অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
দীর্ঘ মন্দায় আক্রান্ত পুঁজি বাজার থেকে বড় একটি সময় সাইড লাইনে চলে যাওয়া বিনিয়োগকারীরা আবার ফিরতে শুরু করেছেন বাজারে। সাম্প্রতিক সময়ে পুঁজি বাজারের স্বাভাবিক আচরণ এবং সূচক ও লেনদেনের যৌক্তিক উন্নতি তারই প্রমাণ। এ মুহূর্তে পুঁজি বাজারে সূচকের যেমন অস্বাভাবিক উল্লম্ফন নেই তেমনি দেখা যায় না হঠাৎ করে অস্বাভাবিক লেনদেনও। বাজারে সূচকের উন্নতি যেমন ঘটছে তেমনি প্রতিনিয়তই সংশোধন ঘটে চলেছে, যা বাজারগুলোকে টেকসই অবস্থানের দিকে নিয়ে চলেছে। বাজারের বর্তমান চিত্রকে তাই বিনিয়োগকারীদের আস্থায় ফেরার প্রমাণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা মনে করেন, কয়েক বছর ধরে বিনিয়োগকারীরা যেটির অপেক্ষায় ছিলেন এ মুহূর্তে সেই সঠিক পথের দিকেই যাচ্ছে পুঁজি বাজার।
সম্প্রতি পুঁজি বাজারে সূচকের উন্নতি যেমন ঘটছে তেমনি বেড়ে চলেছে বাজারের লেনদেনও। দীর্ঘ দিন ধরে মন্দায় আটকে থাকা পুঁজি বাজারের যে লেনদেন খরা তাকে অনেকে তারল্যসঙ্কট হিসেবে দেখাতে চাইলেও বাস্তবে এটি যে, বিনিয়োগকারীদের অনাস্থার প্রতিফলন সাম্প্রতিক সময়ের বাজার পরিস্থিতি তারই প্রমাণ। মাত্র অল্প ক’দিনের ব্যবধানে ২০০ কোটি টাকা থেকে হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়া ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) লেনদেন বিনিয়োগকারীদের নতুন করে বাজারে ফেরার ইঙ্গিতই বহন করে। ৭ সেপ্টেম্বর ঢাকা শেয়ার বাজারে লেনদেন পৌঁছে যায় এক হাজার ৪৪১ কোটি টাকায়, যা ৪ সেপ্টেম্বরের লেনদেনের চেয়ে ১১৩ কোটি টাকা বেশি। এটি ঢাকা শেয়ার বাজারে চলতি বছরের সর্বোচ্চ লেনদেন। এ ধারা অব্যাহত থাকলে হয়তো কয়েকদিনের মধ্যে এটি দু’হাজার কোটিও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
প্রসঙ্গত, গত বছরের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর হঠাৎ করে পুঁজি বাজারের লেনদেন বৃদ্ধি পায়। ১১ আগস্ট ঢাকা স্টকের লেনদেন ছাড়িয়ে যায় দুই হাজার কোটি টাকা; কিন্তু তার এক দিন পরই লেনদেন নেমে আসে এক হাজার ১০০ কোটিতে। আবার এর মাত্র সাতটি কর্মদিবস পর ২০ আগস্ট ডিএসইতে লেনদেন রেকর্ড করা হয় ৫১৮ কোটি টাকা। ওই সময়ের বাজার আচরণ আর এ সময়কার বাজার আচরণে যে তফাত তাকেই চলমান বাজারের ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থার বহিঃপ্রকাশ বলছেন বাজার বিশ্লেষকরা। তারা মনে করেন, বড় কোনো বিপর্যয় না ঘটলে সামনের দিনগুলোতে একটি গতিশীল ও টেকসই বাজার পাবেন বিনিয়োগকারীরা।
লেনদেনের পাশাপাশি ৭ সেপ্টেম্বর ডিএসইর প্রধান দু’টি সূচকের উন্নতি ঘটেছে। ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৭ সেপ্টেম্বর ২১ দশমিক ৮৭ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। ৫ হাজার ৬১৪ দশমিক ২৭ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি ৩১ আগস্ট দিনশেষে পৌঁছে যায় ৫ হাজার ৬৩৬ দশমিক ১৫ পয়েন্টে। দিনের শুরু থেকে অনেকটা সাবলীলভাবে এগিয়ে চলা সূচকটি বেলা দেড়টার দিকে দিনের সর্বোচ্চ ৬ হাজার ৬৫৩ পয়েন্টে পৌঁছে। লেনদেনের এ পর্যায়ে বিক্রয়চাপ সৃষ্টি হলে দিনশেষে বৃদ্ধি পাওয়া সূচকের একটি অংশ হারিয়ে বসে বাজারটি। এ সময় ডিএসইর দু’টি বিশেষায়িত সূচকের মধ্যে ডিএসই-৩০ ৫ দশমিক ৩৪ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখলেও ডিএসই শরিয়াহর সামান্য অবনতি ঘটে।
