অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
সপ্তাহের শুরুতেই বড় দরপতনের শিকার হয়েছে দেশের পুঁজি বাজার। ১৩ এপ্রিল সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে দেশের দুই পুঁজি বাজারই বড় ধরনের সূচক হারিয়েছে। এ সময় প্রধান পুুঁজি বাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সবগুলো সূচকের অবনতি ঘটে। পক্ষান্তরে, দেশের দ্বিতীয় পুঁজি বাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সিএসই-৩০ সূচকটি সামান্য উন্নতি ধরে রাখলেও বাকি দুই সূচকের পতন ঘটে। সূচকের বড় ধরনের অবনতি ঢাকা বাজারের লেনদেনে অবনতি ঘটালেও চট্টগ্রাম শেয়ার বাজারে বেশ খানিকটা বেড়েছে দিনের লেনদেন।
গত সপ্তাহের শেষদিকে পুঁজি বাজারগুলো সূচকের কিছুটা উন্নতির মুখ দেখলেও এ সপ্তাহের শুরুতেই ফের হোঁচট খায়। ঢাকা শেয়ার বাজারের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ১৩ এপ্রিল ৩৫ দশমিক ৫৫ পয়েন্ট হ্রাস পায়। ডিএসইর অন্য দুই সূচক ডিএসই-৩০ ডিএসই শরিয়াহ হারায় যথাক্রমে ১৫ দশমিক ৯২ ও ৬ দশমিক ৭৪ পয়েন্ট। একই সময় চট্টগ্রাম শেয়ার বাজারে সার্বিক মূল্যসূচকের ৩৮ দশমিক ৪৯ পয়েন্ট অবনতি ঘটে। এখানে সিএসই-৩০ সূচকটি ২৪ দশমিক ৭৬ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখলেও সিএসইএক্স সূচকটি ২৪ দশমিক ৯২ পয়েন্ট হ্রাস পায়। দরপতনের শিকার ছিল উভয় বাজারের প্রায় ৭০ শতাংশ কোম্পানি।
সূচকের অবনতি প্রভাবিত করে ঢাকা শেয়ার বাজারের লেনদেনকে। ১৩ এপ্রিল বাজারটি মোট ৪১৪ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিন অপেক্ষা ১২৬ কোটি টাকা কম। ১০ এপ্রিল ডিএসইর লেনদেন ছিল ৫৪০ কোটি টাকা। পক্ষান্তরে, চট্টগ্রাম শেয়ার বাজার এ দিন ১৫ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিন অপেক্ষা আট কোটি টাকা বেশি। ১০ এপ্রিল সিএসইর লেনদেন ছিল ছয় কোটি ৮৪ লাখ টাকা।
এদিকে আগামী ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের বাজেটে পুঁজি বাজারে ব্রোকারহাউজগুলোর লেনদেনের ওপর বিদ্যমান উৎসে করের হার কমানোর দাবি জানিয়েছে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ)। পাশাপাশি এ কর সমন্বয়ের সুযোগ দেয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
সাংবাদিকদের সাথে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় ডিবিএ নেতারা এ দাবি জানিয়েছেন। বর্তমানে বাজারে যে মন্দা পরিস্থিতি বিরাজ করছে তাতে ব্রোকারহাউজগুলো প্রতিনিয়তই লোকসানের শিকার হচ্ছে উল্লেখ করে তারা উৎসে কর বিদ্যমান ০.০৫ শতাংশ থেকে ০ .০২ শতাংশ করার দাবি জানান।
ডিবিএ নেতারা বলেন, স্টক এক্সচেঞ্জের সদস্য কোম্পানি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলো কর্তৃক প্রদত্ত সিকিউরিটিজ লেনদেনের মূল্য পরিশোধকালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) মোট লেনদেনের ওপর থেকে ০.০৫ শতাংশ হারে উৎসে কর সংগ্রহ করে থাকে যা আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেশি। ২০০৫ এ- এই কর হার ০.০১৫ শতাংশ ছিল।
বিদ্যমান এ কর হারে এক লাখ টাকার লেনদেন হলে বাংলাদেশে ৫০ টাকা উৎসে কর দিতে হয়। ভারতে একই পরিমাণ লেনদেনের ক্ষেত্রে দিতে হয় ১০ রুপি, পাকিস্তানে মাত্র ৬৫ পয়সা। সিঙ্গাপুর ও হংকংয়ে এই করের পরিমাণ বাংলাদেশের চেয়ে অনেক কম। অন্যদিকে মালয়েশিয়া, আরব আমিরাত ও তুরস্কে লেনদেনের ওপর কোনো উৎসে করই দিতে হয় না।
