চৌধুরী মো. শাহেদ ●
দেশের বীমা খাতের নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এর সদস্য (লাইফ) কামরুল হাসানের বিরুদ্ধে তদন্তে নেমেছে খোদ অর্থ মন্ত্রণালয় এর আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। দীর্ঘদিন ধরে কামরুল হাসানের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) মো. আজিমুদ্দিন বিশ্বাস, এনডিসিকে কামরুল হাসানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত দুর্নীতি ও অনিয়ম তদন্ত সম্পন্ন করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে গত ১৮ জুলাই।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের উপসচিব মো. মামুনুর রশীদ স্বাক্ষরিত পত্রে (নম্বর-৫৩.০০.০০০০.২৩১.৯৯.০০১.২৪.৮৩) বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. আজিমুদ্দিন বিশ্বাস, এনডিসির কক্ষে (নং-৩১৮, চতুর্থ তলা,ভবন-০৭, বাংলাদেশ সচিবালয়) গত ২৫ জুলাই দুপুরে প্রথম শুনানী অনুষ্ঠিত হয়। তবে দেশে বিদ্যমান অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে সচিবালয়ের এ শুনানীতে এ দিন ৩ জন সাক্ষীর কেউ উপস্থিত থাকতে পারেননি বলে জানা গেছে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সংশ্লিষ্ট পদস্থ একজন কর্মকর্তা অর্থকাগজকে জানান, লাইফ সদস্যের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির বেশ কিছু কাগজপত্র বিভাগে জমা পড়েছে। এ ব্যাপারে অভিযোগকারী ও সাক্ষীদের উপস্থিতিতে একাধিক শুনানী অনুষ্ঠিত হবে। আগামীকাল (২৮ জুলাই, ২০২৪) দুপুর বারোটায় মো. আজিমুদ্দিন বিশ্বাস, এনডিসির কক্ষে অভিযুক্ত সদস্য এবং সাক্ষীর বক্তব্য নিয়ে শুনানী হবে। একাধিক শুনানীর ওপর ভিত্তি করে উভয় পক্ষের মতামত গ্রহণ ছাড়াও কাগজপত্রের সত্যতা প্রমাণের পর তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিল করবেন। এরপর বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এর সদস্য (লাইফ) কামরুল হাসানের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
জানা গেছে, দেশের জীবন বীমা পেশায় কামরুল হাসান দীর্ঘ ২০ বছরের ওপরে সংপৃক্ত। চট্টগ্রামের পটিয়ার সন্তান কামরুল হাসান আমেরিকান লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে (আলীকো) বর্তমান মেটলাইফ এ ম্যানেজমেন্ট এসোসিয়েট হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু করেন। ৬ বছর কাজ করেন এখানে তিনি। সর্বশেষ এখানে তিনি দাবী বিভাগের প্রধান ছিলেন। কিন্তু ঘন ঘন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া আসার কারণে মেটলাইফ এ চাকরি করার ক্ষেত্রে তার সমস্যা তৈরি হয়। ফলে মেটলাইফ থেকে চাকরি ছেড়ে তিনি ন্যাশনাল লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এ উপ ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে যোগদান করেন। ৩ বছর চাকরি করার পর তিনি দুবাই চলে যান । এক বছর পর দেশে ফিরে প্রগতি লাইফে উপ ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে যুক্ত হন তিনি। বিশিষ্ট বীমাবিদ জাফর হালিম (প্রয়াত), একচ্যুয়ারী ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদ থেকে চলে গেলে তিনি এখানে ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে তার স্থলাভিষিক্ত হন। প্রগতি লাইফে ডিএমডি ও ভারপ্রাপ্ত এমডি পদে মোট ৬ বছর কাজ করে চার্টার্ড লাইফে এমডি পদে ৭ মাস এবং প্রোটেক্টিভ লাইফে একই পদে দেড় বছর দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এরপর কাজ না পেয়ে ৬/৭ মাস বসে থাকেন তিনি। এরপর কিছুদিন পর বায়রা লাইফের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা পদে কাজ করে সেখান থেকে ইস্তফা দেন কামরুল। তারপর পদ্মা ইসলামী লাইফে মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (চঃ দাঃ) পদে ৬ মাস তিনি কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। বাংলাদেশ ব্যাংক এ সিআইবি (ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো) প্রতিবেদনে ক্রেডিট কার্ড সংক্রান্ত ঋণখেলাপী হওয়ায় পদ্মা ইসলামী লাইফের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) নিয়মিত পদে তিনি অযোগ্য হন। ফলে বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক তার নিয়োগ অনুমোদন বাতিল করে।