এ দিকে ৭ সেপ্টেম্বর দুই পুঁজি বাজারের আচরণে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটতে দেখা যায়। বিগত কিছুদিন ধরে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ স্বল্পমূলধনী কোম্পানিগুলো নিয়ে অযৌক্তিক খেলায় মেতে উঠলেও ৭ সেপ্টেম্বর তার পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে। এবার মৌল ভিত্তিতেই ফিরছেন তারা। এতদিন দুই পুঁজিবাজারে মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষ দশে স্বল্প মূলধনের কোম্পানিগুলোর আধিক্য থাকলেও ৭ সেপ্টেম্বর মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষ দশে এ কোম্পানিগুলোর খুব একটা জায়গা হয়নি। দিনের মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষ দশে মৌল ভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিগুলোই ছিল এগিয়ে। সংশ্লিষ্টরা এটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।
৭ সেপ্টেম্বর ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষ কোম্পানি ছিল টেলিযোগাযোগ খাতের বহুজাতিক কোম্পানি রবি অজিয়াটা। ৩৭ কোটি আট লাখ টাকায় কোম্পানিটির এক কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় ৭ সেপ্টেম্বর। ৩৪ কোটি ৩৩ লাখ টাকায় ৩৯ লাখ ১৩ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল ট্রাস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ, ওরিয়ন ইনফিউশন, লাভেলো আইসক্রিম, সিনো বাংলা ইন্ডাস্ট্রিজ, সিটি ব্যাংক, আইপিডিসি, ই জেনারেশন ও কেডিএস এক্সেসরিজ।
ডিএসইর দিনের মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ কোম্পানি ছিল রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে জীবন বীমা খাতের কোম্পানিটির। ৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে এ তাালিকায় দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসে কেডিএস এক্সেসরিজ। ডিএসইর দিনের মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ দশ কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ই জেনারেশন, বিবিএস ক্যাবলস পিএলসি, সিএপিএম বিডিবিএল মিউচুয়াল ফান্ড ওয়ান, মুন্নু ফেব্রিক্স, সিএপিএম আইবিবিএল ইসলামী মিউচুয়াল ফান্ড, সিকদার ইন্স্যুরেন্স, এসইএমএল আইবিবিএল শরিয়াহ ফান্ড এবং আইএফআইসি ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড।
এ দিন ডিএসইতে দরপতনের শীর্ষে উঠে আসে জীবন বীমা খাতের কোম্পানি ট্রাস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। গত কয়েকদিন টানা মূল্যবৃদ্ধি পাওয়া কোম্পানিটি বাজারের সর্বোচ্চ ৮ দশমিক ৯৬ শতাংশ দরপতনের শিকার ছিল। এ ছাড়া ৭ দশমিক ৬৯ শতাংশ দর হারিয়ে দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস। অন্যান্য কোম্পানির মধ্যে শ্যামপুর সুগার মিলস ৬ দশমিক ৮০, ইনটেক অনলাইন ৫ দশমিক ৫১ , গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ৪ দশমিক ৩৪, ইউনিয়ন ব্যাংক ৪ দশমিক ৩৪, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক ৪ দমমিক ১৬, ইয়াকিন পলিমার ৩ দশমিক ৫৮, মেট্রো স্পিনিং ৩ দশমিক ৫৩ ও আলহাজ টেক্সটাইলস ৩ দশমিক ৪৭ শতাংশ দর হারায়।
ঢাকা শেয়ার বাজারে ৭ সেপ্টেম্বর তিন লাখ ৪৬ হাজার ৪২টি হাওলায় ৪৬ কোটি ৩৮ লাখ ৪৭ হাজার ৯৯০টি শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ড হাতবদল হয়েছে, যার বাজার মূল্য ছিল এক হাজার ৪৪১ কোটি ৯০ লাখ টাকা। এ দিন লেনদেন হওয়া কোম্পানি ছিল মোট ৪০০টি। এদের মধ্যে ২৪৮টির দাম বাড়ে, ১২৭টির কমে এবং ২৫টির দাম অপরিবর্তিত থাকে। অপর দিকে চট্টগ্রাম শেয়ার বাজারে তিন হাজার ৭৭৪টি হাওলায় মোট ৬১ লাখ ৪৪ হাজার ৮৮০টি সিকিউরিটিজ লেনদেন হয় গতকাল, যার বাজার মূল্য ছিল ১৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। লেনদেন হওয়া ২৫৫টি সিকিউরিটিজের মধ্যে ১৪৩টির দাম বাড়লেও কমেছে ৮৬টির। অপরিবর্তিত ছিল ২৬টির দর। ●
অকা/পুঁবা/ফর/রাত/৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 6 months আগে

