অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরাইল যুদ্ধবিরতির ঘোষণায় ইতিবাচক ধারায় ফিরতে শুরু করেছে দেশের পুঁজি বাজার। ২৪ জুন টানা দ্বিতীয় দিনের মতো দেশের দুই পুঁজি বাজার সূচকের উন্নতি হয়েছে। লেনদেনের পুরোটা সময় সূচকের সাবলীল আচরণের ফলে এদিন বাজারগুলোতে বেড়েছে লেনদেনের পরিমাণও। পুঁজি বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলে বিশ্বের অন্যান্য দেশের পুঁজি বাজারের মতো আমাদের পুঁজি বাজারও ভবিষ্যতে স্বাভাবিক আচরণে ফিরবে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ২৪ জুন ২২ দশমিক ৬২ পয়েন্ট বেড়েছে। চার হাজার ৬৯৫ দশমিক ০৩ পয়েন্ট থেকে দিনের লেনদেন শুরু করা সূচকটি ২৩ জুন দিনশেষে পৌঁছে যায় চার হাজার ৭১৭ দশমিক ৬৫ পয়েন্টে। সকালে লেনদেন শুরু হওয়ার পর থেকে সূচক ছিল ঊর্ধ্বমুখী। বেলা ১১টার দিকে ডিএসই সূচক পৌঁছে যায় চার হাজার ৭৪২ পয়েন্টে। এ পর্যায়ে সূচকটির উন্নতি রেকর্ড করা হয় ৪৭ পয়েন্ট। তবে পরবর্তীতে মুনাফা তুলে নেয়ার প্রক্রিয়ায় কিছুটা বিক্রয়চাপের সৃষ্টি হয়। এতে দিনশেষে বৃদ্ধি পাওয়া সূচকের একটি অংশ হারায় বাজারটি। একই সময় বাজারটির অপর দুই সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি হয় যথাক্রমে ৮ দশমিক ৩৯ ও ৭ দশমিক ০৬ পয়েন্ট।
দেশের দ্বিতীয় পুঁজি বাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই এ দিন ৯৬ দশমিক ৭৪ পয়েন্ট বেড়েছে। বাজারটির অন্য দুই সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ৮৪ দশমিক ২৩ ও ৫৫ দশমিক ৯৮ পয়েন্ট।
সূচকের টানা উন্নতির ফলে ২৪ জুন দুই পুঁজি বাজারেই লেনদেনেরও উন্নতি ঘটে। ঢাকা শেয়ার বাজার ২৪ জুন ৩৭২ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিন অপেক্ষা ৯৬ কোটি টাকা বেশি। ২২ জুন বাজারটির লেনদেন ছিল ২৭৬ কোটি টাকা। অন্যদিকে চট্টগ্রাম শেয়ার বাজারের লেনদেন ১১ কোটি টাকা থেকে পৌঁছে যায় ২৯ কোটি টাকায়।
এ দিকে দেশের পুঁজি বাজারে তালিকাভুক্ত প্রকৌশল খাতের কোম্পানি রতনপুর স্টিল অ্যান্ড রিরোলিং মিলসের (আরএসআরএম) বিরুদ্ধে অর্থপাচার ও ঋণখেলাপির অভিযোগ তদন্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছে পুঁজি বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখিয়ে চট্টগ্রামভিত্তিক এ প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। কোম্পানির প থেকে বলা হযছে, বিদ্যুৎসঙ্কট, তারল্য ঘাটতি এবং কাঁচামালের অভাবসহ বিভিন্ন জটিলতার কারণে ফের উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে এসব অজুহাতের আড়ালে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে রয়েছে অর্থপাচার এবং ঋণখেলাপির গুরুতর অভিযোগ। এ প্রেেিত কোম্পানিটির সার্বিক কার্যক্রম খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএসইসি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা যায়।
সূত্র অনুসারে কোম্পানির সার্বিক বিষয় তদন্তের জন্য বিএসইসি তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে। কমিটিকে ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্তকার্যক্রম শেষ করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিএসইসির মার্কেট ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগ থেকে ১০টি নির্দেশনা দিয়ে তদন্ত কমিটির আদেশ জারি করা হয় এবং এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালককেও অবহিত করা হয়েছে।
তদন্ত কমিটির সদস্যরা হলেন- বিএসইসির উপপরিচালক মো. শাহনেওয়াজ, সহকারী পরিচালক মাহমুদুর রহমান এবং সহকারী পরিচালক ফারহানা ওয়ালেজা।
