বিকাশ চন্দ্র বিশ্বাস
২০১৭ ও ২০২২ সালে আগাম অতিবৃষ্টি এবং হাওড়ের বাঁধ ভেঙ্গে ফসল তলিয়ে গিয়েছিল। এবারে হঠাৎ অতিবৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার কারণে নষ্ট হয়েছে হাওড় ও নিম্নাঞ্চলের ফসল| বিগত সাড়ে তিন যুগ ধরে প্রতি ৩-৪ বছর পর পর হাওড় ও বিলের চিত্র এটি। বিশেষ করে ইরি-বোরো ধান চাষ শুরুর পর থেকে হাওড়বাসী ধারবাহিকভাবে এই সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। স্বাভাবিক নিয়মে বুদ্ধ পূর্ণিমায় মৌসুমী বায়ু ও বৃষ্টির যোগ বেশি থাকে। বুদ্ধ পূর্ণিমায় উজানে বিশেষতঃ আসাম, মেঘালয় ও দেশের অভ্যন্তরে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে বহুগুণ বেশি থাকে। যে বছর বুদ্ধ পূর্ণিমা বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি সময়ে চলে আসে, অতি বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে সে বছরটি হাওড়বাসীর জন্য দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ সময় হাওড়-বিলে পাকা ও আধা পাকা ধান ক্ষেতময় থাকে। বৈশাখের প্রথম সপ্তাহ থেকে হাওড়ের ধান কাটা শুরু হয়, চলে পুরো বৈশাখ। যে বছর বৈশাখে বৃষ্টিযোগ বেশি থাকে, সে বছরটি হাওড়বাসীর জন্য হয় কপাল খারাপের বছর! পাহাড়ি ঢল ও অতি বৃষ্টি তাদের ফসল তলিয়ে অভাব অনটনের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ বছরটি এর ব্যতিক্রম নয়! চলতি বছরের এপ্রিলের শেষ সময়ে স্বাভাবিকের চেয়ে ৭৫% বেশি বৃষ্টিপাতের কারণে এই বিপত্তি! ২০১৭ সালেও একই ঘটনা ঘটেছিল। সে বছর স্বাভাবিকের চেয়ে ১০৬% বেশী বৃষ্টিপাতের কারণে ফসল হানি হয়| ২০২২ সালে শুধু হাওড় নয়, পুরো সময়টা দেশ অতি বৃষ্টি ও খরার কবলে ছিল| তখন শহরে লোডশেডিং করে উত্তরাঞ্চলে আমন মৌসুমে সেচ সুবিধা বাড়িয়ে ধানের ঘাটতি মিটানো সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু হাওড়ের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি খাটে না| দেশের হাওড়, বিল ও নিম্নাঞ্চলে ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ফসল উৎপাদনের উপযোগী থাকে। বাকি সময় ফসলের মাঠ পানিতে থৈ থৈ করে। কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য মতে এ বছর হাওড়ে ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত ৪০-৫০ ভাগ ধান কাটা সম্ভব হয়েছিল। ২৮ এপ্রিল থেকে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে হাওড়ের ফসল সম্পূর্ণ তলিয়ে গেছে| শুকনো জায়গার অভাবে কাটা ফসল মাড়াই ও শুকানো সম্ভব হয়নি। বৈশাখের প্রথমভাগে অতি বৃষ্টি, ঝড় ও শিলাবৃষ্টির কারণে হাওড় ও নিম্নাঞ্চলের বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়। ৫০ হেক্টর ফসল নষ্টের কারণে এ বছর আড়াই লাখ টন চালের ঘাটতির সম্ভবনা রয়েছে| আগামী আউশ ও আমন মৌসুমে অতিরিক্ত উৎপাদনের মাধ্যমে এই ঘাটতি পূরণ করতে না পারলে আমদানির মাধ্যমে তা পূরণ করা ছাড়া গতান্তর নেই।
