তারেক আবেদীন ●
দেশের চতুর্থ প্রজন্মের দেশি জীবন বীমা কোম্পানি সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এর ৫ জন শীর্ষ উন্নয়ন কর্মকর্তাকে বরখাস্তের জের হিসেবে সকাল থেকেই কোম্পানির প্রধান কার্যালয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারিরা ধর্মঘট শুরু করে অফিসের নিচে ক্যাফেতে অবস্থান নেয়। কোম্পানির প্রধান হিসাব কর্মকর্তা (সিএফও) মহম্মদ হান্নান, আইটির গোলাম মোস্তফা জুয়েল, অবলিখনের আব্দুল মালেক, দাবী বিভাগের শাহিদুর রহমান প্রমুখের নেতৃত্বে এই ধর্মঘট চলছে। এরা প্রত্যেকেই প্রাক্তন চেয়ারম্যান মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসের আস্থাভাজন। বর্তমান প্রশাসকের কাজে ব্যাঘাত ঘটানোর উদ্দেশ্যে এই ধর্মঘট করা হচ্ছে বলে জানা গেছে । পরিস্থিতি সামাল দিতে দুপুর ১২টা থেকে অফিস ছুটি দেয়া হয়েছে।
কোম্পানির বিশ্বস্ত একটি সূত্র জানায়, গতকাল ৮ জুলাই তহবিল তছরূপ ও অসদাচরনের কারণে ৫ জন শীর্ষ উন্নয়ন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়। সোনালী লাইফের এ ৫ জন কর্মকর্তা বর্তমান প্রশাসক ব্রিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অবঃ) কে. এম ফেরদৌসের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে অর্থ মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দাখিলের পাশাপাশি সাংবাদিকদের কাছে সোনালী লাইফের অবস্থা অবহিত করেন। সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে তারা জানান, বিল অনুমোদনের জন্য বর্তমান প্রশাসককে চাপ প্রয়োগ করত যেয়ে তারা কারণ দর্শানোর (শোকজ) সম্মুখীন হন। শোকজের জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় আজ তাদের চূড়ান্তভাবে চাকরিচ্যূত করা হয়। চাকরিচ্যূতরা হলেন এএমডি রফিকুল ইসলাম, ডিএমডি আব্দুল্লাহ আল কাফি, নাজিম আহমেদ, গোলাম মোস্তফা ও মনজুর মোর্শেদ। তাছাড়া অসদাচরণ ছাড়াও রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে গত ২০ এপ্রিল ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা কোম্পানির তহবিল থেকে প্রভাব খাটিয়ে উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে নির্ভরযোগ্য সূত্রে আরও জানা গেছে ৭ জুলাই বিকেলে সোনালী লাইফের শাখা ব্যবস্থাপকরা (বিএম) উন্নয়ন কর্মীরা তাদের বিগত মাসগুলোর বেতন-কমিশন না পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে সিওও (প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা) ও কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা অজিত চন্দ্র আইচকে জোরপূর্বক অফিস থেকে বের করে দেয়। বিক্ষুদ্ধরা তাঁকে রাজধানীর মালিবাগ চৌধুরী পাড়াস্থ কোম্পানির প্রধান কার্যালয়ের নিচে এনে রিক্সায় তুলে দেয়। মাত্র কয়েকমাস আগে অজিত চন্দ্র আইচ তাঁর অভিযুক্ত আত্মীয় কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ঢাকতে সোনালী লাইফের প্রাক্তন চেয়ারম্যান মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসকে ম্যানেজ করে আগের নিচের পদবী সিওওতে বিনা বেতনে যোগদান করেন বলে জানা যায়। যোগদান করেই সিএফও মহম্মদ হান্নানের সঙ্গে যোগসাজশে উন্নয়ন কর্মকর্তাদের বেতন, বোনাস ও কমিশন হ্রাসের কাজে অংশ নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রশাসক যোগদানের পর তার এই মিশন হালে পানি পায়। ফলশ্রুতিতে গত দু’মাস যাবত উন্নয়ন কর্মকর্তাদের কাঙ্খিত বেতন-কমিশন প্রদান বন্ধ হয়ে যায়। এ ঘটনার পিছনে কোম্পানির উন্নয়ন কর্মকর্তা ও প্রাক্তন চেয়ারম্যানের হাত রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের আরেক নাম সোনালী লাইফ। দুর্নীতির উদ্দ্যেশ্যই কোম্পানির শুরু থেকে শ্বশুর মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস (প্রাক্তন চেয়ারম্যান) জামাই অর্থাৎ মীর রাশেদ বিন আমানের (প্রাক্তন সিইও) এক ছত্র ক্ষমতার অপব্যবহার বজায় রাখতে তারা সোনালী লাইফের উন্নয়ন কর্মকর্তাদের দাবার গুটি হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তাদের দুজনের প্রশ্রয়ে উন্নয়ন কর্মকর্তাদের উপহার স্বরূপ অতিরিক্ত পদ পদবী ও বেতন-কমিশন দিয়ে কোম্পানিকে পথে বসিয়েছে বলে নিষ্ঠবান, সৎ ও পরিশ্রমী কর্মকর্তারা মনে করছেন। উন্নয়ন কর্মকর্তাদের বেতন, ভাতা, কমিশন, বিদেশ ভ্রমণ বাবদ বছরে