ডিবিএ নেতারা বলেন, বর্তমানে বাজারের অবস্থা খারাপ থাকায় কোনো ব্রোকারহাউজই মুনাফা করতে পারছে না। সর্বশেষ হিসাব বছরেও সব প্রতিষ্ঠান পরিচালন লোকসান দিয়েছে। অথচ এই উৎসে কর সমন্বয়ের কোনো সুযোগ নেই। কোনো ব্রোকারহাউজ লোকসান দিলেও তাকে এই কর দিতে হচ্ছে, যা অন্যায্য ও কর আইনের মূল স্পিরিটের সাথে সাংঘর্ষিক। কারণ আয়কর কেবল নিট আয় বা মুনাফার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হওয়ার কথা। বর্তমানে পুুঁজি বাজারকে বাঁচাতে হলে ব্রোকারহাউজগুলোতে আগে বাঁচাতে হবে।
তারা বলেন, উচ্চ হারে উৎসে করের কারণে লেনদেনের গতি বাড়ছে না। সিকিউরিটিজ লেনদেনের ওপর প্রাপ্ত এ কমিশন ব্রোকারহাউজের প্রধান আয়ের উৎস। অত্যধিক হারে কর আরোপ করার ফলে ব্রোকারহাউজগুলোর পক্ষে টিকে থাকা এবং পুঁজি বাজারে অবদান রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। কাজেই ব্রোকারহাউজের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এবং পুঁজি বাজারকে সক্রিয় করে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সিকিউরিটিজ লেনদেনের ওপর বিদ্যমান কর হার যৌক্তিক কারণে কমানো প্রয়োজন। ডিবিএ নেতারা বলেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার অর্থনীতির নানা খাতে গতি সঞ্চারে বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে। দুর্ভাগ্যবশত পুঁজি বাজারে এর কোনো ছোঁয়া লাগছে না। এ বাজার আগের মতোই অনেকটা উপেক্ষিত।
তারা অনুযোগ করে বলেন, সম্প্রতি দেশে একটি বড় বিনিয়োগ সম্মেলন হয়ে গেছে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিদেশী বিনিয়োগকারী এতে অংশ নিয়েছেন। বর্তমান সরকারের একটি বড় সাফল্য এটি। কিন্তু এত বড় আয়োজনে কোথাও পুঁজি বাজারের উপস্থিতি ছিল না। সম্মেলনে নানা প্রতিষ্ঠানের বুথ থাকলেও পুঁজি বাজারের কোনো বুথ রাখা হয়নি। কোনো সেমিনারে পুঁজি বাজারের জন্য একটি শ্লট ছিল না। অথচ বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আরো বেশি আকৃষ্ট করার জন্যই পুঁজি বাজারকে প্রমোট করা খুবই জরুরি। কারণ বিদেশী বিনিয়োগকারীরা কোনো দেশে বিনিয়োগ করার আগে এক্সিটের সুযোগ তথা বিনিয়োগ প্রত্যাহারের উপায়গুলোও গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নেয়। এক্সিটের সহজ উপায় থাকলে বিনিয়োগে তাদের আগ্রহ বাড়ে। কেবল পুঁজি বাজারই এক্সিটের সহজ সুযোগ দিতে পারে। ডিবিএ নেতারা বলেন, আমরা আশা করি সরকার বৃহত্তর উন্নয়নের স্বার্থে পুঁজি বাজারকে আরো গতিশীল ও কর্মদক্ষ করার প্রতি গুরুত্ব দেবে।
সাংবাদিকদের সাথে এ মতবিনিময়ে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন ডিবিএ প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম। অন্যান্যের মধ্যে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সাবেক প্রেসিডেন্ট শাকিল রিজভী, ডিবিএর ভাইস প্রেসিডেন্ট মো: সাইফুদ্দিন সিএফএ, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন, লংকাবাংলা সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন চৌধুরী, ব্র্যাক ইপিএল সিকিউরিটজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আহসানুর রহমান, ব্যাংক এশিয়া সিকিউরিটিজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সুমন দাস, সিটি ব্রোকারেজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আফফান ইউসুফ প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। ●
অকা/পুঁবা/ফর/বিকাল/১৪ এপ্রিল ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 11 months আগে
