অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
দুই দিন ঘুরে না দাঁড়াতেই ফের বড় পতনের শিকার হয়েছে দেশের পুঁজি বাজার। ১৩ মে দেশের দুই পুঁজি বাজারেই সূচকের বড় ধরনের পতন ঘটে। লেনদেন হওয়া কোম্পানির ৭৫ শতাংশই এ সময় দর হারায়। চট্টগ্রাম শেয়ার বাজারে লেনদেন নামমাত্র বাড়লেও কমেছে ঢাকা শেয়ার বাজারে।

৭ মে পাক-ভারত যুদ্ধের খবরে দেশের পুঁজি বাজারগুলোতে সাম্প্রতিক সময়ের সর্বোচ্চ দরপতন ঘটে। পরদিনই যুদ্ধ বন্ধের খবরে হারানো সূচকের দুই-তৃতীয়াংশ ফিরে পায় বাজারগুলো। এরই ধারাবাহিকতার পরবর্তী কার্যদিস ১২ মে দুই পুঁজি বাজার সূচকে ছিল মিশ্র আচরণ। ওই দিন দুই বাজারেই প্রধান সূচকের সামান্য উন্নতি ঘটতে দেখা যায়। কিন্তু কোনো কারণ ছাড়াই ১৩ মে আবার বড় পতনের শিকার হলো পুঁজি বাজারগুলো।

প্রধান পুঁজি বাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ১৩ মে ৪৬ দশমিক ৯৭ পয়েন্ট অবনতি ঘটে। ওই দিন সকালে ৪ হাজার ৯২১ দশমিক ৫৫ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি দিনশেষে ৪ হাজার ৮৭৪ দশমিক ৫৮ পয়েন্টে স্থির হয়। একই সময় ডিএসইর অপর দুই সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ হারায় যথাক্রমে ১৬ দশমিক ৭৬ ও ১২ দশমিক ১০ পয়েন্ট। অপর দিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ৩৬ দশমিক ৯৩ পয়েন্ট হারায়। বাজারটির অন্য দুই সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি ঘটে যথাক্রমে ২৯ দশমিক ০৭ ও ১৯ দশমিক ৭৭ পয়েন্ট।

সকালে দুই পুঁজি বাজারই সূচকের উন্নতিতে দিন শুরু করে। বেলা ১১টার দিকে বাজারে প্রথম বিক্রয়চাপ সৃষ্টি হয়। পরবর্তী দুই ঘণ্টাব্যাপী দুই বাজারে সূচক ছিল ওঠানামার মধ্যে। কিন্তু বেলা দেড়টার দিকে বাজারগুলোতে বিক্রয়চাপ তীব্র আকার ধারণ করে। মাত্র ৪৫ মিনিটের মধ্যে ঢাকা শেয়ার বাজার ৫০ পয়েন্টর বেশি সূচক হারায়। এ সময় ব্যাংক, বীমা ও মিউচুয়াল ফান্ডসহ সকালে দিনের শুরুতে মূল্যবৃদ্ধি পাওয়া কোম্পানিগুলোর বেশির ভাগ পতনের শিকার হতে থাকে।

এ দিকে গত কিছুদিনের পুঁজি বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিনিয়োগকারীরা মন্দা বাজারে মৌলভিত্তির চেয়ে মূল্যস্তরের তলানীতে থাকা কোম্পানি ও ফান্ডগুলোর দিকেই বেশি নজর দিচ্ছেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্যাংক, বীমা ও মিউচুয়াল ফান্ড। পুঁজি বাজারের সবচেয়ে বড় মূলধনী খাত ব্যাংকিং খাত। এ খাতের বেশ কিছু কোম্পানি বিনিয়োগকারীদের জন্য স্বচ্ছতার সাথে আর্থিক বিবরণী প্রকাশ করলেও বেশ কয়েকটি কোম্পানি দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ সঙ্কটের কথা জানতে দেয়নি। গত বছরের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ব্যাংকিং খাতের বাস্তব চিত্র সবার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠলে এসব ব্যাংক ব্যাপকভাবে দর হারায়। এ ধরনের সব ব্যাংকের শেয়ারদর অভিহিত মূল্যের প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। আবার ব্যাংকিং খাতের অচলাবস্থার প্রভাব পড়ে বীমা খাতেও। গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে এ খাতও বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কাড়তে ব্যর্থ।

একইভাবে মিউচুয়াল ফান্ডের অবস্থা ছিল আরো খারাপ। দেশের পুঁজি বাজারে ৩৭টি মিউচুয়াল ফান্ড তালিকাভুক্ত থাকলেও এদের মধ্যে মাত্র চারটি ফান্ডই অভিহিত মূল্যের ওপরে লেনদেন হচ্ছে। বাকিগুলোর মধ্যে অর্ধেকের বেশি অভিহিত মূল্যের ৫০ ও ২৫ শতাংশের মধ্যে দর ওঠানামা করে।