কমিটি কোম্পানিটির কারখানা, অফিস, আর্থিক হিসাব এবং ব্যবসায়িক অন্যান্য কার্যক্রম তদন্ত করবে। বিশেষ করে ২০২২ সালের ৪ জুলাই কমিশনে দাখিল করা পূর্ববর্তী তদন্ত প্রতিবেদনের আইন লঙ্ঘনের বিষয়গুলো পর্যালোচনা; ২০২১ সালের ৩০ জুনের পর থেকে আর্থিক প্রতিবেদন জমা না দেয়ার কারণ; কোম্পানির সামগ্রিক অবস্থা এবং ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সমতা নিয়ে কোনো শঙ্কা আছে কি না, সে বিষয়ে প্রতিবেদন দিতে হবে। এ ছাড়া কোম্পানির প্রসপেক্টাস ও অনুমোদন অনুসারে আইপিও-এর ৩০ কোটি টাকা ব্যবহারের অনিয়ম; ঋণ ও মূলধন ব্যবহারে অনিয়ম; কোম্পানির অর্থপাচারের সাথে জড়িত মামলাগুলো যাচাই এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিষয়ে রিপোর্ট; কোম্পানির শীর্ষ পর্যায়ের ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা, পরিচালনা পর্ষদ এবং অন্যদের সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘনে জড়িত থাকার বিষয়াদি তদন্তে যাচাই-বাছাই করা হবে।
এ ছাড়াও তদন্তে ২০২১ সালের ৩০ জুন পরবর্তী কোনো আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি হয়ে থাকলে তার রাজস্ব আয়, বিক্রয়কৃত পণ্যের মূল্য, কর-পরবর্তী নেট মুনাফা, শেয়ারপ্রতি মুনাফা (ইপিএস), নেট সম্পদ মূল্য, ইনভেন্টরি, অগ্রিম, আমানত, নগদ অর্থ, শেয়ার মূলধন, দীর্ঘ ও স্বল্প মেয়াদি দায়সহ অন্যান্য আর্থিক বিষয়গুলোর সত্যতা যাচাই করা হবে।
প্রসঙ্গত দীর্ঘদিন ধরে পুঁজি বাজারে বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার নিয়ে যে কারসাজির ঘটনা ঘটেছে তাতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এসব কোম্পানির উদ্যোক্তারাও নানাভাবে জড়িত থাকার প্রমাণ মিললেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এ ছাড়া কোম্পানির তালিকাভুক্তির পূর্বাপর আর্থিক প্রতিবেদনে যে অসামঞ্জস্যতা তা নিয়েও মোটাদাগে কোনো তদন্ত করা হয়নি। কিন্তু ২০২৪ সালের পটপরিবর্তনের পর পুনর্গঠিত বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বে গঠিত কমিশন বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে আইন লঙ্ঘনকারী কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
ডিএসই থেকে পাওয়া তথ্যানুসারে আরএসআরএম ২০১৪ সালে শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত হয় এবং ২০২০ সালের শেষ দিকে এর উৎপাদনকার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে কোম্পানিটি আর উৎপাদনে ফিরতে পারেনি, এমনকি পাঁচ বছরেও কোনো আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ বা ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেনি। স্টক এক্সচেঞ্জের ওয়েবসাইটেও ২০২১ সালের পর আরএসআরএমের কোনো হালনাগাদ আর্থিক তথ্য নেই। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থ বছরের নিরীতি আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে শেয়ার হোল্ডারদের জন্য কোনো ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেনি প্রতিষ্ঠানটি। তবে সর্বশেষ ২০২০ সালে তারা ১০ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড দিয়েছিল।
রতনপুর স্টিল মিল বর্তমানে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে অবস্থান করছে। এর মোট পরিশোধিত মূলধন ১০১ কোটি ১৮ লাখ ৯০ হাজার টাকা এবং মোট শেয়ারসংখ্যা ১০ কোটি ১১ লাখ ৮৯ হাজার ৮৮টি। চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত কোম্পানিটি শেয়ার ধারণের তথ্য হালনাগাদ করেছে। তাতে দেখা যায়, কোম্পানির উদ্যোক্তাদের কাছে ২৯.৯৩ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ৩৪.০৮ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে ৩৫.৯৯ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। ●
অকা/পুঁবা/ফর/বিকাল/২৫ জুন, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 8 months আগে
