অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
মার্কিন প্রেসিডেন্টের নতুন করে শুল্কারোপের ঘোষণা গোটা বিশ্বের পুঁজি বাজারকে আবারো অস্থির করে তুলেছে। বড় পতনের শিকার হয়েছে খোদ মার্কিন পুঁজি বাজারও। আমাদের পুঁজি বাজারও তার ব্যতিক্রম নয়। ৮ জুলাই বিনিয়োগকারীদের চমকে দিয়ে লেনদেন শুরুর প্রথম ১০ মিনিটেই ২৫ পয়েন্টের মতো সূচক হারায় ঢাকা শেয়ারবাজার। এক দিন আগে যে বাজারে ৮২ পয়েন্ট উন্নতি ঘটে সূচকের সেখানে ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে বাজারের এ হেন আচরণ চমকে দেয় সবাইকে। তবে ভাগ্য ভালো দিনশেষে এ চমকে যাওয়া আতঙ্কে রূপ নেয়নি।
প্রথম দিকে এ পতন সামলে নিয়ে দ্রুতই ঘুরে দাঁড়ায় বাজার। তবে দিনের বাকি সময়ে আরো দু’বার এটা ঘটলে সূচকের অস্থিরতা প্রকাশ পায়; কিন্তু তা সত্ত্বেও দিনশেষে পরিস্থিতি পাল্টে গিয়ে সবগুলো সূচকের কমবেশি উন্নতি ঘটার পাশাপাশি দেশের প্রধান পুঁজি বাজারটির লেনদেন পৌঁছে যায় ৬০০ কোটির ঘরে। এভাবে সূচকের অস্থির আচরণের মধ্যেও চার মাস পর ঢাকা পুঁজি বাজারের লেনদেন এ পর্যায়ে পৌঁছল। সর্বশেষ গত ২৫ ফেব্রুয়ারি ৬০০ কোটি টাকা লেনদেন নিষ্পত্তি করে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)।
সূচকের এ ধরনের আচরণের কারণ হিসেবে মাকিন প্রেসিডেন্ট কর্তৃক নতুন করে শুল্ক আরোপকেই দায়ী করছেন পুঁজি বাজার সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, পুঁজি বাজার খুবই সংবেদনশীল জায়গা। বিশেষ করে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান খাত তৈরী পোশাক রফতানির একটি বড় অংশই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছে। আর বস্ত্র খাত শেয়ারবাজারের একটি বড় অংশীদার। ফলে নতুন এ শুল্ক আরোপের ঘোষণা পুঁজি বাজারকে কমবেশি প্রভাবিত করতেই পারে। তবে তাদের মতে, যেকোনো পরিস্থিতিতে বাজার আচরণকে বোঝার চেষ্টা করা উচিত। তা না করে আতঙ্কিত হয়ে লোকসান দিয়ে শেয়ার বিক্রি করে দেয়া কোনো সমাধান নয়। এতে বিক্রয়চাপ তৈরি হয়ে বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৮ জুলাই ৫ দশমিক ৪৭ পয়েন্ট উন্নতি ঘটে। ৪ হাজার ৯৭৬ দশমিক ১৬ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি ৮ জুলাই দিনশেষে ৪ হাজার ৯৮১ দশমিক ৬৩ পয়েন্টে স্থির হয়। তবে প্রথম ১০ মিনিটের মাথায় সূচকটি নেমে আসে ৪ হাজার ৯৫৩ পয়েন্টে। প্রথম দিকের এ বিক্রয়চাপ দ্রুত সামলে নিলেও বেলা ১১টার কিছু আগে সূচকটি আবারো ২০ পয়েন্টের বেশি পতনের শিকার হয়। দ্বিতীয়বারের এ চাপ সামলে ফের ঊর্ধ্বমুখী হয় বাজার সূচক। দুপুর ১২টার দিকে সূচকটি পৌঁছে যায় ৪ হাজার ৯৮১ পয়েন্টে। তবে এটাই শেষ নয়, এখান থেকে ফের বিক্রয়চাপের মুখে পড়ে বাজার। বেলা ১টার পর আবার ৪ হাজার ৯৫০ পয়েন্টে নেমে আসে সূচক। এ পর্যায়ে সূচকের ২৬ পয়েন্টের বেশি অবনতি ঘটে। তবে পরিস্থিতি পাল্টে এ যাত্রাও বিক্রয়চাপ সামলে নেয় বাজারটি। দিনশেষে ৫ দশমিক ৪৭ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখে সূচকটি।
এ দিকে পুঁজি বাজারে নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্তি বন্ধ রয়েছে। জুলাইয়ের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ১১ মাসে কোনো কোম্পানি পুঁজি বাজারে তালিকাভুক্ত হয়নি। দীর্ঘ দিন ধরেই উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) নিয়ে ভোগান্তি ও দীর্ঘসূত্রিতার অভিযোগ রয়েছে। তবে ৮ জুলাই এই সমস্যার সমাধানে আশার আলো দেখিয়েছেন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম।
তিনি জানিয়েছেন, আগামী দিনে ছয় মাসের কম সময়েই আইপিও প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। মঙ্গলবার (৮ জুলাই) বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমবিএ) আয়োজিত ‘ক্যাপিটাল মার্কেটের সম্প্রসারণ : টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য একটি কাঠামো’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন বিএমবিএ সভাপতি মাজেদা খাতুন।
ডিএসই চেয়ারম্যান বলেন, ‘গত এক বছরে কোনো আইপিও আসেনি। এটা বিএসইসির একক দায়িত্ব নয়। মার্চেন্ট ব্যাংকারদেরই মূল দায়িত্ব এই প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নেয়ার।’ তিনি আরো জানান, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ইতোমধ্যে স্টক এক্সচেঞ্জের কাছে লিস্টিংয়ের দায়িত্ব হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে করে আইপিও প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা অনেকটাই কমবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
মমিনুল ইসলাম বলেন, ‘গত ১৫ বছরে ৬৬টি মার্চেন্ট ব্যাংক মিলে ১৩৮টি কোম্পানি শেয়ারবাজারে এনেছে; কিন্তু এই সংখ্যার তুলনায় গুণগত মান ও বাজারে এসব কোম্পানির উপস্থিতি প্রশ্নবিদ্ধ। তালিকাভুক্তির আগে কোম্পানিগুলো যে তথ্য প্রদান করেছে পরে তা বজায় থাকেনি। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। তিনি স্বীকার করেন, সব কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়বে, এটা আশা করাও ঠিক নয়। তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন, গত ১৫ বছরে আমাদের শেয়ারবাজারে অনেক অনিয়ম হয়েছে। এ অনিয়ম ছিল ভয়াবহ আকারের। এখন সেই অনিয়ম দূর করার প্রক্রিয়া চলছে, তবে তাৎণিক এটা সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য সময় লাগবে।’
আলোচনায় অংশ নিয়ে তালিকাভুক্ত কোম্পানি এপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, ‘বাংলাদেশে একটি আইপিও অনুমোদন পেতে দুই-তিন বছর সময় লাগে, যেখানে ভারতে একই প্রক্রিয়া মাত্র ছয় মাসে সম্পন্ন হয়। আমাদের এখানেও এই প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত করতে হবে। তাহলেই উদ্যোক্তারা বাজারে তালিকাভুক্তিতে উৎসাহিত হবেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার অর্থবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেনÑ আইসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিরঞ্জন চন্দ্র দেবনাথ, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান। ●
অকা/পুঁবা/ফর/রাত/৮ জুলাই, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 8 months আগে