পৃথিবীর সর্বাধিক বৃষ্টিপ্রবণ অঞ্চল আসামের চেরাপুঞ্জির ভাটিতে আমাদের হাওড়গুলোর অবস্থান| দেশের অভ্যন্তরে সর্বাধিক বৃষ্টিপ্রবণ অঞ্চল শ্রীমঙ্গলের অবস্থানও এই হাওড় অঞ্চলে। এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ থেকে দক্ষিণ-পূর্ব মৌসুমী বায়ু সক্রিয় হয়ে ওঠে| বুদ্ধ পূর্ণিমা তিথিতে এই মৌসুমী বায়ুতে প্রচুর জলীয় বাস্পের আধিক্য থাকায় চেরাপুঞ্জিসহ এর আশেপাশের অঞ্চল ও বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে হাওড় অঞ্চল প্লাবিত হয়। ফলে ব্যাপক ফসল হানির ভয় থাকে। শতাব্দীর পর শতাব্দী এটি প্রাকৃতিক নিয়মে ঘটে চলেছে। চান্দ্রমাসের কারণে বৈশাখের মাঝামাঝি সময় থেকে জৈষ্ঠ্যের প্রথম সপ্তহে বুদ্ধ পূর্ণিমার উদয় ঘটে। যে বছরগুলোতে বুদ্ধ পূর্ণিমা বৈশাখের দ্বিতীয় ও তৃতীয় সপ্তাহে উদয় হয়, সে বছর ফসল তলিয়ে কৃষকের সর্বনাশ ঘটে। আর যে বছর বৈশাখের শেষ সপ্তাহ থেকে জৈষ্ঠ্যের শেষ সপ্তাহে উদয় হয়, সে বছরগুলোতে হাওড়ের ফসল নিরাপদে কৃষকের গোলায় ওঠে। শতাব্দীকাল থেকে হাওড়বাসী প্রকৃতির এই অমোঘ নিয়ম দেখে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। ১৯২০ সালে প্রকাশিত শ্রী অচ্যূতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধির শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত পূর্বাংশে জানা যায়, সুনামগঞ্জে বরাবরই অধিক বৃষ্টিপাত ঘটে। ১৯০৪ সালে এখানে ২১০ ইঞ্চি বৃষ্টিপাত হয়েছিল। ১৯০৫ সালে আসাম জেলা গেজেটিয়ায় এর প্রমাণ পাওয়া যায়। ১৯৫৯ সালের ১৯ জুন ৩৩৬ মিলিমিটার, ২০০০ সালের ১২ জুন ৩৬২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছিল। ২০১৭ সালের এপ্রিলে অকাল বর্ষণে সব হাওড় তলিয়ে গিয়েছিল। ২০২২ সালে মে ও জুন মাসের বৃষ্টিতে সুনামগঞ্জের ৯০ ভাগ অঞ্চল ও সিলেটের ৮০ ভাগ অঞ্চল তলিয়ে গিয়েছিল। সে বছর ১৭ জুন সিলেটে ২৮২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল। চলতি বছর ২৭ এপ্রিল সুনামগঞ্জের লাউড়ের গড়ে ১৩৩, দিরাইতে ২০৫, ছাতকে ৭৬ ও সদরে ১৩৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়| অর্থাৎ এপ্রিল-মে মাসে প্রাকৃতিক নিয়মেই দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওড় অঞ্চল প্লাবিত হয়। এটি কোন প্রকার বাঁধ দিয়ে বা অন্য কোন কৃত্রিম উপায়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা যার মাধ্যমে প্রাকৃতিক দুর্যোগ শুরুর আগেই কৃষকের ঘরে ফসল তোলা কিংবা প্লাবণের সামন্তরালে ফসল উৎপাদনের সনাতনি ব্যবস্থার আধুনিক সংস্করণ দিয়ে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া।