আইডিআরএ বেশ কয়েক বছর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য পদগুলো শূন্য ছিল। অর্থ মন্ত্রণালয় এর আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলে সদস্য (লাইফ) পদে তিনি চাকরির জন্য আবেদন করে পরীক্ষায় অবতীর্ণ হন। ২০২২ সালের ২৩ জুন বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এর সদস্য (লাইফ) পদে অভিজ্ঞ বীমা নির্বাহী কামরুল হাসানকে ৩ বছরের জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ নিয়োগ প্রদান করে। নিয়োগ পাওয়ার কিছুদিনের মধ্যে তার বিরুদ্ধে দেশের জীবন বীমা কোম্পানি থেকে অনিয়মের অভিযোগ আসতে শুরু করে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে- বীমা দাবীর চেক বিতরণ অনুষ্ঠানে কোম্পানির কাছ থেকে ‘প্যাকেট’ গ্রহণ, কোম্পানির অর্থে দেশ-বিদেশে আনন্দ ভ্রমণ, ‘বিশেষ ব্যবস্থার বিনিময়ে’ ভূয়া শিক্ষা সনদ, অভিজ্ঞতা ও বয়স সময়কালের অযোগ্য প্রধান নির্বাহীদের সুবিধা দেওয়ার সুপারিশ করা, বছরের পর বছর অবৈধভাবে চলতি দায়িত্বে সিইওদের টিকিয়ে রাখা, যোগ্যদের ফাইল আটকে রাখা, অন্য কোম্পানির ছাড়পত্রবিহীন সিইওদের নতুন কোম্পানিতে যোগদানের ক্ষেত্রে ‘আর্থিক’ সুবিধায় তাদের ছাড় দেওয়া। শোনা যায় আইডিআরএ’র বিতর্কিত সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোশাররফ হোসেনের সময়ে চেয়ারম্যান, সদস্য (লাইফ) ও পরিচালককে (লাইফ) কুরবানীর উপহারস্বরূপ প্রায় ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে ষাঁড় কিনে পাঠিয়েছিলেন সোনালী লাইফের সাবেক সিইও।
দুর্নীতি ও অনিয়মে অভিযুক্ত আইডিআরএ সদস্য কামরুল হাসানের জন্য বিব্রত লাইফ কোম্পানির মালিক ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। ভয়ে তারা কিছুই বলতে পারেন না। একের পর এক ‘সুবিধা’ দিতে গিয়ে কোম্পানির বার্ষিক ব্যবস্থাপনা ব্যয় বেড়ে যায়। ‘সুবিধার এ খরচ’ কোম্পানির হিসাবের খাতায় অন্য ‘হেডে’ হিসাবরক্ষকগণ যুক্ত করে বার্ষিক হিসাব ও উদ্বৃত্তপত্র (ব্যালেন্সশীট) প্রস্তুত করেন। কোম্পানিগুলো এ ধরনের অনিয়মের কারণে বেশ সমস্যায় পড়ে যেমন, তেমনি অনিয়ম করার সুযোগও পায় তারা! এতে করে বীমা কোম্পানিগুলো উন্নতি করতে ব্যর্থ হচ্ছে।
আইডিআরএ’র একটি নির্ভরযোগ্য জানায়, সদস্য (লাইফ) কামরুল হাসানের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ থাকায় বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জয়নুল বারী তাকে অপছন্দ করেন। কোম্পানি পরিচালনায় পারতপক্ষে তিনি সদস্যকে (লাইফ) ফাইল দেন না । বরং নিচের পদের কর্মকর্তাকে কাজ সম্পাদনের জন্য চেয়ারম্যান দায়িত্ব দিয়ে থাকেন।
গত বছর অনৈতিক পথ অবলম্বন করে অর্থ দাবীর অভিযোগ ওঠে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ এর (আইডিআরএ) সদস্য (লাইফ) কামরুল হাসানের বিরুদ্ধে। এ অভিযোগ ওঠে প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড থেকে।
প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড এর ভারপ্রাপ্ত সিইও মো. জহির উদ্দিনকে সদস্য (লাইফ) কামরুল হাসান বলেন, ‘তোমার বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে আইডিআরএ’র চেয়ারম্যান বলেছেন, তোমার বিষয়টি চেয়ারম্যান নিজে দেখছেন, মন্ত্রণালয় দেখছে, এটা আমার হাতে নাই, ওপরে চলে গেছে, তুমি এখানে (আইডিআরএ) আসলে শুধু আমার সাথে দেখা করবা। অন্য কারো সাথে দেখা করবা না বলে প্রগ্রেসিভ লাইফের ভারপ্রাপ্ত সিইওকে ভয় দেখান কামরুল হাসান!
