অজয় বিশ্বাস
নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ক্ষুদ্র ঋণ (গ্রামীণ ব্যাংক মডেল) বিশ্বের বিভিন্ন দেশ অনুসরণ করছে। বলা হয়ে থাকে, এই মডেল দরিদ্র মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা পরিবর্তনের পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছে। কিন্তু এই মডেল পুরোপুরি সফল, তা বলা যাবে না। এই মডেলের সবলতা যেমন রয়েছে, তেমনি দুর্বলতাও রয়েছে। দরিদ্র মানুষের জীবন মান উন্নয়নে এটাই একমাত্র নিয়ামক মডেল এখনও হতে পারেনি। এর কার্যকারিতা, সবলতা ও দুর্বলতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে চলছে বিতর্ক।
আমরা এখানে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মাইক্রোফাইন্যান্সিং মডেল এর সবলতা ও দুর্বলতা নিয়ে একটি নিরপেক্ষ আলোচনা উপস্থাপন করছি। ড. ইউনূস ১৯৭৬ সালে গ্রামীণ ব্যাংকের মাধ্যমে মাইক্রোফাইন্যান্সিং এর (বিশেষ করে গ্রুপ ভিত্তিক মাক্রোক্রেডিট) পথপ্রদর্শক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন। কিন্তু তা পুরোপুরি সত্য নয়। গ্রুপ ভিত্তিক ক্ষুদ্র ঋণ প্রদান বাংলাদেশে এর আগেই শুরু হয়েছিল। প্রথমে এই ধারণার জন্ম হয় বিশ্বের দুটি দেশে। অর্থাৎ নারীদেরকে সংগঠিত করে গ্রুপভিত্তিক ক্ষুদ্র ঋণ প্রদান। উদ্দেশ্য তাদের জীবন মান উন্নয়ন।
ড. ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংক মডেলে ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রম শুরু করেন ১৯৮৩ সালে। তার আগে তিনি যখন অধ্যাপনা করতেন সেই সময় (১৯৭৬ সালে); তিনি একবার চট্টগ্রামের জোবরা গ্রামে গিয়ে নিজের পকেট থেকে পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকজন মহিলাকে অর্থ দিয়ে ক্ষুদ্র ঋণের সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু করেন। এই ধারণা তার মনে সাড়া দিয়েছিল। কারণ ১৮৫০ সালে মূলত ক্ষুদ্র ঋণের কাজ শুরু হয়ছিল জার্মানিতে। আর ড. ইউনূস ১৯৮৩ সালে গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে কার্যক্রম শুরু করেন। কিন্তু এরও আগে ব্র্যাকের স্যার ফজলে হোসেন আবেদ-এর নেতৃত্বে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৭৪ সালে। গ্রুপভিত্তিক নারীদেরকে ঋণ দিয়ে তিনি সফলভাবে এই কাজ শুরু করেছিলেন। ব্র্যাক ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন ব্র্যাকের মূল উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশ পুনর্গঠন ও ত্রাণ সরবরাহ। পরে তারা দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন কর্মসূচিতে যায় এবং ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি শুরু করে। এটি ব্র্যাকের সবচেয়ে পুরোনো কর্মসূচির একটি। ক্ষুদ্র ঋণের কাজটি পরীক্ষামূলকভাবে ড. ইউনূসও শুরু করেছিলেন ১৯৭৬ সাল থেকে। এদিক থেকে বলা যায় ব্র্যাক বা স্যার ফজলে হোসেন আবেদ বাংলাদেশে প্রচলিত ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রমের পথপ্রদর্শক। ড. ইউনূস নন। তবে ব্র্যাকের মডেল ব্যাংকিং নয়। গ্রামীণ ব্যাংকের মডেল এর পথপ্রদর্শক ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
