তারেক আবেদীন ●
দেশের ৪৫টি নন লাইফ বীমার মধ্যে ৪০টি কোম্পানির ব্যবসায়ে নেমেছে ধস! বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স এসোসিয়েশন (বিআইএ) এর প্রস্তুতকৃত চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ (প্রান্তিক) অবধি সাময়িক প্রিমিয়াম সারণীতে আশংকাজনক এ পরিস্থিতি লক্ষ্যণীয়। দীর্ঘসময় বীমা কার্যক্রমে ইতিবাচক অবস্থায় থাকা বড় বড় কোম্পানির ব্যবসায়ে ২০২৬ সালের জানুয়ারি-মার্চ অবধি এ মন্দাভাব দেখা যাচ্ছে। সারণী অনুয়ায়ী গত বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে নন লাইফ বীমার প্রিমিয়াম ব্যবসা হয়েছিল ১ হাজার ২৩৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা। অথচ চলতি বছরের একই সময়ে ব্যবসা ৯৮২ কোটি ১ লাখ টাকা। অর্থাৎ নন লাইফ বীমা ব্যবসা হ্রাস পেয়েছে ২৫৩ কোটি ১৬ লাখ টাকা।
‘কমিশনে ব্যবসা’ ও বিশ্ব বাণিজ্যে নেতিবাচক পরিস্থিতির মধ্যেও এ সময়ে মাত্র যে ৫টি নন লাইফ বীমা কোম্পানির প্রিমিয়াম আয় ধনাত্মক তা হলো- বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড, ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড, ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ লিমিটেড, প্যারামাইন্ট ইন্স্যুরেন্স পিএলসি এবং প্রভাতী ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড।
এর কারণ খুঁজে জানা গেছে, জানুয়ারিতে নন লাইফ ব্যবসায়ে এজেন্ট কমিশন বন্ধ হওয়ার পরও মাঠ পর্যায়ে কমিশন দিয়ে কিছু কিছু কোম্পানির ব্যবসা করা। বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থার আইন মেনে যেসব কোম্পানি বীমা কার্যক্রম পরিচালনা করছে তারা ক্ষতির শিকার হচ্ছে বেশি। মক্কেলকে বেশি কমিশন ও সুবিধা দিয়ে এক কোম্পানির ব্যবসা অন্য কোম্পানি ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ অনেক দিনের। কিন্তু জানুয়ারি’ ২৬ থেকে বেআইনীভাবে অনেক নন লাইফ কোম্পানি বীমার প্রিমিয়াম সংগ্রহ করছে!
জানা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত কোম্পানিগুলো বীমা মালিকদের সংগঠন বিআইএ’র কাছে ব্যবসা ‘ছিনিয়ে’ নেয়ার অভিযোগ উপস্থাপন করেছে এরমধ্যে। সংগঠনটি বিষয়গুলো সুরাহা করার জন্য অভিযুক্ত প্রায় ১২ কোম্পানির সঙ্গে বৈঠক করেছে। রাজধানীর নয়া পল্টনস্থ বিআইএ কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকগুলোর সমস্যা সংক্রান্ত সারাংশ বীমা খাতের নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এর সঙ্গে একাধিকবার সমন্বয় সভা করেছে। গতকাল ৩ জুন বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স এসোসিয়েশন এর সভাপতি সাঈদ আহমেদ এম পির নেতৃত্বে বিআইএ’র একটি টীম আইডিআর’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. ফজলুল হকের সঙ্গে বৈঠক করেছে। দীর্ঘ বৈঠককালে বীমা সংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ের মধ্যে বিষয়টি প্রাধান্য পায়।
মাঠ পর্যায়ে নন বীমা ব্যবসায়ে কমিশনে প্রিমিয়াম সংগ্রহের কার্যক্রম সম্পর্কে একাধিক নন লাইফ বীমা কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে অর্থকাগজ এর কথা হয়। তারা অনেকেই নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তৃতীয় প্রজন্মের একটি কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) বেশ উষ্মার সঙ্গে বলেন, ‘ব্যবসায়ের মাঠে অরাজকতা চলছে। ব্যাপক সে অনিয়মের কারণে আমাদের কোম্পানির কার্যক্রম চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গত তিন মাসে ব্যবসা না হওয়ার কারণে কোম্পানির কর্মকর্তা ও কর্মচারিদের নিয়মিত বেতন দিতেও পারছি না আমরা। কমিশন দিয়ে ব্যবসা সরকারিভাবে বন্ধ করা হলেও এখনও দৃশ্যমান। নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান দেখেও দেখছে না।’ চার বছর বার্ষিক সভা (এজিএম) করতে অসক্ষম তৃতীয় প্রজন্মের একটি নন লাইফ কোম্পানির নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কমিশন শুধু নয়; উচ্চ হারে কমিশন প্রদান করে তাদের ব্যবসা ছিনতাই করে নিয়ে গেছে সে কোম্পানি। আপনারা আইডিআরকে জানান প্রশ্নের উত্তরে তিনি আরো জানান, জানাতে হবে কেন? তাদের কম্পিউটার সার্ভারেইতো সেসব তথ্য ও উপাত্ত আছে যে কার বিজনেস কে ছিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।’
প্রথম প্রজন্মের কোম্পানি জনতা ইন্স্যুরেন্স পিএলসির মুখ্য মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, মাঠে কমিশন দিয়ে ব্যবসা অব্যাহত রয়েছে। আমরা চাই এর দ্রুত সমাধান। নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ এর সমাধানে সচেষ্ট হবে প্রত্যাশা করি।
আমরা চেয়েছিলাম কমিশন পুরোপুরি বন্ধ হোক। অনিয়মের অবসান হোক, কিন্তু দুঃখজনক তা হয়নি। অর্থকাগজ এর কাছে এমন মন্তব্য করেন রিপাবলিক ইন্স্যুরেন্স পিএলসি’র মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা ও বিআইএ’র নির্বাহী সদস্য ড. একেএম সরওয়ার জাহান জামিল। তিনি বলেন, আগের নিয়ম বাদ দিয়ে ব্যবসা করতে গিয়ে আমরা পিছনে পড়ে যাচ্ছি। কমিশন দিয়ে ব্যবসার করার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত কোম্পানিগুলোর সুরাহার লক্ষ্যে নিয়ন্ত্রক ও বিআইএ দ্বিপাক্ষিকভাবে কাজ করছে। আশা করি অচিরেই এর সমাধান হবে।
বাংলাদেশ কো অপারেটিভ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নূর ই আলম সিদ্দিক নন লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মন্দা ব্যবসা প্রসঙ্গে জানান, বিশ্ব বাজার নাজুক পরিস্থিতি এর জন্য প্রধানত দায়ী। কমিশন দিয়ে এক কোম্পানির ব্যবসা অন্য কোম্পানিতে স্থানান্তর প্রশ্নে তিনি অর্থকাগজকে বলেন এর সমাধান হবে; কেননা বিআইএ এবং আইডিআরএ এ বিষয়ে সজাগ।
সর্বশেষ হালনাগাদ 6 hours আগে

