অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
দেশের পুঁজি বাজারে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো সূচকের অবনতি ঘটেছে। ১৪ জুলাই দেশের দুই পুঁজি বাজারই কমবেশি সূচক হারায়। এর আগে ১৩ জুলাই চট্টগ্রাম শেয়ার বাজার সূচকের কিছুটা উন্নতি ধরে রাখলেও প্রধান শেয়ার বাজারটিতে সূচকের অবনতি ঘটে। কিন্তু ১৪ জুলাই দুই পুঁজি বাজারই কমবেশি সূচক হারিয়েছে। লেনদেনেও ছিল ধীরগতি। এতে দিনশেষে ঢাকা শেয়ার বাজারের লেনদেন কমেছে প্রায় ১০০ কোটি টাকা।
পুঁজি বাজার কর্তৃপক্ষ দিনের বাজার আচরণকে বাজার সংশোধন হিসাবে দেখলেও বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ এটি আবারো মন্দার আলামত কি না তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। কারণ দীর্ঘ পতনের পর অতি সম্প্রতি বাজারগুলো ইতিবাচক ধারায় ফিরতে চেষ্টা করছিল। কিন্তু ক’দিন যেতে না যেতেই ছন্দপতন ঘটল বাজারে। সূচকের অবনতির পাশাপাশি গতি হারাচ্ছে লেনদেনও।
প্রধান পুঁজি বাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচকটি গতকাল ৪ দশমিক ৬০ পয়েন্ট কমেছে। ৫ হাজার ৬ দশমিক ৪৩ পয়েন্ট থেকে দিন শুরু করা সূচকটি ১৪ জুলাই দিনশেষে নেমে আসে ৫ হাজার ৬১ দশমিক ৮৩ পয়েন্টে। ডিএসই’র অন্য দুই সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ হারায় যথাক্রমে ৮ দশমিক ৫৪ ও দশমিক ৯৫ পয়েন্ট। অপর দিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক ১৪ জুলাই ২৮ দশমিক ১১ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। বাজারটির অন্য দুই সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ৩৬ দশমিক ৬৮ ও ২০ দশমিক ৫২ পয়েন্ট।
সূচকের পাশাপাশি ১৪ জুলাই কমেছে লেনদেনও। ডিএসই ১৪ জুলাই ৫৬৪ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিন অপেক্ষা ১০১ কোটি টাকা কম। ১৩ জুলাই বাজারটির লেনদেন ছিল ৬৬৫ কোটি টাকা। অপর দিকে চট্টগ্রাম স্টকে ৬ কোটি ৫৯ লাখ টাকা থেকে ৫ কোটি ৭৬ লাখ টাকায় নেমে আসে লেনদেন।
১৪ জুলাই মতিঝিলে ডিএসইর বিভিন্ন ব্রোকার হাউসে বিনিয়োগকারীরা জানান, সাম্প্রতিক সময়ের বাজার আচরণ পর্যালোচনা করে তাদের যে অভিজ্ঞতা হয়েছে তাতে তারা বাজার আচরণ নিয়ে নতুন করে শঙ্কিত। কারণ, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে এভাবেই কয়েকদিন ভালো কাটিয়ে নতুন করে মন্দার কবলে পড়ে বাজার। পরবর্তীতে তা দীর্ঘস্থায়ী হতে থাকে। তাদের মতে দ্বিতীয় দিনের মতো সূচকের সামান্য অবনতিকে সংশোধন হিসাবে দেখা গেলেও এত দ্রুত লেনদেনের এ অবনতি স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়া যায় না।
এদিকে পুঁজি বাজারে তালিকাভুক্ত বস্ত্র খাতের কোম্পানি রিং শাইন টেক্সটাইলস লিমিটেড কর্তৃক প্রাইভেট প্লেসমেন্টের মাধ্যমে ২৭৫ কোটি টাকা উত্তোলন করে সঙ্ঘবদ্ধ আর্থিক জালিয়াতি ও ভুয়া তথ্য উপস্থাপনার ঘটনা প্রকাশ পেয়েছে। এ কেলেঙ্কারির পেছনে কোম্পানির উদ্যোক্তা, তৎকালীন পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, কোম্পানি সচিব, সিএফও থেকে শুরু করে শেয়ার বরাদ্দ পাওয়া বাইরের ব্যক্তিরাও জড়িত বলে উঠে এসেছে তদন্তে।
পুঁজি বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) তদন্তশেষে তাদের বিরূদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ পাঠায় ও দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারিসহ কঠোর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ১ জুলাই বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের সভাপতিত্বে ৯৬১তম কমিশন সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ১৪ জুলাই বিএসইসি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