বিশ্বের ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রমের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় মানবিক কারণে এই ধারণার উদ্ভব বহু আগে থেকে। জার্মানিতে ক্ষুদ্র ঋণের আদলে শুরু হয় ক্রেডিট ইউনিয়ন। এই ক্রেডিট ইউনিয়নের সূচনা করেন শুলজে ডেলিটশ। তিনি ১৮৫০ সালে জার্মানিতে প্রথম পিপলস ব্যাংক বা ক্রেডিট কো-অপারেটিভ প্রতিষ্ঠা করেন। এটি শহুরে ব্যবসায়ী, কারিগর ও ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য করা হয়েছিল। এর কিছু পরে ফ্রিডরিখ উইলহেলম রাইইজেন ১৯৬৪ সালে গ্রামাঞ্চলে হেডেডর্ফ ক্রেডিট ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল মূলত কৃষকদের জন্য। আধুনিক ক্রেডিট ইউনিয়নের মূল মডেল (সামাজিক জামিন, সদস্য মালিকানা এবং অলাভজনক) হিসেবে এখনও তা বিবেচিত হয়। এরপর আসেন পাওলো ফ্রেইরে। তিনি ছিলেন একজন (ব্রাজিলিয়ান শিক্ষাবিদ) তিনি সরাসরি ক্রেডিট ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠায় জড়িত ছিলেন না। তবে তাঁর ক্রিটিক্যাল পেডাগজি (সচেতনতা ও ক্ষমতায়নের শিক্ষা) এটি কউিনিটি ডেভেলপমেন্ট, কো-অপারেটিভ ও মাইক্রোফাইন্যান্স প্রোগ্রামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। ব্রাজিলে ক্ষুদ্র ঋণ ও কমিউনিটি ব্যাংকের কাজে ফ্রেইরের চিন্তাধারা প্রভাব ফেলেছে।
মোদ্দাকথা, জার্মান ক্রেডিট ইউনিয়নের আধুনিক ভিত্তি ১৮৫০ এবং ১৮৬৪ সালে স্থাপিত হয়। এটি গ্রুপ ভিত্তিক/সহযোগিতামূলক ঋণ ব্যবস্থার প্রাচীন উদাহরণ, যা পরে বিশ্বের মাইক্রোফাইন্যান্সের মূল ধারণাকে প্রভাবিত করেছে। আসলে জার্মান ক্রেডিট উনিয়ন ও ব্রাজিলের পাওলো ফ্রেইরের ধারণা থেকে আধুনিক ক্ষুদ্র ঋণের আজকের কার্যক্রম। ৪৩ বছর আগে বাংলাদেশে গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সময় ড. ইউনূস সম্ভবত এই দুটি ধারণাকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ ব্যাংক মডেল উদ্ভাবন করেন। একইভাবে ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত, পরে ক্ষুদ্র ঋণে বড় ভূমিকা রাখে। তাই ব্র্যাক, গ্রামীণ ব্যাংক ও আশাকে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ঋণের তিন প্রধান ‘পাইওনিয়ার’ বলা হয়। গ্রামীণ গ্রুপভিত্তিক মাইক্রোক্রেডিট মডেলের মূল বৈশিষ্ট্য হলো- দরিদ্রদের (বিশেষ করে গ্রামীণ নারীদেরকে) জামানতবিহীন ছোট ঋণ প্রদান, সামাজিক চাপের মাধ্যমে পুনরায় ঋণ শোধের নিশ্চয়তা এবং ‘সামাজিক ব্যবসা’ ড. ইউনূসের দর্শন। ২০০৬ সালে নোবেল পুরস্কার লাভের পর এটি বিশ্বব্যাপী বিশেষ প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করা হয়। নিরপেক্ষভাবে এই মডেলের সবলতা ও দুর্বলতা (সাম্প্রতিক তথ্য ও গবেষণার ভিত্তিতে) তুলে ধরা হলো।
