অর্থকাগজ ডেস্ক
ইরানের সঙ্গে দীর্ঘায়িত সামরিক সংঘাতের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বাজেটের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। যুদ্ধ পরিচালনায় কয়েক মাসে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করায় পেন্টাগনের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তহবিল দ্রুত শেষের পথে। এ পরিস্থিতিতে যুদ্ধ পরিচালনা অব্যাহত রাখতে হোয়াইট হাউস কংগ্রেসের কাছে জরুরি ভিত্তিতে ৬৭ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত বরাদ্দ চেয়েছে। তবে রাজনৈতিক মতভেদের কারণে সেই অর্থ অনুমোদন এখনো অনিশ্চিত।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের ব্যয়ভার এতটাই বেড়েছে যে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পেন্টাগনের কিছু পরিচালন তহবিল প্রায় শেষ হয়ে যেতে পারে। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কংগ্রেসের সদস্য ও প্রতিরক্ষা বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা।
যুদ্ধের খরচে চাপে সামরিক প্রস্তুতি
অর্থসংকটের প্রভাব ইতোমধ্যে সামরিক কার্যক্রমে পড়তে শুরু করেছে। পেন্টাগন প্রশিক্ষণ, সামরিক মহড়া এবং বিভিন্ন রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমে ব্যয় কমিয়ে এনেছে। এমনকি কিছু মহড়া স্থগিত বা সীমিত করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বর্তমান পরিস্থিতিতে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করাই সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। গত এক সপ্তাহের সংঘাতে চার মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার পর ওয়াশিংটন আরও বড় ধরনের সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এতে ব্যয়ের চাপ আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কংগ্রেসে অর্থ বরাদ্দ নিয়ে অনিশ্চয়তা
যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে হোয়াইট হাউস ৬৭ বিলিয়ন ডলারের জরুরি তহবিল চাইলেও কংগ্রেসে এখনো এ বিষয়ে ঐকমত্য হয়নি। প্রতিনিধি পরিষদ শিগগিরই এক মাসের বিরতিতে যাচ্ছে। ফলে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের সিদ্ধান্ত আরও বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
হাউস আর্মড সার্ভিসেস কমিটির রিপাবলিকান সদস্য প্যাট হ্যারিগান বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। দ্রুত সিদ্ধান্ত না নিলে সামরিক প্রস্তুতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
মঙ্গলবার সিনেট অ্যাপ্রোপ্রিয়েশনস কমিটির শুনানিতে প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন যুদ্ধ পরিচালনার জন্য অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরবেন। যুদ্ধ শুরুর পর এটাই হবে তাদের প্রথম আনুষ্ঠানিক শুনানি।
ব্যয়ের হিসাব নিয়ে বিতর্ক
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করেন। সে সময় তিনি দাবি করেছিলেন, অভিযান কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হবে। কিন্তু বাস্তবে সংঘাত কয়েক মাস ধরে চলেছে এবং এখনো শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
হোয়াইট হাউসের বাজেট পরিচালক রাসেল ভাউটের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। তবে স্বাধীন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, প্রকৃত ব্যয় এর চেয়ে অনেক বেশি। কারণ সরকারি হিসাবে ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন ঘাঁটি পুনর্নির্মাণ, অতিরিক্ত অস্ত্র উৎপাদন এবং দীর্ঘমেয়াদি সামরিক মোতায়েনের ব্যয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
অস্ত্রভাণ্ডার নিয়েও উদ্বেগ
যুদ্ধের কারণে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর ওপর। কংগ্রেসের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ২০২৬ অর্থবছরের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সামরিক বরাদ্দ চলতি মাসের শেষ নাগাদ শেষ হয়ে যেতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে পেন্টাগন প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র ক্রয় খাত থেকে ৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার অন্য খাতে স্থানান্তরের অনুমতি চেয়েছে। পাশাপাশি অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে অতিরিক্ত অর্থ সরিয়ে নেওয়ার কাজও চলছে।
যদিও প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডার এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী। তবে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং অন্যান্য আধুনিক অস্ত্রের মজুত দ্রুত কমে যেতে পারে। এতে রাশিয়া বা চীনের মতো সম্ভাব্য প্রতিপক্ষকে মোকাবিলার সক্ষমতাও প্রভাবিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
রাজনৈতিক বিভাজন বাড়ছে
যুদ্ধের অর্থায়ন নিয়ে ওয়াশিংটনে রাজনৈতিক বিভাজনও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। হাউসের রিপাবলিকানরা দ্রুত ৭৩ বিলিয়ন ডলারের নতুন প্রতিরক্ষা বরাদ্দ অনুমোদনের চেষ্টা করছেন। কিন্তু সিনেটে এ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। ডেমোক্র্যাটরা নতুন যুদ্ধ ব্যয়ের বিরোধিতা করছেন। এমনকি কয়েকজন রিপাবলিকানও পেন্টাগনের আর্থিক তথ্য প্রকাশে ধীরগতির সমালোচনা করেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, যুদ্ধের প্রকৃত ব্যয়, ব্যবহৃত অস্ত্রের সংখ্যা এবং নতুন অর্থের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে কংগ্রেসকে সময়মতো পূর্ণাঙ্গ তথ্য দিতে পারেনি প্রতিরক্ষা বিভাগ। ফলে অনেক আইনপ্রণেতা অতিরিক্ত অর্থ ছাড়ের আগে আরও বিস্তারিত হিসাব চাইছেন।
দীর্ঘ যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপ
ইরানের সঙ্গে সংঘাত শুধু যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বাজেটেই চাপ সৃষ্টি করেনি, এর প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও। হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনার কারণে জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তেলের বাজারেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক প্রতিরক্ষা বাজেট প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে কংগ্রেস অনুমোদিত ১৫০ বিলিয়ন ডলারের এককালীন বিশেষ তহবিলও রয়েছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসন ২০২৭ অর্থবছরের জন্য ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেট চেয়েছে, যা ইতোমধ্যে কংগ্রেসে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, ততই বাড়বে ব্যয়। আর সেই ব্যয় সামাল দিতে গিয়ে পেন্টাগনকে সামরিক প্রস্তুতি, অস্ত্র ক্রয় এবং রক্ষণাবেক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে কাটছাঁট করতে হলে তা দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
সর্বশেষ হালনাগাদ 11 hours আগে