দেশে প্রচলিত হাইব্রিড ধানগাছের গড় আয়ুষ্কাল ১২০ দিন থেকে ১৫০ দিন। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওড় এলাকায় পানি থাকার কারণে বোরো আবাদকাল ডিসেম্বর ও জানুয়ারী মাস| স্বাভাবিকভাবেই এপ্রিল মাসের মধ্যে এই অঞ্চলের বোরো ধান কাটা সম্ভব হয় না। কৃত্রিম উপায়ে পানি নিষ্কাশন করে বোরো আবাদ কাল এগিয়ে নভেম্বর-ডিসেম্বর মাস করা যুক্তি সংগত নয়। কারণ এতে প্রচুর বাঁধ ও সুইজ গেট নির্মাণের প্রয়োজন হবে; যার প্রভাবে বর্ষা মৌসুমে বন্যা এবং শুস্ক মৌসুমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টির সমূহ সম্ভাবনা থাকে। কৃত্রিম উপায়ে যা করা যেতে পারে তা হলো হাইড্রোলজিক্যাল উপায়ে হাওড়ের খাল খনন করে নদী পর্যন্ত নৈমিত্তিক পানি প্রবাহ অটুট রাখা এবং ৯০ থেকে ১০০ দিন আয়ুষ্কাল ব্যাপি উফসী বোরো ধানের নতুন জাত উদ্ভাবনের চেষ্টা করা। ব্রি ধান-১১৮ জাত এক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। এই ব্যবস্থার মধ্যে হাইড্রোলজিক্যাল উপায়ে হাওড়ের খাল খনন ব্যয়সাপেক্ষ হলেও অসম্ভব নয়। উন্নয়ন বাজেটের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় এটি বাস্তবায়ন সম্ভব। ব্রি ধান-১১৮ জাতের ন্যায় ৯০ থেকে ১০০ দিন আয়ুষ্কাল ব্যাপি একাধিক উফসী বোরো ধানের নতুন জাত আবিষ্কারের জন্য দেশী-বিদেশী কৃষি বিজ্ঞানী ও জেনেটিক্যাল ইঞ্জিনিয়াদের জন্য উপযুক্ত আর্থিক প্রণোদনা ও গবেষণার জন্য মানানসই বাজেট বরাদ্ধ কাঙ্খিত ফল এনে দিতে পারে।
আরএকটি বিকল্প ব্যবস্থা ভাবা যেতে পারে, প্লাবণের সামন্তরালে ফসল উৎপাদনের সনাতনী চাষাবাদের আধুনিক সংস্করণ| বাংলাপিডিয়া সূত্রে জানা যায়, একসময় দেশের ৩৯ শতাংশ প্লাবণ ভূমিতে জলি ধানের আউশ ও আমন ধানের জাত চাষ হতো| জলিধান হলো চাষের মৌসুমে ৫০ সেমি বা তার বেশী গভীর পানিতে একমাস বা ততোধিক সময় ফলন অব্যহত থাকে এমন ধান। কান্ডের উচ্চতা ও পানির গভীরতার নিরিখে এই ধান দুই শ্রেণীরঃ ১. লম্বা জাতের ধান ও ২. ভাসমান ধান। প্রথমটির কান্ড ও পাতা লম্বা, ৫০-১০০ সেমি পর্যন্ত গভীর পানিতে এই জাতের ধান ফলে। দেশের সর্বত্র অগভীর প্লাবণ ভূমিতে এই ধান চাষ করা যায়। ভাসমান ধানের চাষ হয় ১০০ সেন্টিমিটারের অধিক গভীর পানিতে। ভাসমান জলিধান অত্যন্ত আলোককাল সংবেদনশীল| আলোককাল সংবেদনশীলতার কারণে প্লাবনকালীন একটি উপযুক্ত সময়ে এই ধানে ফুল ফোটে এবং তাতে প্রজনন পর্যায়ে এই ধান নিম্নতাপের বিরূপ প্রতিক্রিয়া এড়িয়ে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফসল পাকতে শুরু করে। ভাসমান জলিধানের তিন প্রকার অভিযোজন ক্ষমতা আছে। ১. পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধান গাছের লম্বা হওয়ার সামর্থ্য; ২. পানির মধ্যে উপরের পর্বসন্ধি থেকে শিকড় ও পাশর্^চারা উৎপাদন এবং ৩. গাছের উপরের অংশগুলোর ঊর্ধ্বমুখিতা , যেজন্য বন্যার প্রকোপ কমে যাওয়ার পর জননাঙ্গগুলো পানির উপরে থাকে। জলিধান বন্যার আগে বৃষ্টি ভেজো শুষ্ক জমিতে ২-৩ মাস থাকে যখন গোড়া থেকে পাশ্বচারা গজায়| প্লাবিত হওয়ারপর ধানের গোছা বড় হতে থাকে এবং জীবনচক্রের অবশিষ্ট ৩-৫ মাস পানিতে কাটে। পর্বসন্ধির শিকড়গুলো পানি থেকে নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও অন্যান্য পুষ্টি শোষণ করে। পানি গভীরতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পর্বমধ্যের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেতে থাকে। জলিধানের চাষাবাদ খরচ সামান্যই। চাষের সময় সামান্য সার প্রয়োগ ও নিড়ানি যথেষ্ট। একসময় দেশের হাওড় ও নিম্নাঞ্চলে এই ভাসমান আউশ ও আমন ধানের চাষাবাদ হতো যা দেশের ধানযোগ্য চাষের জমির ৩৯ শতাংশ। ষাটের দশক পর্যন্ত দেশের সকল হাওড় অঞ্চল, রাজশাহীর চলবিল, বৃহত্তর ঢাকা ও ফরিদপুরের বিলাঞ্চল ও বরিশালের নিম্নাঞ্চলে এই ভাসমান জলিধানের চাষাবাদ জনপ্রিয় ছিল। আমার জানামতে ১৯৮৫ মাল পর্যন্ত বরিশালের নিম্নাঞ্চল ও ফরিদপুরের বিলাঞ্চলে জলি আউশ-আমন ধানের চাষ অব্যাহত ছিল। জলি আমন ধানের স্থানীয় নাম পৌষ ধান কিংবা কার্তিক ধান। বাংলাদেশে জলিধানের প্রায় ২০০০ কালটিভার বা জাত আছে এবং গোটা এশিয়ায় আছে ৬০০০ বা ততোধিক কালটিভার। ১৯৩৪ সালে হবিগঞ্জের নাগুড়াতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ‘গভীর পানির ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠান’। গচি, রাতা, টেপি, বইয়াখাওরী, গদালাকি, সমুদ্রফেণা, সকালমুখী, হাতিবান্ধা, চুরাক, লাখাইয়ের মত গভীর পানির ধানের জন্ম হাওড়ে। ফরিদপুরের বিলাঞ্চলে হতো আগাম জাতের গভীর পানির দীঘা ধান। ছিল কাজলী, বৈলা ইত্যাদি আরো হরেক রকমের গভীর পানির নানাজাতের ধান| হেক্টর প্রতি গড়ে উৎপাদন ছিল আউশ ১.২ মেট্রিক টন এবং আমন ১.৫২ মেট্রিক টন ; সর্বমোট গড় উৎপাদন ছিল ২.৭২ মেট্রিক টন। স্থানীয় সনাতনী জাতের এসব ধানে দানার পরিমান কম হলেও ছিল আগাম বন্যা, খরা, শিলাবৃষ্টি সহিষ্ণু ক্ষমতা। হাওড় ও বিলের শক্তিময় ধানের জাতগুলোকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও চাষের ক্ষেত্রে প্রণোদনার পাশাপাশি এসব ধানের হাইব্রিড জাত উদ্ভাবনের জন্য রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে উদ্যোগ থাকা আবশ্যক। বর্তমান বিশ্বে ধান, ফল ও অন্যান্য দানাদার শস্যের যে উচ্চ ফলনশীল জাতের উদ্ভাবন অব্যাহত আছে, তাতে অদুর ভবিষ্যতে উচ্চ ফলনশীল জলিধান আবিষ্কার অসম্ভব নয়। স্থানীয় জাতের জলিধানের অর্থনৈতিক গুরুত্ব শুধু ধান উ]পাদনের মধ্যেই সীমিত নয়, রয়েছে হাওড় ও বিলাঞ্চলের বিস্তর এলাকায় নানাবিধ রবিশষ্য আবাদের মাধ্যমে একফসলী জমিগুলোকে ন্যূনতম দুইফসলীতে রূপান্তরের সুযোগ। বছরের ৭-৮ মাস প্রাকৃতিক জলাধার হতে পারে বিনামূল্যে মাছ চাষের অভায়ারণ্য যার বাজারমূল্য লক্ষাধিক কোটি টাকা। প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট পক্ষের স্বদিচ্ছা একাগ্রতা। ●
অকা/কৃশি/সৈইহো/দুপুর/২০ মে, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ
বিশ্লেষণ লেখকের নিজস্ব
লেখক অর্থনীতি বিশ্লেষক ও পরিসংখ্যানবিদ
bikash.biswas751967@gmail.com
সর্বশেষ হালনাগাদ 5 minutes আগে