খরচ প্রায় ৩০০ কোটি টাকার উপরে বলে জানা গেছে। কোম্পানীর এএমডি রফিকুল ইসলামেরই মাসিক বেতন-কমিশন ষোল লাখ টাকা! প্রাক্তন চেয়ারম্যান মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস কোম্পানিকে নিজের কব্জায় রাখতে এএমডি রফিকুল ইসলামকে সহায়তার জন্য গুলশান শাখার ব্যবস্থাপক চতুর মনজুর মোর্শেদকে ৬ লাখ টাকা বেতন দিয়ে এক্সিকিউটিভ বানিয়ে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নিয়ে আসেন। এ কর্মকর্তা আগে এইচএসবিসি ব্যাংক থেকে চাকুরিচ্যুত, যাকে নিয়ে প্রাক্তন সিইও রাশেদ, পরিচালক ডানিয়েল ও তাদের শ্বশুর প্রাক্তন চেয়ারম্যান মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসের গর্বের সীমা ছিল না। ‘চোরে চোরে খালাতো ভাই’ এমন নজির হলো সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড । দুর্নীতির হিসাব ব্যবস্থা কন্টকমূক্ত করতে আর এক চাটুকার মহম্মদ হান্নানকে সিএফও হিসেবে সম্প্রতি নিয়োগ দেয়া হয়। এই কর্মকর্তার কারসাজিতে মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসের মালিকানার ড্রাগন সোয়েটার শেয়ার বাজার থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় বলে অভিযোগ আছে। দুঃখের বিষয় সে ফ্যাক্টরীর এখন হদিস মিলছে না। মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস এবং ষোল লাখ টাকা বেতন ও কমিশনধারী রফিকুল ইসলাম গংরা সম্ভাবনাময় সোনালী লাইফকে রসাতলের মুখে ঠেলে দেয়। এ ব্যাপারে বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও কাজের কাজ হচ্ছে না। কোম্পানির সংঘবদ্ধ চক্র নিয়ন্ত্রককে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে। তাদের ভয়ে বর্তমান প্রশাসক সরকারী নিরাপত্তা বলয়ে অফিস করছেন। উন্নয়ন কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত বেতন-কমিশন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। চেষ্টা চলছে কোম্পানিকে কুদ্দুস-রফিক গং থেকে মুক্ত করতে।
জানা গেছে, কোম্পানির মাঠের বিপণন কার্যক্রম হুমকির মুখে। মাঠ পর্যায়েও ক্ষোভ প্রশমিত হচ্ছে। দিন দিন ভালো অবস্থায় থাকা সোনালী লাইফের ব্যবসা ক্রমাবনতির দিকে যাচ্ছে।
বিশ্বস্ত সূত্র আরও জানায়, বছর খানেক আগেও বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এর চেয়ারম্যান ও পদস্থ কর্মকর্তাগণ অন্যান্য দেশীয় বীমা কোম্পানিকে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে বলতেন ‘ফলো দ্যা সোনালী।’ এখন সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এখন আইডিআরএ‘র মাথা ব্যথার বড় কারণ। সোনালী লাইফের পক্ষে বিপক্ষে দেশের প্রধান প্রধান সংবাদ মাধ্যমে কদিন পরপরই সংবাদ প্রচারিত হচ্ছে। কোন সংবাদ খোদ আইডিআরএ‘র চেয়ারম্যান জয়নুল বারী কিংবা মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসর বিরুদ্ধে। দ্বিপাক্ষিক এ দ্বন্দ্ব বেড়ে যাওয়ার তা দেশের গোটা লাইফ ও নন লাইফ বীমা কোম্পানির ব্যবসায়ে বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
প্রধান কার্যালয়ে সোনালী লাইফের ধর্মঘট এবং সৃষ্ট সমস্যায় অনেকটা অচলাবস্থা বিরাজ করায় তা দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতিতে নেতিবাচক ফল দেবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তারা এর আশু সমাধান প্রত্যাশা করছেন।
সোনালী লাইফ এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় অর্থকাগজ থেকে। দুঃখের বিষয় কেউই এ ব্যাপারে তেমন সাড়া দেননি। তবে সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এর প্রধান হিসাব কর্মকর্তা (সিএফও) মহম্মদ হান্নান আজকের ঘটনা প্রসঙ্গে বিকেলে অর্থকাগজকে জানান, আমি এখনও নামাজ শেষ করিনি: পরে কথা বলি। সংক্ষেপে বলেন, আমিও শুনেছি, সকাল থেকে ধর্মঘট চলছে। অপরদিকে প্রশাসক ব্রিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অবঃ) কে. এম ফেরদৌস তার সেলফোনে দুই দুইবার কল গ্রহণ করে বিষয়টি নিয়ে কোন কথা বলেননি। পরে তার ফোন ব্যস্ত পাওয়া যায়। আইডিআর‘র সদস্য (লাইফ) কামরুল হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সংযোগ বিছিন্ন করে দেন। আইডিআর‘র মুখপাত্র মো. জাহাঙ্গীর আলম ফোন ধরেননি। ●
অকা/বীখা/বিকেল, ৯ জুলাই, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 2 years আগে