সবলতা - দরিদ্রদের আর্থিক অন্তর্ভূক্তি ও নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে এই মডেলের সাফল্য কতটুকু এ বিষয়ে কিছুটা আলোচনা করা যাক। জামানত ছাড়া ঋণ দিয়ে দরিদ্র, বিশেষ করে নারীদের (৯৭-৯৮% ঋণ গ্রহীতা নারী) উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা হয়। এ কারণে নারীর আয় বৃদ্ধি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতা ও পরিবারের শিক্ষা-স্বাস্থ্য উন্নত হয়। গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণগ্রহীতাদের আয় ৪৩% এর বেশি হওয়ার প্রমাণ কিছু কিছু ক্ষেত্রে পাওয়া যায় বলে অনেকে উল্লেখ করেন। অনেকে বলেন পুনরায় শোধের হার ও স্থায়িত্ব সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় ৯৫%। এটি প্রমাণ করে দরিদ্ররা ঋণগ্রহণযোগ্য।
দারিদ্র্য হ্রাসে অবদান সম্পর্কিত গবেষণায় এটি মাঝারি দারিদ্র্য এবং চরম দারিদ্র্য ১০% কমিয়েছে বলে কিছু গবেষক মনে করেন। একই সঙ্গে দরিদ্রদের জীবন মান উন্নত হয়েছে। গ্রামীণ ব্যাংক দাবি করে, অনেক ঋণ গ্রহীতা তীব্র দারিদ্র্য থেকে বের হয়ে এসেছে। কিন্তু বাস্তবে তার প্রমাণ পাওয়া যায় না। কারণ অতিদরিদ্র বা হত দরিদ্র এই ঋণ কর্মসূচির বাইরে। কারণ শুধু গ্রামীণ ব্যাংক নয় কোনো ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠান তাদেরকে ঋণ দেয় না।
তবে বেশ কিছু সাফল্য থাকা সত্ত্বেও এর মধ্যে শুভঙ্করের ফাঁকি রয়েছে। প্রথমত গ্রামীণ ব্যাংকের একটা নির্দিষ্ট মানদণ্ড আছে। তার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয় কারা ঋণ পাবে আর কারা পাবে না। গ্রামীণ ব্যাংক ফলাও করে প্রচার করলেও সমাজের হতদরিদ্র বা অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠী এই ঋণের আওতার বাইরে থেকে যায়। মাঠ পর্যায়ে প্রাক ঋণ মূল্যায়নের পর ঋণ গ্রহীতা নির্ধারণ করা হয়। তবে ব্র্যাকের অতি দরিদ্রদের জন্য কিছু কর্মসূচি আছে। গ্রামীণ ব্যাংকের ভিক্ষুকদের সহায়তার একটি কর্মসূচি রয়েছে। কিন্তু অতিদরিদ্রদের জন্য কোনো কর্মসূচি নেই।
বাংলাদেশে এখন অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর হার বেড়েছে। বর্তমানে (২০২৫-২৬ সালে) দেশে অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর হার ৯.৩৫%। অথচ ২০২২ সালে এর হার ছিল ৫.৬% (আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য সীমা অনুসারে)। ২০২৫ সালের জরিপে দেখা যায়, অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর দরিদ্রসীমা বেড়ে ৯.৩৫% দাঁড়িয়েছে। কোনো ক্ষেত্রে তা আরও বেশি। অন্যদিকে সাধারণ দরিদ্রতার সীমাও বেড়ে ২৭.৯৩% দাঁড়িয়েছে। এর কারণ হিসেবে অর্থনৈতিক সংকট, মূল্যস্ফীতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইত্যাদি কারণ উল্লেখ করা হয়।
ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমে দুর্বলতা - গ্রামীণ ব্যাংকের সুদের হার ২০% (ফ্লাট/রিডুসিং) এর কাছাকাছি। এই হার মহাজনদের থেকে কম হলেও প্রচলিত ব্যাংকের চেয়ে অনেক বেশি। অন্যান্য ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠানের চেয়েও বেশি। এটি প্রশাসনিক খরচের কারণে হয়, ফলে ঋণ গ্রহীতাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। ড. ইউনূস নিজেও স্বীকার করেন যে কিছু প্রতিষ্ঠান এটিকে লাভের জন্য অপব্যবহার করছে।
