অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
নিত্য প্রয়োজনীয় সবজি পেঁয়াজের দাম বাড়ছে না। দেশে ব্যাপক উৎপাদন, ভারত আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো, বাজারে সরবরাহ এবং সরকারি নজরদারি জোরদার হওয়ায় পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধির আশংকা আর থাকছে না বলে জানা গেছে। দুই বছর সেপ্টেম্বরে ভারতের পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ এবং পেঁয়াজের দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশের বাজারেও দাম বাড়ে অস্বাভাবিক হারে। সেই সঙ্গে দেশে বন্যার প্রভাব ছিল। এবার দেশে ব্যাপক বন্যার শঙ্কা না থাকলেও কিছু ক্রেতা মনে করেন, সেপ্টেম্বরে পেঁয়াজের দাম বাড়তে পারে। তবে বাজার পরিস্থিতি ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, এবার পেঁয়াজের বাজার অস্থির হবে না। দাম বাড়ার শঙ্কা নেই। দেশে উৎপাদন বৃদ্ধি ও স্বাভাবিক আমদানিতে পেঁয়াজের সরবরাহ ভালো। লকডাউনের কারণেও বড় মজুদ গড়ে উঠেছে। পেঁয়াজের বাজারে ভারত নির্ভরতাও কমেছে। তাই বর্তমান দামের চেয়ে খুব বেশি হেরফের হওয়ার লক্ষণ এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। এ ছাড়া বাজার সামাল দিতে আগস্টের শেষ দিকেই টিসিবির মাধ্যমে পেঁয়াজ বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
বাজার বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত বছর সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই হঠাৎ পেঁয়াজের দাম বেড়ে যায় বাজারে। মাত্র দুই দিনে ভারতীয় পেঁয়াজের দাম ৫০ শতাংশ বেড়েছিল। সঙ্গে দেশি পেঁয়াজও। প্রথম কয়েক দিন দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছিল ৫০ থেকে ৫৫ টাকা কেজি। সপ্তাহের শেষ দিকে সেই পেঁয়াজ ৬৫ থেকে ৭০ টাকায় ওঠে। ওই সময় ভারত থেকে আমদানি করা পেঁয়াজের দাম ৪০ থেকে বেড়ে ৬০ টাকায় ওঠে। অথচ তার আগে আগস্টের শুরুতে দেশের বাজারে দেশি পেঁয়াজের কেজি ৪০ টাকার মধ্যে ছিল। আর ভারতীয় পেঁয়াজের কেজি ছিল ২৫ থেকে ৩০ টাকা। হঠাৎ লাফিয়ে দাম বাড়ার কারণ ছিল ভারতে মূল্য বৃদ্ধি।
তার আগের বছর ২০১৯ সালে দেশে পেঁয়াজের কেজি ৩০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। মূল্য বৃদ্ধির শুরুটা হয়েছিল ভারত থেকে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায়। ভারত নিজেদের বাজার সামাল দিতে ওই বছরের ১৩ সেপ্টেম্বর পেঁয়াজ রফতানিতে ন্যূনতম মূল্য প্রতি টন ৮৫০ ডলার বেঁধে দেয়। ৩০ সেপ্টেম্বর রফতানিই নিষিদ্ধ করে দেয় দেশটি। এরপর দেশের বাজারে পেঁয়াজের দামে শতক হয়, দ্বিশতক হয়। নভেম্বরে ৩০০ হাঁকায় পেঁয়াজ। তখন আকাশপথেও আমদানি করতে হয়।
এবার তেমন আশঙ্কা নেই বলে মনে করছেন পাইকারি ব্যবসায়ী ও আড়তদাররা। শ্যামবাজারের রাজ ট্রেডিংয়ের আড়তদার বলেন, ‘লকডাউনে বেচাকেনা তেমন ছিল না। সেই পেঁয়াজই এখন বিক্রি হচ্ছে। মহাজনরা কিছুটা লাভ হলেই পেঁয়াজ ছেড়ে দিচ্ছেন। কারণ মাস দুয়েক পর ভারতে নতুন মৌসুমের পেঁয়াজ উঠবে। তারপর আসবে দেশি পেঁয়াজ। তখন দাম আরো কমতে পারে। এখন দেশি ও আমদানি দুই ধরনের পেঁয়াজের সরবরাহই যথেষ্ট পরিমাণে রয়েছে। সব মিলিয়ে এবার দাম এখনকার চেয়ে বাড়বে না বলেই মনে হচ্ছে।’
১৩ আগস্ট শ্যামবাজারে পাইকারিতে দেশি পেঁয়াজ ৩৫ থেকে ৩৭ টাকা এবং আমদানির পেঁয়াজ ২৮ থেকে ৩৫ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছে। খুচরায় কেজিপ্রতি ব্যবধানটা একটু বেশি। গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে খুচরায় সব ধরনের পেঁয়াজই ৫০ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছে। তবে বাছাই করা পেঁয়াজ কেজিতে পাঁচ টাকা বেশি রাখছেন বিক্রেতারা।
জানা গেছে, ভারত, তুরস্কসহ অনেক দেশে দুই থেকে তিন মৌসুমে পেঁয়াজ উৎপাদিত হলেও আমাদের দেশে হয় শুধু শীত মৌসুমে। ফলে পেঁয়াজের বাজার আমদানি নির্ভরতা থেকে বের হতে পারেনি। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ আবাদ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। এতে উৎপাদনও বাড়ছে। প্রতিবছর নিয়ম করে ৩ থেকে ৪ শতাংশ উৎপাদন বাড়লেও ২০১৯-২০ সালে উৎপাদন বেড়েছে ৮ শতাংশের বেশি। এর পরিমাণ দেড় লাখ টনের ওপরে। ২০২০-২১ সালের হিসাব পাওয়া না গেলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, উৎপাদন বৃদ্ধির হার আরো বাড়বে।
বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, দেশে বছরে পেঁয়াজের চাহিদা রয়েছে ২৫ লাখ টনের বেশি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, ২০১৯-২০ সালে দেশে পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছে ১৯ লাখ ৫৩ হাজার টন। এটা আগের বছরের তুলনায় এক লাখ ৫১ হাজার টন বেশি। ২০১৮-১৯ সালে উৎপাদন ছিল ১৮ লাখ দুই হাজার টন। সে হিসাবে এক বছরে পেঁয়াজের উৎপাদন বেড়েছে ৮.৩২ শতাংশ। তার আগের বছর পেঁয়াজের উৎপাদন বেড়েছিল ৬৫ হাজার ১৫৪ টন বা ৩.৭৩ শতাংশ। ২০১৭-১৮ সালে পেঁয়াজের উৎপাদন ছিল ১৭ লাখ ৩৭ হাজার টন।।
#
সর্বশেষ হালনাগাদ 5 years আগে
