঘটেছে।
পরবর্তী সময়ে বেশ কিছু বেসরকারি ব্যাংক পুঁজি বাজারে তালিকাভুক্ত হতে শুরু করলে বাজারের গভীরতায় কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। ২০০৬ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত সময়ে বেশ কিছু রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের প্রতিষ্ঠান ডিরেক্ট লিস্টিং পদ্ধতিতে পুঁজি বাজারে তালিকাভুক্ত হয়। এসব প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক সাড়া পায়। এ সময় দেশের টেলি-কমিউনিকেশন খাতের বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান গ্রামীণফোন তালিকাভুক্ত হলে বাজারের গভীরতা কিছুটা বৃদ্ধি পায়। এ সময় লেনদেনও বেশ বেড়ে যায়। তবে এর পরই ২০১০ সালের শেষদিকে দ্বিতীয়বারের মতো বিপর্যয়ের মুখে পড়ে পুঁজিবাজার, যার রেশ টেনে চলেছে এখনো। বিগত ১৫ বছরে একটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে থাকা সরকারের সময় কোনো ধরনের জবাবদিহিতা ছাড়াই সরকারের ঘনিষ্ঠ কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাজারকে মুনাফা বানানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। আর এ ক্ষেত্রে তারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদ পেয়েছে খোদ নিয়ন্ত্রক সংস্থার।
২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএসইসি পুনর্গঠনসহ দীর্ঘ দিন ধরে চলতে থাকা মন্দা কাটাতে অন্তর্বর্তী সরকার বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করে। পুনর্গঠিত বিএসইসি চলমান সঙ্কট উত্তরণে পেশাদার ও পুঁজি বাজার বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে ‘পুঁজি বাজার সংস্কার টাস্কফোর্স’ গঠন করে। এ টাস্কফোর্স দীর্ঘ দিন ধরে আইপিও’র ক্ষেত্রে চলতে থাকা অনিয়ম ও দুর্বলতাগুলো খুঁজে বের করে তা কাটিয়ে ওঠার ব্যাপারে সুপারিশ পেশ করে।
পুঁজি বাজার সংস্কার টাস্কফোর্সের চূড়ান্ত সুপারিশ অনুযায়ী, পুঁজি বাজারে তালিকাভুক্তির জন্য প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও)-এর জন্য সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বরাদ্দ আগের ৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬০ শতাংশ করা হয়েছে। এর ফলে বাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ ও আস্থা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। অপর দিকে যোগ্য বিনিয়োগকারীদের জন্য বরাদ্দ ১০ শতাংশ কমিয়ে ৪০ শতাংশ করা হয়েছে, যা বাজারের বৈচিত্র্য ও স্বচ্ছতাকে আরো প্রভাবিত করবে।
বিএসইসি থেকে পাওয়া তথ্য মতে, অতীতে বেশ কয়েকবার আইপিও কোটা সংশোধন করা হয়েছে। খায়রুল হোসেনের নেতৃত্বাধীন কমিশনের অধীনে বরাদ্দ শেষবার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য ৩০ শতাংশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য ৭০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে শিবলী রুবাইয়াতের নেতৃত্বাধীন কমিশনের সময় বরাদ্দ উল্টে দেয়া হয়। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য ৭৫ শতাংশ এবং প্রতিষ্ঠানের জন্য ২৫ শতাংশ।
টাস্কফোর্স আইপিও প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনয়নের জন্য বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিধানের সুপারিশ করেছে। শেয়ারের মূল্য নির্ধারণের জন্য বুক বিল্ডিং পদ্ধতির অধীনে যোগ্য বিনিয়োগকারীদের জন্য বিডিং সীমা বৃহত্তর অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করার জন্য ২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়। অতিরিক্ত মূল্যের ওঠানামা রোধ করার জন্য তালিকাভুক্তির পর প্রথম তিন দিনের জন্য ১০ শতাংশ সার্কিট ব্রেকার প্রযোজ্য হবে না। এ ছাড়াও কাট-অফ মূল্য থেকে কোনো ছাড় দেয়া হবে না, যাতে ইস্যুকারীরা তাদের প্রত্যাশিত প্রিমিয়াম পান।
তবে বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করার জন্য আইপিও আবেদনের জন্য ৫০ হাজার টাকা বিনিয়োগের যে শর্ত আরোপ করা আছে তা অপসারণ করার সুপারিশ করা হয়েছে।
তা ছাড়া শেয়ার বাজারে মানসম্পন্ন স্টকের সরবরাহ বৃদ্ধি ও বাজারের মান উন্নয়নের ল্েয গুরুত্বপূর্ণ পদপে গ্রহণের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এর আওতায় এক হাজার কোটি টাকার বেশি টার্নওভারযুক্ত বহুজাতিক কোম্পানি এবং কৃহৎ করপোরেশনগুলোর জন্য সরাসরি তালিকাভুক্তির অনুমতি দেয়া হবে, যার ফলে তাদের জন্য অফলোডের প্রয়োজনীয়তা ১০ শতাংশ হ্রাস পাবে। এটি বাজারের তারল্য বাড়ানোর পাশাপাশি বৃহৎ কোম্পানিগুলোর জন্য তালিকাভুক্তি প্রক্রিয়াকে সহজতর করবে। অপর দিকে এক হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ বকেয়া থাকা বৃহৎ করপোরেশনগুলোকে অবশ্যই তালিকাভুক্ত করতে হবে, যা বাজারের স্বচ্ছতা ও আস্থার উন্নয়নে সহায়তা করবে। আইপিও’র জন্য ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন স্থির মূল্যের প্রস্তাব ৩০ কোটি টাকা থেকে উন্নীত করে ৫০ কোটি টাকা করা হবে। এ ছাড়া বুক-বিল্ডিং পদ্ধতিতে আইপিওর জন্য এই ন্যূনতম মূলধনের পরিমাণও সুনির্দিষ্ট রাখা হবে। এই উদ্যোগগুলো দেশের শেয়ারবাজারের মানোন্নয়ন, বিনিয়োগকারীর আস্থা বৃদ্ধি ও বাজারের সামগ্রিক কার্যকারিতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। ●
অকা/পুঁবা/ফর/বিকাল/১৩ জুন, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 9 months আগে

