অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের পুঁজি বাজারেও মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের আতঙ্ক বিরাজ করছে। ফলে অস্থিরতা কাটছে না পুঁজি বাজারের। যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে ততই বাজারে অস্থিরতা বাড়ছে। একদিন ভালো কাটে তো পরদিন আবার বিপরীত আচরণের শিকার হচ্ছে দেশের পুঁজি বাজার। ১৯ জুন সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে আবারো পতনের শিকার হলো পুঁজিবাজার।
দেশের প্রধান পুঁজি বাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ১৯ জুন ২২ দশমিক ৪১ পয়েন্ট অবনতি ঘটে। ৪ হাজার ৭৭৬ দশমিক ৮২ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি ১৯ জুন দিনশেষে নেমে আসে ৪ হাজার ৭৫৪ দশমিক ৪১ পয়েন্টে। বাজারটির অন্য দুই সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ হারায় যথাক্রমে ৫ দশমিক ২৪ ও ৪ দশমিক ৯৪ পয়েন্ট। অপর দিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে সবগুলো সূচকই কমবেশি উন্নতি ধরে রাখে। এখানে সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ১ দশমিক ৫৯ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। সিএসই-৩০ ও সিএসইসএক্স সূচকের উন্নতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ২৪ দশমিক ৮৪ ও ৬ দশমিক ৪০ পয়েন্ট।
এ দিকে পুঁজি বাজারে মধ্যস্থতাকারী ব্রোকারেজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকের মার্জিন ঋণের বিপরীতে সৃষ্ট নেগেটিভ ইকুইটি (অনাদায়ী তি) এবং প্রভিশন (নিরাপত্তা সঞ্চিতি) সংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্য চেয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। সম্প্রতি বিএসইসি এ সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই), চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) এবং বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) কাছে পাঠিয়েছে।
এর আগে ২৪ এপ্রিল বিএসইসি প্রতিষ্ঠানগুলোকে মার্জিন অ্যাকাউন্টে সৃষ্ট নেগেটিভ ইকুইটির ওপর প্রভিশন সংরণের একটি সুনির্দিষ্ট ও গ্রহণযোগ্য কর্মপরিকল্পনা ৩০ জুনের মধ্যে জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছিল। তারই ধারাবাহিকতায় এখন মার্জিন ঋণ, ঋণের নেগেটিভ ইকুইটি ও প্রভিশন সংরক্ষণসংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে।
বিএসইসির নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সর্বশেষ মার্জিন ঋণের বিপরীতে সৃষ্ট নেগেটিভ ইকুইটি এবং মার্জিন অ্যাকাউন্টের বিপরীতে প্রভিশনের তথ্য দিতে হবে। একই সাথে স্টক ডিলার এবং মার্চেন্ট ব্যাংকের নিজস্ব পোর্টফোলিওতে থাকা শেয়ারের তথ্য চলতি মাসের মধ্যেই জমা দিতে হবে। এ ছাড়া একই নির্দেশনায় নেগেটিভ ইকুইটি ও মার্জিন ঋণে অগ্রগতি প্রতিবেদনের বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রতিষ্ঠানের নাম, ট্রেক নম্বর, মার্জিন হিসাবের নাম, বিও নম্বর, বিও হিসাব খোলার তারিখ, মার্জিন ঋণ দেয়া নগদ অর্থ ও শেয়ারের পরিমাণ (এর মধ্যে কত জমা দেয়া হয়েছে ও তোলা হয়েছে), সুদের পরিমাণ, সুদ ও আসল মিলিয়ে সর্বশেষ মার্জিন ঋণের পরিমাণ এবং পরিশোধের তারিখসহ অন্যান্য তথ্য।
এ ছাড়া মার্জিন ঋণে অগ্রগতি প্রতিবেদনের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের নাম, ট্রেক নম্বর, সচল বিও হিসাবের পরিমাণ, মার্জিন ঋণ নেয়া বিও হিসাবের পরিমাণ, নেগেটিভ ইকুইটির বিওর সংখ্যা, পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ, নিট সম্পদের পরিমাণ ও প্রভিশনের পরিমাণসহ অন্যান্য তথ্য জমা দিতে হবে।