দীর্ঘমেয়াদী দারিদ্র্য হ্রাসে সীমিত প্রভাব-অনেক র্যান্ডমাইজড কন্ট্রোল ট্রায়াল এবং সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে যে আয় বা দারিদ্র্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব দুর্বল বা নগণ্য। এটি দারিদ্র্যের মূল কারণ (ভূমি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য বাজারের অসমতা) যা সমাধান করে না।
ঋণের ফাঁদ ও অতিরিক্ত ঋণ - একাধিক এমএফআই (মাক্রো ফাইন্যান্স ইনস্টিটিউশন) থেকে ঋণ নেওয়ার ফলে কিছু পরিবার ঋণের চাপে পড়ে। নারীদের ওপর সামাজিক চাপ (সম্মান-লজ্জার কোড) ব্যবহার করে ঋণ আদায়ের সমালোচনা ব্যাপক।
বাণিজ্যিকীকরণ ও মিশন ড্রিফট - গ্রামীণ মডেল ব্যবহার করে অনেক প্রতিষ্ঠান অধিকভাবে লাভবান হয়ে পড়ায় মূল লক্ষ্য (দারিদ্র্য কল্যাণ) থেকে সরে যায়। এটি টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এর প্রধান কারণ উচ্চ সুদের হার।
ড. ইউনূসের মাইক্রো ফাইন্যান্সিং মডেল একটি উদ্ভাবনী ধারণা যা বিশ্বব্যাপী দরিদ্রদের আর্থিক সেবা পৌঁছে দিয়ে লাখ লাখ মানুষের জীবন উন্নত করতে সচেষ্ট এবং নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রেও কিছুটা ভূমিকা রাখছে। তবে নারীর ক্ষমতায়ন যে শুধু ক্ষুদ্র ঋণ দিয়ে করা যাবে এই ধারণাটি সঠিক নয়। এর পাশাপাশি আরও বহু উপাদান রয়েছে। তার মধ্যে দুটি হলো - সচেতনতা সৃষ্টি ও স্বল্প বা দীর্ঘমেয়াদী দক্ষতা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ।
গ্রামীণ ব্যাক মডেলে এরকম কোনো কার্যকর কর্মসূচি নেই। এসব বিষয় সাদা চোখে দেখলে বা শুনলে ভালো মনে হয়। কিন্তু বাস্তবতা সেরকম নয়। মানুষের জীবন উন্নত হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো কোন মানুষের? ভালো করে দেখলে তা বোঝা যায়। ক্ষুদ্র ঋণ গ্রহীতার হার সবচেয়ে বেশি উচ্চ মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তের মধ্যে। প্রকৃত দরিদ্র বা অতিদরিদ্র প্রান্তিকরা এর আওতার বাইরে। কারণ শুধু গ্রামীণ ব্যাংক নয়, কোনো ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠান বা এনজিও প্রকৃত দরিদ্র ও হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীকে ঋণ দেয় না। কারণ তারা মনে করে তারা ঋণ পরিশোধ করতে পারবে না। ফলে তারা এই সুবিধা ব্যবহার করার সুযোগ পায় না। প্রকৃত দরিদ্র বা হতদরিদ্র কেউ ঋণ নিলে সহজে পরিশোধ করতে পারে না এই ব্যর্থতারও বহু কারণ রয়েছে। কারণ তাদের কোনো নির্দিষ্ট বা নিয়মিত আয় নেই। ফলে ঋণের ফাঁদে পড়ে সর্বস্ব হারায়। এই মডেলের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এটি। ফলে এটা বলতে বাধ্য যে কোনো কোনো ক্ষেত্রে গ্রামীণ মডেল দরিদ্র মানুষের জীবন মান উন্নয়ন করতে গিয়ে তাদেরকে নিঃস্ব করে ফেলে এবং তাকে ঘরবাড়ি ফেলে অন্যত্র পালিয়ে গিয়ে বসবাস করতে বাধ্য করে। ব্যর্থতা শুধু গ্রামীণ ব্যাংকের নয়। ব্র্যাক বা আশা এর ঋণ পদ্ধতি এবং বহু এনজিও এবং স্থানীয় এনজিও ব্যবহার করে। তারা অনেকেই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অফিসে বসে হিসাব-নিকাশ করেন। কেউ কেউ বিলাসী জীবনযাপন করে। তাদের ভাগ্য বদলায়। কিন্তু প্রকৃত দরিদ্র ও হতদরিদ্রদের জীবনে কোনো পরিবর্তন আসে না। এটা মাঠের বাস্তব চিত্র।