সাম্প্রতিক সময়ে এ তিন খাতেই অবস্থান নিয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। জানা যায়, এদের মধ্যে ব্যক্তি বিনিয়োগকারীর চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর ভূমিকা বেশি। নিজেদের সক্ষমতাকে পুঁজি করে অপেক্ষাকৃত স্বল্প মূলধন বিনিয়োগ করে এ তিনটি খাত থেকে মুনাফা আয়ের পরিকল্পনা নিয়েছেন। এ কারণে গত কিছুদিন থেকে দুই পুঁজি বাজারের লেনদেন ও মূল্যবৃদ্ধিতে এ খাতগুলোর প্রাধান্য প্রকাশ পাচ্ছে। বিশেষ করে সবচেয়ে কম মূল্যস্তরে থাকা মিউচুয়াল ফান্ডগুলো গত দু’মাসের ব্যবধানে ২০ থেকে ৪০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে। আর এপ্রিলের শুরু থেকে ব্যাংকগুলোর দিকে দৃষ্টি দিয়েছেন তারা। এখন প্রায় প্রতিদিনই দুই বাজারের লেনদেন ও মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় জায়গা করে নিচ্ছে। ১৩ মে এ খাতগুলোতে মুনাফা তুলে নিতে গিয়ে ব্যাংক ও বীমা খাতের দরপতনই মূলত সূচকের বড় পতন ঘটিয়েছে এমনটিই মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

১৩ মে ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষ কোম্পানি ছিল মিডল্যান্ড ব্যাংক। ১৬ কোটি ২১ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ৬৪ লাখ ৬১ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় ১৩ মে। ১৫ কোটি ৮৮ লাখ টাকায় ৩০ লাখ ৬২ হাজার শেয়ার লেনদেন করে শীর্ষ তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে ছিল বিচ হ্যাচারি। ১৪ কোটি ১২ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন নিয়ে শীর্ষ তালিকার তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছে এনআরবি ব্যাংক।

ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ তালিকায় থাকা অন্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে ছিলÑ ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ফার্স্ট বাংলাদেশ ফিক্সড ইনকাম ফান্ড, বারাকা পতেঙ্গা পাওয়ার, এ বি ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, যমুনা ব্যাংক ও কেডিএস এক্সেসরিস। অপর দিকে, সিএসইতে লেনদেনের শীর্ষ কোম্পানির তালিকায় জায়গা করে নেয় যথাক্রমে খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ, লাভেলো আইসক্রিম, রবি অজিয়াটা, ইউসিবি, এনআরবি ব্যাংক, এবি ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, সিটি ব্যাংক, বারাকা পতেঙ্গা পাওয়ার, ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালস ও শাইনপুকুর সিরামিকস।

এ দিকে ১৩ মে লেনদেনে অংশ নেয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে ডিএসইর দর বৃদ্ধির শীর্ষে উঠে এসেছে ফার্স্ট বাংলাদেশ ফিক্সড ইনকাম ফান্ড। এদিন ফান্ডটির ইউনিট দর বেড়েছে ৩০ পয়সা বা ৮ দশমিক ১০ শতাংশ। দর বৃদ্ধির দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে সিটি জেনারেল ইন্স্যুরেন্স। কোম্পানিটির শেয়ার দর ৭ দশমিক ৪১ শতাংশ বেড়েছে। আর তৃতীয় স্থানে থাকা প্রাইম ফাইন্যান্স ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ডের দর বেড়েছে ৩ দশমিক ৯৪ শতাংশ। এ দিন দর বৃদ্ধির শীর্ষ তালিকায় উঠে আসা অপর কোম্পানিগুলো হলো- ইস্টার্ন লুব্রিকেন্টস, বাংলাদেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স, আইএসএন লিমিটেড, ইউসিবি, সমতা লেদার, হা-ওয়েল টেক্সটাইল ও গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স পিএলসি।

লেনদেনে অংশ নেয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে দর পতনের শীর্ষে ছিল ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান মাইডাস ফাইন্যান্সিং লিমিটেড। এ দিন কোম্পানিটির শেয়ারদর আগের দিনের তুলনায় কমেছে ১ টাকা ৪০ পয়সা বা ১৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ। দর পতনের শীর্ষ তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা এসইএমএল লেকচার ইক্যুইটি ফান্ডের শেয়ার দর কমেছে আগের দিনের তুলনায় ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ। দর পতনের শীর্ষ তালিকায় থাকা অন্য কোম্পানিগুলো ছিল এনআরবি ব্যাংক, শাইনপুকুর সিরামিকস, আইসিবি সোনালী ব্যাংক ফাস্ট মিউচুয়াল ফান্ড, এস আলম স্টিলস, এআইবিএল ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, আনলিমা ইয়ার্ন, আইসিবি এএমসিএল থার্ড এনআরবি মিউচুয়াল ফান্ড ও রেনউইক যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড। ●

অকা/পুঁবা/ফর/রাত/১৩ মে, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 10 months আগে

Leave A Reply

Exit mobile version