অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
পুঁজি বাজারে পতন আরো গভীর হয়েছে গত সপ্তাহের শেষ দিক থেকে। আর ২৭ অক্টোবর ১৪৯ পয়েন্ট হারানোর মাধ্যমে পতনের সূচকের চার বছরের নতুন রেকর্ড হয়েছে। ২৮ অক্টোবর পতন হয়েছে আরো ৬৬.৮৮ পয়েন্ট। ফলে পতনের এই ধারা পুঁজি বাজারে চরম সঙ্কট ধেয়ে আসছে। অন্তর্বতী সরকারের আমলের ১২ আগস্ট থেকে ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত ডিএসইর সূচক এক হাজার ১৪৭ পয়েন্ট। আর বাজার মূলধন ৬০ হাজার ১৫৫ কোটি টাকা কমেছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার দফায় দফায় বিভিন্ন অংশীজনের সাথে বৈঠক কোনোই কাজে আসছে না। বিনিয়োগকারীরা পুরোপুরি নিরাশ ও সর্বস্বান্ত। পতন থেকে কোনোভাবেই ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না। বিক্রির চাপে নাস্তানাবুদ, ক্রেতার সঙ্কট। বেশি ক্রেতা হলো এন ও জেড শ্রেণীর কোম্পানির। চট্টগ্রামে দুটি সূচক গড়ে পতনে সেঞ্চুরি অব্যাহত রেখেছে। বাজার মূলধন ডিএসইতে ০.৫৪ শতাংশ বা আরো তিন হাজার ৪৭৫ কোটি টাকা কমেছে।

দিনের লেনদেনের তথ্য থেকে বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, পুঁজি বাজারে মূল্যসূচকের মিশ্র প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে লেনদেন চলে প্রথম দুই ঘণ্টা। ওই সময় বেড়েছে বেশির ভাগ কোম্পানির শেয়ারদর। ডিএসইর লেনদেন শুরুর দুই ঘণ্টায় অর্থাৎ দুপুর ১২টা পর্যন্ত ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৭.৫৬ পয়েন্ট বেড়ে চার হাজার ৯৭২.৯৫ পয়েন্টে ছিল। শরিয়াহ সূচক ১.৯০ পয়েন্ট কমে এক হাজার ১০৫.৮২ পয়েন্টে আর ‘ডিএস-৩০’ সূচক ১.৬০ পয়েন্ট বেড়ে এক হাজার ৮৩২.৫৯ পয়েন্টে চলে আসে। একই সময়ে ডিএসইতে মোট ১৫২ কোটি ৮৬ লাখ টাকার বেচাকেনা হয়। আর ১৯৭টি কোম্পানি দর বৃদ্ধিতে ছিল। এসএমই বাজার সূচক (ডিএসএমইএক্স) ৬.৪৪ পয়েন্ট কমে এক হাজার ২ পয়েন্টে অবস্থান করছে। লেনদেন হয়েছে ৩.৩ কোটি টাকা, যা ২৭ অক্টোবরের তুলনায় ২৮ শতাংশ বেশি।

ডিএসইর ডিএসইএক্স দিন শেষে আরো ৬৬.৮৮ পয়েন্ট কমে এখন চার হাজার ৮৯৮.৫২ পয়েন্টে, শরিয়াহ সূচক আরো ২০.২৭ পয়েন্ট হারিযে এখন এক হাজার ৮৭.৪৫ পয়েন্টে এবং ডিএসই-৩০ সূচক আরো ২৫.১০ পয়েন্ট হারিয়ে এখন এক হাজার ৮০৫.৮৯ পয়েন্টে নেমে এসেছে। মূল্যসূচকের এখন অব্যাহত পতন বাজারে আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে। ডিএসইতে ১৭ কোটি ৩৩ লাখ ২৪ হাজার ৯৬৬টি শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ড বেচাকেনা হয়েছে মোট ৩৫৭ কোটি ২৫ লাখ ৭১ হাজার টাকা বাজারমূল্যে। যেখানে রোববার লেনদেন হয়েছিল ৩০৩ কোটি ৮১ লাখ টাকার। ফলে পতনের বাজারেও লেনদেন বেড়েছে ৫৩ কোটি ৪৪ লাখ টাকার বা ১৮ শতাংশ। আর বাজারমূল্য পরিবর্তনের ভিত্তিতে ডিএসইতে ২৮ অক্টোবর লেনদেনে অংশ নেয়া ৩৯৮টি কোম্পানির মধ্যে দর বেড়েছে ১০৫টির বা ২৬.৪৪ শতাংশের, দর পতনের শিকার ২৪৬টির বা ৬১.৯৬ শতাংশের এবং দর পরিবর্তন হয়নি ৪৬টির বা ১১.৫৮ শতাংশের।