দেশের শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত বীমা খাতের জীবন বীমা কোম্পানি প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড এর কোম্পানি সচিব ও ভারপ্রাপ্ত মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহির উদ্দিনকে প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে কোম্পানির এমডি বানিয়ে দিবেন বলে সদস্য (লাইফ) কামরুল হাসানের বিরুদ্ধে তখন অভিযোগ ওঠে।
সে সময় জানা যায়, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ এর (আইডিআরএ) সদস্য (লাইফ) প্রগ্রেসিভ লাইফের হুমায়ুন নামের সাবেক এক মাঠ নির্বাহী কর্মকর্তা, যিনি কামরুল হাসানের ঘনিষ্ঠ ও পূর্ব পরিচিত; তার মাধ্যমে জহির উদ্দিনকে ডেকে পাঠান এই কামরুল হাসান। কামরুল হাসান তার অফিস কক্ষে জহির উদ্দিনকে তখন বলেন, ‘আমার স্ত্রী ও মেয়ে দেশের বাহিরে থাকে; তাদের টাকা পাঠাতে হয়। আমি খুব কম টাকা বেতন পাই, তাতে আমার চলে না। গাড়ির ২০০ লিটার জ্বালানি সরকার দেয়, তাতেও চলে না, গুলশান যেতে আসতে অর্থ শেষ হয়ে যায়। প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা এবং আমাকে নিয়ে বীমা দাবী পরিশোধের মিটিং করবা। প্রতিটি সভায় ২ লাখ টাকা করে সম্মানী দিবা।’
প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড এর ‘বিতর্কিত’ ও ক্ষমতাবান কোম্পানি সচিব এবং ভারপ্রাপ্ত মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহির উদ্দিন (বর্তমানে সাবেক) সে সময় কামরুল হাসানের অনৈতিক এ আবদার নিয়ে গোটা বীমা পাড়ায় তোলপাড় শুরু করে দেন। বিক্ষুদ্ধ মো. জহির উদ্দিন কামরুল হাসানের বিষয়টি মিডিয়াসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে তখন অবহিত করেন।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের উপসচিব মো. মামুনুর রশীদ স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তি পত্রে প্রাপক হিসেবে মো. জহির উদ্দিনের নাম উল্লেখ রয়েছে। তাতে ঠিকানা রয়েছে -৮৫, সেন্ট্রাল বাসাবো, সবুজবাগ, ঢাকা। বিজ্ঞপ্তি পত্রের প্রেরক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের উপসচিব মো. মামুনুর রশীদের সঙ্গে প্রগ্রেসিভ লাইফের সাবেক কর্মকর্তা মো. জহির উদ্দিনের কথা হয়েছে বলে তিনি অর্থকাগজকে জানান।
উল্লেখ্য, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এর সদস্য (লাইফ) কামরুল হাসান অভিজ্ঞ বীমা নির্বাহী হওয়া সত্ত্বেও সাংবাদিকদের সব সময় এড়িয়ে চলেন। ফোন করা হলে তিনি কল গ্রহণ করেন না। কথা বলতে ইচ্ছা প্রকাশ করেন না। রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানে বেশ উচ্চাবিলাসী কামরুল হাসান পৈত্রিক বাড়ীতে বসবাস করেন। ঘন ঘন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যান তিনি। তার একমাত্র কন্যা ও সহধর্মিণী বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী প্রবাসী। ●
অকা/ বীখা/ বিপ্র/ রাত, ২৭ জুলাই, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 1 year আগে

