নিজস্ব প্রতিবেদক>
শিল্প মানেই সৃষ্টির আনন্দ, আর সেই আনন্দের নেশাতেই কয়েক দশক ধরে হাজার হাজার ক্যানভাসে রঙ আর তুলির আঁচড়ে জীবনের গল্প লিখে চলেছেন নরসিংদীর স্বশিক্ষিত চিত্রশিল্পী আলামিন। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক কোনো ডিগ্রি নেই বলে হয়তো সমাজ বা রাষ্ট্রের চোখে তিনি উপেক্ষিত। আজ দারিদ্র্যের নির্মম কষাঘাতে তার এই শৈল্পিক সত্তা এক গভীর সংকটের মুখোমুখি।
শৈশব থেকেই শিল্পের প্রতি এক তীব্র টান অনুভব করতেন আলামিন। সেই ভালোবাসা থেকেই দীর্ঘ সময়ে প্রায় এক লক্ষাধিক চিত্রকর্ম সৃষ্টি করেছেন তিনি। নিজের চেষ্টায় দক্ষ হয়ে ওঠা এই শিল্পী পরিবেশ, সমাজ এবং দেশের কল্যাণের বার্তা ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন তার আঁকা ছবির মাধ্যমে। কিন্তু আজ সেই শিল্পকর্মগুলোই যেন তার জীবনে অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আলামিনের জীবন এখন চরম অনিশ্চয়তায় ভরা। দীর্ঘদিনের তীব্র অর্থকষ্টে গত তিন বছর ধরে তিনি ঘরভাড়া পরিশোধ করতে পারছেন না। বাড়িওয়ালার ক্রমাগত চাপ, অপমান আর তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার হুমকির মুখেও তিনি অসহায়। আর্তনাদ করে তিনি বলেন, "আমি বেহায়ার মতো এখানে পড়ে আছি। বাড়িওয়ালা আজকেও ফোন দিয়ে হুমকি দিয়েছেন তালা লাগিয়ে দেওয়ার। কিন্তু এই হাজার হাজার শিল্পকর্ম নিয়ে আমি কোথায় যাব?"
ঘরটিতে বৃষ্টি আর বৈরী আবহাওয়ার কারণে আলামিনের পরম মমতায় আঁকা অসংখ্য ছবি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কালের গর্ভে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে তার সৃজনশীলতার নিদর্শনগুলো। শিল্পীর আক্ষেপ, "সমাজের কারণে বা রাষ্ট্রের কারণে যদি এই শিল্পকর্মগুলো অবহেলায় নষ্ট হয়ে যায়, তবে আমার কিছুই করার নেই।"
নরসিংদীর বিশিষ্টজনের অনুভূতি
আলামিনের এই করুণ পরিণতি দেখে জেলার সচেতন মহল ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা গভীরভাবে ব্যথিত। চিত্রশিল্পী আলামিনের শিল্পকর্ম সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে স্থানীয় সমাজ সচেতন ব্যক্তি ও সাংবাদিকরা ইতোমধ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, আলামিনের মতো একজন স্বশিক্ষিত শিল্পীর এই অবদানের মূল্যায়ন করা প্রতিটি নরসিংদীবাসীর নৈতিক দায়িত্ব। জেলার বিশিষ্টজনরা মনে করেন, শুধুমাত্র ব্যক্তিগত উদ্যোগে নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতা ও সরকারি সহায়তায় তার হাজারো সৃষ্টিকে রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি। তারা আলামিনের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষের প্রতি জোর আহ্বান জানিয়েছেন।
জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করার পর সম্প্রতি কিছুটা আর্থিক সহায়তা পেলেও, তা যেন এক সমুদ্র বিষাদময় জীবনে এক ফোঁটা জলের মতো। আলামিনের মতো আরও অনেক প্রতিভাবান শিল্পী যথাযথ মূল্যায়নের অভাবে আজ তাদের পেশা বদলাতে বাধ্য হচ্ছেন। যারা টিকে আছেন, তারা ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন।
শিল্পীর এই বেঁচে থাকার লড়াই এবং তার অমর সৃষ্টির এমন করুণ পরিণতি আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। রাষ্ট্র ও সচেতন মহলের সহযোগিতা ছাড়া এই অসামান্য প্রতিভাকে টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। নরসিংদীর এই চিত্রশিল্পীর স্বপ্ন যেন দারিদ্র্যের কাছে হেরে গিয়ে সময়ের গর্ভে হারিয়ে না যায়—আজ সেটাই বড় প্রশ্ন।
সর্বশেষ হালনাগাদ 24 hours আগে