দর বৃদ্ধিতে শীর্ষ ১০ : ডিএসইতে ২৮ অক্টোবর সর্বোচ্চ দর বেড়েছে ন্যাশনাল লাইফ ইন্সুরেন্সের বলে ডিএসই তথ্য থেকে জানা গেছে। কোম্পানিটির শেয়ার দর আগের দিনের তুলনায় ১০ টাকা ১০ পয়সা বা ৯.৯৭ শতাংশ বেড়েছে। যার ফলে ডিএসইর দর বৃদ্ধির শীর্ষ তালিকায় প্রথম স্থান নিয়েছে কোম্পানিটির শেয়ার। দর বৃদ্ধির শীর্ষ তালিকায় থাকা এস্কয়ার নিটের শেয়ার দর বেড়েছে ১ টাকা ৮০ পয়সা বা ৯.৫৭ শতাংশ। আর ১ টাকা ৮০ পয়সা বা ৯.৪৭ শতাংশ শেয়ার দর বৃদ্ধি পেয়েছে ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড। দর বৃদ্ধির শীর্ষ তালিকায় উঠে আসা অন্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে-সামিট এলায়েন্সের ৬.৩২ শতাংশ, কপারটেক ইন্ডাস্ট্রিজের ৬.২১ শতাংশ, ইভিন্স টেক্সটাইলের ৫.৪৯ শতাংশ, টেকনো ড্রাগসের ৫.২৪ শতাংশ, সেন্ট্রাল ইন্সুরেন্সের ৫.০১ শতাংশ, বেস্ট হোল্ডিংসের ৪.৮৯ শতাংশ এবং ফারইস্ট নিটিং অ্যান্ড ডাইং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ৪.৩৯ শতাংশ দর বেড়েছে।

দর পতনে শীর্ষ ১০ : আর সবচেয়ে বেশি দর কমেছে জেনেক্স ইনফোসিস’র বলে ডিএসইর প্রকাশিত তথ্যে জানা গেছে। কোম্পানিটির শেয়ার দর আগের দিনের তুলনায় ৪ টাকা ১০ পয়সা বা ১৪.৯০ শতাংশ কমেছে। যার ফলে ডিএসইর দর পতনের শীর্ষ তালিকায় প্রথম স্থানে স্থান নিয়েছে কোম্পানিটির শেয়ার। দর পতনের শীর্ষ তালিকায় থাকা দুলামিয়া কটনের শেয়ার দর কমেছে ২৭ অক্টোবরের তুলনায় ৯ টাকা ৬০ পয়সা বা ১৩.৮৯ শতাংশ। আর ৩ টাকা ২০ পয়সা বা ১২.৪০ শতাংশ দর কমে যাওয়ায় পতনে রয়েছে সালভো কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড।

এ ছাড়া, শীর্ষ তালিকায় থাকা অন্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে- ভিএফএস থ্রেডের ১১.৫৩ শতাংশ, জাহিন স্পিনিংয়ের ১০.৬০ শতাংশ, কাশেম ইন্ডাস্ট্রিজের ১০.২৮ শতাংশ, ইসলামিক ফাইন্যান্সের ৯.৯১ শতাংশ, মালেক স্পিনিংয়ের ৯.৮৩ শতাংশ, ফারইস্ট ফাইন্যান্সের ৯.৭৫ শতাংশ এবং রূপালী লাইফ ইন্সুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের শেয়ার দর ৯.৭০ শতাংশ কমেছে।