সরকার ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী সংস্থাসমূহের অনিয়ম এবং অধিক মুনাফা অর্জনের পথ বন্ধ করতে মাইক্রো ক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি প্রতিষ্ঠা করেছে। তারা ক্ষুদ্র ঋণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ তত্ত্বাবধায়ক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু কোনো অনিয়মের ক্ষেত্রে, এমন কি অভিযোগ পাওয়ার পরেও তা কোনো কাজে আসে না। তারা এসব বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেন না। একটি রিপোর্ট জমা দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেন। কাজের কাজ কিছুই হয় না। আঞ্চলিক এনজিওদের ক্ষুদ্র ঋণ ব্যবসা খুব জমজমাট। ফলে সংগত কারণেই দরিদ্র ও হতদরিদ্ররা বিভিন্নভাবে শোষণের শিকার।
ব্র্যাক, গ্রামীণ ব্যাংক বা আশা এসব বিষয়ে আরও বেশি ভাবা উচিত। এভাবে নারীর ক্ষমতায়ন বা দরিদ্র মানুষের আর্থিক সক্ষমতা তৈরি খুবই কঠিন। সত্যটি আমাদেরকে উপলব্ধি করতে হবে। আরও নতুন কিছু ভাবতে হবে। এখনই সারা বিশ্বে ড. ইউনূসের মাইক্রোফাইন্যান্সিং বিতর্কিত হয়ে উঠেছে। কেউ কেউ এটি থেকে বেরিয়ে আসছেন। ‘সামাজিক ব্যবসা’ এখন গালভরা বুলি মাত্র! এটা থেকেও অনেকে পশ্চাৎপসরণ করছে। বিশ্বব্যাপী এই মডেলের কদর খুব দ্রুত হারিয়ে যাবে, যদি না এর সংস্কার করা হয়। গ্রামীণ ব্যাংক মডেল এখন আর আহামরি কিছু নয়। ব্যাংকের নিয়মে নয় দলীয়ভাবে নারীদেরকে ঋণ দেওয়ার কাজ অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই করছে। নিজেরা লাভবান হচ্ছে, তবে দরিদ্ররা যে তিমিরে সেই তিমিরেই আছে। আর ভেতরে ভেতরে অনেকেই আগের মহাজনের ভূমিকায় অবতীর্ণ। গ্রামীণ মডেল দরিদ্রদের জন্য একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। কিন্তু এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে আরও কিছু উপাদান। না হলে গ্রামীণ ব্যাংকের একটি দাবি নারী উদ্যোক্তা তৈরি অসত্য প্রমাণিত হয়। তাই এটাকে উদ্যোক্তা তৈরির মতো গালভরা কথাটি না বলাই ভালো। প্রকৃত একজন উদ্যোক্তার সঙ্গে ক্ষুদ্র ঋণ তখনই কার্যকর করা যাবে যখন এর সঙ্গে উদ্যোক্তা তৈরির অন্যান্য উপাদানগুলো যুক্ত হবে। কিছু প্রতিষ্ঠান এই কাজগুলো করে, তারপর ঋণ দেয়। এট্ইা ক্ষুদ্র্ ঋণের পূর্বশর্ত হওয়া উচিত। ক্ষুদ্র্ ঋণ দরিদ্রদের আর্থিক স্বনির্ভরতা অর্জনের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। তবে এটির সাহায্যে কেউ এককভাবে দারিদ্র্যমুক্ত বিশ্ব গড়তে পারবে না। তার সঙ্গে স্থানীয় প্রেক্ষাপট, শক্তিশালী তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং উপযুক্ত নীতিমালা কার্যকর করা অতি জরুরি।
লেখক : উন্নয়ন গবেষক ও সাংবাদিক
সর্বশেষ হালনাগাদ 1 hour আগে