বিএসইসি থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত প্রভিশনিং বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি বাদে শেয়ার বাজারের সদস্যভুক্ত বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকের মোট নেগেটিভ ইকুইটির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৮২৪ কোটি ১৮ লাখ টাকা। মূলত ২০১০ সালে শেয়ার বাজারে সংঘটিত বড় ধরনের বিপর্যয়ের পর থেকে পুঁজি বাজারে এই সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করে। তার ওপর গত ১৫ বছরের পুঞ্জীভূত এ সমস্যা এখন প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি বড় বোঝায় পরিণত হয়েছে। এই সমস্যা সমাধানের ল্েয ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের ২৮ মার্চ অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের হস্তক্ষেপ কামনা করে সঙ্কট উত্তরণের পরামর্শ চায় বিএসইসি।
বিএসইসি সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ডিএসই ও সিএসইর সদস্যভুক্ত ব্রোকারেজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর প থেকে ১ লাখ ৭৪ হাজার ৪৬৭টি মার্জিন বিও হিসেবের বিপরীতে বিনিয়োগকারীদের দেয়া মোট মার্জিন ঋণের পরিমাণ ১৮ হাজার ১২৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ডিএসইর সদস্যভুক্ত ব্রোকারেজ হাউজগুলো বিনিয়োগকারীদের মার্জিন ঋণ দিয়েছে ১১ হাজার ৫৪৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রকৃত নেগেটিভ ইকুইটির পরিমাণ ৫ হাজার ১৪৪ কোটি ৬৩ লাখ টাকা এবং সুদ ১ হাজার ১৯১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ফলে ডিএসইর সদস্যভুক্ত ব্রোকারদের মোট নেগেটিভ ইকুইটির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৩৩৬ কোটি ১৩ লাখ টাকা। বিপরীতে ব্রোকারেজ হাউজগুলো মোট প্রভিশন রেখেছে ১ হাজার ৪৫৮ কোটি ৯ লাখ টাকা।
সিএসইর সদস্যভুক্ত ব্রোকারেজ হাউজগুলো বিনিয়োগকারীদের মার্জিন ঋণ দিয়েছে ৩৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে প্রকৃত নেগেটিভ ইকুইটির পরিমাণ ৮ কোটি ৬৪ লাখ টাকা এবং সুদ ২১ কোটি ১৪ লাখ টাকা। ফলে সিএসইর সদস্যভুক্ত ব্রোকারেজ হাউজগুলোর মোট নেগেটিভ ইকুইটির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৯ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। এর বিপরীতে ব্রোকারেজ হাউজগুলো মোট প্রভিশন রেখেছে ১ হাজার ৩ কোটি ৬৯ লাখ টাকা।
অন্যদিকে বিএসইসির অনুমোদিত মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো বিনিয়োগকারীদের মার্জিন ঋণ দিয়েছে ৬ হাজার ৫৪৭ কোটি ৭১ লাখ টাকা। এর মধ্যে প্রকৃত নেগেটিভ ইকুইটির পরিমাণ ২ হাজার ৭০৮ কোটি ৭৮ লাখ টাকা এবং সুদ ১ হাজার ৪৫০ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। ফলে মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর মোট নেগেটিভ ইকুইটির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ১৫৯ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। এর বিপরীতে মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো মোট প্রভিশন রেখেছে ১ হাজার ২৩৯ কোটি ৩২ লাখ টাকা। সামগ্রিকভাবে ২০২৪ সালের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ডিএসই ও সিএসইর সদস্যভুক্ত ব্রোকারেজ হাউজ এবং মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর মোট নেগেটিভ ইকুইটির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৫২৫ কোটি ২৮ লাখ টাকা। এর বিপরীতে ব্রোকারেজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো মোট প্রভিশন রেখেছে ২ হাজার ৭০১ কোটি ১০ লাখ টাকা। সে হিসেবে প্রভিশনিং বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি বাদে ব্রোকারেজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর মোট নেগেটিভ ইকুইটির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৮২৪ কোটি ১৮ লাখ টাকা। ●
অকা/পুঁবা/ফর/রাত/২০ জুন, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 8 months আগে