ব্লক মার্কেটে ৯৫.১৯ লাখ শেয়ার লেনদেন : ২৮ অক্টোবর ডিএসইর ব্লক মার্কেটে ২৩টি কোম্পানির ৯৫ লাখ ১৯ হাজার ৯৯৩টি শেয়ার ও মিউচুযাল ফান্ড হাতবদল হয়েছে মোট ২৪ কোটি ১১ লাখ ৬৪ হাজার টাকায়। এর মধ্যে ছয় কোম্পানির শেয়ার সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে বলে ডিএসইর তথ্য থেকে জানা গেছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলোÑ প্রাইম ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, বেক্সিমকো ফার্মা, লিনডে বাংলাদেশ, লাভেলো আইসক্রিম এবং পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড। এই ছয় প্রতিষ্ঠানের মোট শেয়ার লেনদেন হয়েছে ২১ কোটি ৩২ লাখ টাকারও বেশি। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে প্রাইম ব্যাংক পিএলসির। ব্যাংকটির ৬০ লাখ শেয়ার মোট ১৪ কোটি ১৬ লাখ টাকায় হাতবদল হয়েছে। এ ছাড়া ব্যাংক এশিয়ার ৩ কোটি ৬৩ লাখ ৭ হাজার টাকার, বেক্সিমকো ফার্মার দুই কোটি ৮ লাখ ৮৮ হাজার টাকার, লিনডে বাংলাদেশের ৬২ লাখ ৩০ হাজার টাকার, লাভেলো আইসক্রিমের ৪৪ লাখ ৪৬ হাজার টাকার এবং পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের ৩৭ লাখ ৪০ হাজার টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে।

এক উদ্যোক্তা ১৩.৭৮ লাখ শেয়ার কিনবে : পুঁজি বাজারে তালিকাভুক্ত এনআরবিসি ব্যাংকের এক উদ্যোক্তা ১৩ লাখ ৭৮ হাজার শেয়ার কেনার ঘোষণা দিয়েছেন বলে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) তথ্য প্রকাশ করেছে। কোম্পানির উদ্যোক্তা সরোয়ার জামান চৌধুরী ১৩ লাখ ৭৮ হাজার ১৩২টি শেয়ার কেনার ঘোষণা দিয়েছেন। ৩১ অক্টোবরের মধ্যে ওই শেয়ার কেনা সম্পন্ন করবেন এই উদ্যোক্তা।

বাজার বিশ্লেষকের অভিমত : পুঁজি বাজার বিশ্লেষণে রয়্যাল ক্যাপিটাল ফিন্যান্সিয়াল পোর্টাল বলছে, পতনের বৃত্তেই ঘুরপাক খাচ্ছে সূচক। বাজার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও এই চেষ্টার সফলতার কোনো সুস্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেনি এখনো। ডিএসইএক্স ৬৬ পয়েন্ট কমে ৪৮৯৮ পয়েন্টে শেষ হয়। অপর দিকে, বাজার লেনদেন ৫৩ কোটি টাকা বেড়ে ৩৫৭ কোটি টাকা হয়েছে। ঢাকার শেয়ার বাজারের প্রধান সূচক (ডিএসইএক্স) নিম্নমুখী ছিল। মূলধন ২৭ অক্টোবরের তুলনায় ০.৫৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। যেখানে ভলিউম ২৩ শতাংশ এবং টার্নওভার ১৮ শতাংশ বেড়েছে। ১৯টি সেক্টরের মধ্যে ৩টি সেক্টরের শেয়ারমূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ১৬টি সেক্টরের শেয়ার মূল্য হ্রাস পেয়েছে। শুরুতে বাজারে মিশ্র ভাব থাকলেও শেষ এক ঘণ্টায় নেতিবাচক ছিল। ●

অকা/পুঁবা/ফর/রাত/২৮ অক্টোবর, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 1 year আগে

Leave A Reply

Exit mobile version