অর্থকাগজ প্রতিবেদন
বাংলাদেশের করপোরেট বন্ড বাজারে এক ধরনের নীরব সংকট দীর্ঘদিন ধরে জমে উঠছে—যেখানে বিনিয়োগকারীরা কেবল আর্থিক ক্ষতির মুখেই পড়ছেন না, বরং সময়মতো অর্থ ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তাও হারাচ্ছেন। নির্ধারিত কুপন পরিশোধে অনিয়ম, মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও মূল অর্থ ফেরত না পাওয়া, এবং দেরিতে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হওয়া—এসব মিলিয়ে এই খাতের প্রতি আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে করপোরেট বন্ডকে এমন একটি বিনিয়োগ মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল, যা শেয়ার বাজারের অস্থিরতা ও ব্যাংক আমানতের তুলনামূলক কম মুনাফার মাঝামাঝি একটি স্থিতিশীল বিকল্প দেবে। নির্দিষ্ট সুদহার, নির্দিষ্ট মেয়াদ এবং সম্পদভিত্তিক নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাজারজাত করা এই পণ্য দ্রুতই প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করে। মিউচুয়াল ফান্ড, ব্যাংক এবং রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলো বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করে এই ধারণায় যে ঝুঁকি সীমিত থাকবে এবং বাজারে যথাযথ নিয়ন্ত্রণ থাকবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র সময়ের সঙ্গে ভিন্ন হয়ে ওঠে।
রিজেন্ট স্পিনিং মিলসের ঘটনা এই সংকটের একটি প্রতীকী উদাহরণ। ২০১৫ সালে সম্প্রসারণের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটি ২০০ কোটি টাকার বন্ড ইস্যু করে। পাঁচ বছর মেয়াদি এই বন্ডের মেয়াদ শেষ হয় ২০২০ সালে, কিন্তু বিনিয়োগকারীরা এখনো তাদের অর্থ পুরোপুরি উদ্ধার করতে পারেননি। খেলাপি ঘোষণার পরও চার বছর বিলম্বে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়—এর মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ভিত্তি ভেঙে পড়ে, সংশ্লিষ্ট গ্রুপ কার্যত বিলুপ্ত হয়ে যায়, এবং সম্পদ পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনাও ক্ষীণ হয়ে পড়ে। ফলে, আইনি পদক্ষেপের কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে।
একই ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা যাচ্ছে বেক্সিমকোর গ্রিন সুকুক বন্ডেও। পাঁচ বছর মেয়াদি এই বন্ডের বড় অংশ এখনো পরিশোধ হয়নি, যদিও মেয়াদ শেষ হওয়ার নির্ধারিত সময় ঘনিয়ে আসছে। বরং মেয়াদ আরও পাঁচ বছর বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে, যা কার্যত বিনিয়োগকারীদের অর্থ দীর্ঘমেয়াদে আটকে রাখার শঙ্কা তৈরি করেছে। যদিও কুপন পরিশোধ অব্যাহত রয়েছে, তবুও মূল অর্থ ফেরতের নিশ্চয়তা নিয়ে সংশয় কাটেনি।
সি পার্ল বিচ রিসোর্ট অ্যান্ড স্পার কনভার্টিবল বন্ডও একই চিত্র তুলে ধরে। সম্পদ বন্ধক থাকা সত্ত্বেও ৩২৫ কোটি টাকার বিনিয়োগ আটকে রয়েছে, এবং নির্ধারিত সময় পার হলেও পরিশোধের অগ্রগতি খুব সীমিত। এতে বোঝা যায়, জামানত থাকলেই ঝুঁকি কমে—এই ধারণাটিও বাস্তবে দুর্বল।
করপোরেট বন্ডের পাশাপাশি ব্যাংক খাতের সাবঅর্ডিনেটেড বন্ডে আরও জটিল ঝুঁকি দৃশ্যমান হয়েছে। এই ধরনের বন্ড মূলত সংকটকালে ক্ষতি শোষণের জন্য তৈরি হলেও, দীর্ঘ সময় ধরে অর্থ আটকে থাকা এবং ব্যাংক একীভূতকরণের ফলে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগকে ঝুলিয়ে রেখেছে। বিনিয়োগকারীরা শেষ পর্যন্ত অর্থ ফেরত পাবেন—এমন আশ্বাস থাকলেও নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকায় অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। এই পুরো সংকটের পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
প্রথমত, আইনি প্রয়োগের ধীরগতি। খেলাপি হওয়ার পর দ্রুত পদক্ষেপ না নেওয়ায় ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়, ফলে পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা কমে যায়।
দ্বিতীয়ত, নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বল নজরদারি। অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল আর্থিক ভিত্তির প্রতিষ্ঠানগুলোকেও বন্ড ইস্যুর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
তৃতীয়ত, আর্থিক তথ্য প্রকাশের সীমাবদ্ধতা। স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাবে বিনিয়োগকারীরা প্রকৃত ঝুঁকি মূল্যায়ন করতে পারেন না।
চতুর্থত, ট্রাস্টি ব্যবস্থার অকার্যকারিতা। সময়মতো হস্তক্ষেপ না করায় বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ যথাযথভাবে রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সমস্যাগুলোর ফলে করপোরেট বন্ড বাজার এখনো পরিপক্বতা অর্জন করতে পারেনি। কুপন পরিশোধে বিলম্ব এবং মূল অর্থ ফেরত না পাওয়ার ঘটনা বাজারের গভীরতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা গড়ে ওঠার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা অনেকাংশে দায়ভার ট্রাস্টিদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। তাদের মতে, কুপন বা মূল অর্থ পরিশোধে ব্যর্থতার বিষয়টি ট্রাস্টিরা তদারকি করবে এবং প্রয়োজন হলে আইনি পদক্ষেপ নেবে। তবে বাস্তবে এই কাঠামো কার্যকরভাবে কাজ করছে না, কারণ ট্রাস্টিদের পদক্ষেপ প্রায়ই বিলম্বিত হয় এবং তাতে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন।
পরিসংখ্যানও এই সংকটের গভীরতা তুলে ধরে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হাজার হাজার কোটি টাকার বন্ড অনুমোদন দেওয়া হলেও—খেলাপি বন্ডের কোনো পূর্ণাঙ্গ ডেটাবেজ এখনো তৈরি হয়নি। ফলে বাজারের প্রকৃত ঝুঁকি ও সমস্যার পরিমাণ নির্ধারণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার ছাড়া এই বাজারের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। উন্নত বাজারে একটি কুপন পরিশোধে ব্যর্থতাকেও গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিন্তু বাংলাদেশে এই ধরনের ব্যর্থতার দৃশ্যমান কোনো পরিণতি না থাকায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের করপোরেট বন্ড বাজার এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে বিপুল সম্ভাবনা, অন্যদিকে কাঠামোগত দুর্বলতা। সময়মতো সংস্কার, কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করা গেলে—এই বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়বে, এবং দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশের আর্থিক খাতের জন্য একটি বড় ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।
সর্বশেষ হালনাগাদ 4 hours আগে

