অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা তীব্র হওয়ার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এর ফলে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে, যা ২০২২ সালের পর প্রথমবারের মতো ঘটল।
বিশ্লেষকদের মতে, চলমান সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেলের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই বিশাল সরবরাহ ঘাটতি আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। সোমবার প্রকাশিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে সহিংসতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ দ্রুত বেড়েছে, যার ফলে গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে তেলের দাম। একই সঙ্গে বিশ্ব শেয়ারবাজারেও বড় ধরনের দরপতন দেখা গেছে।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে সপ্তাহান্তে তেহরান এবং এর আশপাশের এলাকায় একাধিক জ্বালানি স্থাপনায় হামলার ঘটনায়। স্থানীয় সূত্রগুলো দাবি করেছে, রাজধানীসহ অন্তত পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনায় হামলার পর সেখানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং অনেক স্থানে ধ্বংসস্তূপের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এই ঘটনার পর মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়।
এদিকে সম্ভাব্য প্রতিশোধমূলক হামলার আশঙ্কায় কুয়েত-এর জাতীয় তেল কোম্পানি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে তাদের উৎপাদন আংশিকভাবে কমানোর ঘোষণা দিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত বাজারে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে এই প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ রয়েছে। সাধারণত বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়েই পরিবহন করা হয়। ফলে এই পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক তেলবাজারে। এশিয়া–প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের লেনদেন শুরুতেই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুড-এর দাম ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৮ দশমিক ১০ ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই)-এর দামও ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৮ দশমিক ৭২ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
এ বিষয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করে বলেছেন, তেলের দাম বাড়া বিশ্ব নিরাপত্তা ও শান্তি নিশ্চিত করার জন্য একটি সাময়িক মূল্য মাত্র। তাঁর দাবি, ইরানের পারমাণবিক হুমকি নির্মূল করা গেলে খুব দ্রুতই তেলের দাম স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে।
তবে এ বিষয়ে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইরান। দেশটির বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর এক মুখপাত্র সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত থাকলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। তাঁর ভাষায়, যদি বিশ্ব বাজার ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলারের বেশি তেলের দাম সহ্য করতে প্রস্তুত থাকে, তবে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব।
তেলের এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব ইতোমধ্যে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারেও পড়েছে। সোমবার জাপানের টোকিও শেয়ারবাজারে নিক্কেই ২২৫ সূচক ৬ দশমিক ৩ শতাংশ কমে যায়। একই দিনে দক্ষিণ কোরিয়ার কোস্পি সূচক ৫ দশমিক ৯ শতাংশ এবং অস্ট্রেলিয়ার এএসএক্স ২০০ সূচক প্রায় ৩ দশমিক ৯ শতাংশ কমেছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেলের ঘাটতি বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে। বছরের শুরুতে যেখানে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৬০ ডলার ছিল, সেখানে বর্তমানে তা প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বেড়ে গেছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্ব অর্থনীতি, বিশেষ করে আমদানি নির্ভর দেশগুলোর জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এদিকে কাতার-এর জ্বালানি মন্ত্রী সতর্ক করে বলেছেন, যদি এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়, তবে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই উৎপাদন কমাতে বা বন্ধ করতে বাধ্য হতে পারে। সে ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী শত শত তেলবাহী জাহাজ বর্তমানে কার্যত স্থবির হয়ে আছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী হুমকি দিয়েছে, এই পথ ব্যবহার করে চলাচলকারী যেকোনো জাহাজের ওপর হামলা চালানো হতে পারে। ফলে জ্বালানি পরিবহন ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা আরও বাড়ছে এবং বিশ্ববাজারে তেলের দামের ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত থাকার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ●
অকা/জ্বা/ই/দুপুর/৯ মার্চ, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 4 hours আগে

