অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
বর্তমানে দেশের শেয়ার বাজার অতিথিকষ্টে পড়েছে। টানা দরপতনের কড়া আঘাতে বিনিয়োগকারীরা লোকসানের ধাক্কা সামলাতে পারছেন না, ফলে বাজার থেকে দূরত্ব সৃষ্টি করছেন। এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স পাঁচ বছর আগের স্তরে নেমে গেছে। লেনদেনের পরিমাণও আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে, যা বাজার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীদের জন্য দৈনিক লোকসানের অঙ্ক বাড়িয়ে তুলেছে।
রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আশা ও বর্তমান মন্দা
গত জুলাই মাসে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শেয়ার বাজার নিয়ে আশাবাদী ছিলেন বিনিয়োগকারীরা। তবে সেই পরিবর্তনের মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই বাজার দীর্ঘমেয়াদী মন্দার মুখে। ফলে হতাশ ও বিক্ষুব্ধ বিনিয়োগকারীরা রাজপথে নেমে প্রতিবাদ করেছেন। তাঁরা বাজেট থেকে শেয়ার বাজারে গতি ফিরিয়ে আনার জন্য বিশেষ উদ্যোগ ও বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রণোদনা প্রত্যাশা করেছিলেন। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা তাদের আশার তুলনায় হতাশাজনক প্রমাণিত হয়েছে। অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদের বক্তব্যে সরাসরি বিনিয়োগকারীদের উপকারী কোনো প্রণোদনা অন্তর্ভুক্ত নেই, যা বিনিয়োগকারীদের মনে গভীর অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে।
বাজেটে শেয়ার বাজারের উন্নয়নের পদক্ষেপ
তবে বাজেটে শেয়ার বাজারের উন্নয়নের জন্য কিছু পদক্ষেপ ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
- করপোরেট করহারের ব্যবধান বৃদ্ধি: তালিকাভুক্ত ও তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানির মধ্যে করপোরেট করহারের পার্থক্য বাড়ানো হয়েছে। শর্তসাপেক্ষে তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার ২০ শতাংশ এবং তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানির ২৭.৫ শতাংশ নির্ধারিত হয়েছে। শর্ত পূরণে (যেমন, সব লেনদেন ব্যাংকের মাধ্যমে করা) এই পার্থক্য ৫ শতাংশে নেমে আসবে।
- ব্রোকারেজ হাউসের কর হ্রাস: প্রতি ১০০ টাকার লেনদেনে ৫ পয়সা থেকে ৩ পয়সায় কর কমানো হয়েছে।
- মার্চেন্ট ব্যাংকের কর হ্রাস: শেয়ার বাজারের মার্চেন্ট ব্যাংকের করপোরেট করহার ৩৭.৫ শতাংশ থেকে ২৭.৫ শতাংশে নামানো হয়েছে।
এই পদক্ষেপগুলো শেয়ার বাজার-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও ব্রোকারেজ হাউসের জন্য সুবিধাজনক, তবে সরাসরি বিনিয়োগকারীদের জন্য কোনো তাৎপর্যপূর্ণ প্রণোদনা অন্তর্ভুক্ত নেই। বাজেটের আগে স্টক এক্সচেঞ্জ লভ্যাংশ আয় ও মূলধনী মুনাফা থেকে কর প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছিল, কিন্তু সেগুলো বিবেচনা করা হয়নি।
শর্তসাপেক্ষ সুবিধা ও বাজারের ভবিষ্যৎ
অর্থ উপদেষ্টা জানিয়েছেন, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো শর্ত পূরণে সর্বোচ্চ ৭.৫ শতাংশ কর ছাড় পাবে। শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্যাংকের মাধ্যমে সব ধরনের লেনদেন (৫ লাখ টাকার বেশি লেনদেন ও বার্ষিক ৩৬ লাখ টাকার বেশি লেনদেন বাধ্যতামূলক)। তবে বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই শর্তসাপেক্ষ সুবিধা ভালো কোম্পানিগুলোকে শেয়ার বাজারে আকর্ষণ করতে পারবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। তালিকাভুক্তির জন্য নিয়মকানুন মেনে চলা ও অতিরিক্ত খরচ বহনের কারণে অনেক কোম্পানি এই পদক্ষেপে আগ্রহী হতে পারে না। বিএসইসি ১০ শতাংশ করহারের পার্থক্যের প্রস্তাব দিয়েছিল, কিন্তু অর্থ উপদেষ্টা তা সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ করেননি।
বাজার সংস্কারের ধীরগতি ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা
গত আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাজার সংস্কারের বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়নের গতি অত্যন্ত কম। ফলে বাজারে সংস্কারের সুফল ফলতে পারেনি, যা মন্দার গভীরতা বাড়িয়েছে। বাজেট-পরবর্তী শেয়ার বাজারের গতিবিধি কী দিকে এগোবে, তা এখন মূল চর্চার বিষয়। বিনিয়োগকারীদের মনে এখন একটাই প্রশ্ন—এই বাজেট শেয়ার বাজারে গতি ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবে কি, নাকি মন্দা আরও গভীর হবে? ●
অকা/পুঁবা/ই/ বিকাল/২ জুন, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 9 months আগে