পুঁজি বাজারে আলোচিত কোম্পানি রিং শাইন টেক্সটাইলস লিমিটেড ২০১৯ সালে প্রাইভেট প্লেসমেন্টের মাধ্যমে প্রতিটি ১০ টাকা মূল্যের প্রায় ২৭ কোটি ৫১ লাখ শেয়ার ইস্যু করে ২৭৫ কোটি টাকার মূলধন বাড়ায়। ফলে কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন ৯ দশমিক ৯৫ কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ২৮৫ দশমিক ৫ কোটি টাকায়।
তবে তদন্তে উঠে এসেছে, এই অর্থ প্রকৃত অর্থে কোম্পানি হিসাবে জমা হয়নি। অর্থাৎ, মূলধন বৃদ্ধি নকল কাগজপত্র ও মিথ্যা আর্থিক তথ্যের ভিত্তিতে করা হয়, যার মাধ্যমে একটি সঙ্ঘবদ্ধ আর্থিক প্রতারণা সংগঠিত হয়। কোম্পানির অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি : আইপিও প্রস্পেক্টাসে মিথ্যা তথ্য প্রদানের জন্য কোম্পানির উদ্যোক্তা, তৎকালীন পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, নির্বাহী পরিচালক, সিএফও ও কোম্পানি সচিবসহ মোট ১৩ জনের বিরূদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এই ঘটনার মূলহোতা হিসেবে চিহ্নিত আব্দুল কাদের ফারুক ও তার সহযোগী আশোক কুমার চিরিমার (ভারতীয় নাগরিক)-এর বিরূদ্ধে দুদকে অভিযোগ প্রেরণ এবং দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারির সিদ্ধান্ত হয়েছে।
ইস্যু ব্যবস্থাপকের জড়িত থাকা : দু’টি ইস্যু ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান এএফসি ক্যাপিটাল লিমিটেড ও সিএপিএম অ্যাডভাইজরি লিমিটেড সিএপিএম অ্যাডভাইজরি লিমিটেড ডিউ ডিলিজেন্স সার্টিফিকেট ও প্রস্পেক্টাসে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিনিয়োগকারীদের তির মুখে ফেলে। দুই ইস্যু ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠানের তৎকালীন সিইওদের ৫ বছরের জন্য পুঁজি বাজার কার্যক্রম থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সেইসাথে প্রতিষ্ঠান দু’টির নিবন্ধন সনদ বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
নিরীকদের অনিয়ম : চারটি অডিট ফার্ম আহমেদ অ্যান্ড আখতার, সিরাজ খান বসাক অ্যান্ড কো., মাহফেল হক অ্যান্ড কো. এ.টি.এ খান অ্যান্ড কো ভুয়া আর্থিক বিবরণী প্রত্যয়ন করেছে। এদের বিরূদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য ফিনান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলে অভিযোগ পাঠানো হয়েছে।
বাইরের প্লেসমেন্ট হোল্ডারদের বিরূদ্ধে ব্যবস্থা : তদন্তে আরো উঠে আসে, বহিরাগত প্লেসমেন্ট হোল্ডারদের একটি অংশ অর্থ জমা না দিয়ে বা আংশিক জমা দিয়ে শেয়ার গ্রহণ করেছেন। তাই তাদের বিরূদ্ধেও দুদকে অভিযোগ পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
আব্দুল কাদের ফারুক ও আশোক কুমার চিরিমারের বিরূদ্ধে বিশেষ ব্যবস্থা : এই কেলেঙ্কারির মূলহোতা হিসেবে দায়ী করা হয়েছে আব্দুল কাদের ফারুক এবং সহযোগী ভারতীয় নাগরিক আশোক কুমার চিরিমারের বিরূদ্ধেও দুদকে অভিযোগ পাঠানো হয়েছে।
রিং শাইন টেক্সটাইলস লিমিটেডের এই কেলেঙ্কারির ঘটনা বাংলাদেশের পুঁজি বাজার ইতিহাসে অন্যতম বড় আর্থিক জালিয়াতি হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। বিএসইসির এই পদেেপ বাজারে আস্থা ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, রিংশাইন টেক্সটাইল ২০১৯ সালে পুঁজি বাজারে তালিকাভুক্ত হয়। ডিএসইর ওয়েবসাইটে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে কোম্পানিটির অনুমোদিত মূলধন ৫৪০ কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ৫০০ কোটি ৩১ লাখ টাকা। ২০১৯ সালের পর কোম্পানিটি কোন লভ্যাংশ প্রদান করেনি। ১৪ জুলাই কোম্পানিটির শেয়ার ৩.২০ টাকায় লেনদেন হয়েছে। ৩০ জুন ২০২৫ এর তথ্য অনুসারে কোম্পানির মোট শেয়ারের ৩৬ দশমিক ৪৬ শতাংশ উদ্যোক্তাদের হাতে, ৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের কাছে এবং ৫৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে। ●
অকা/পুঁবা/ফর/রাত/১৫ জুলাই, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 8 months আগে
