অর্থকাগজ প্রতিবেদন
পুঁজি বাজারে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার কেন্দ্রে থাকা মেয়াদি (ক্লোজড-এন্ড) মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হওয়া আইনি জটিলতার অবসান ঘটেছে। সর্বশেষ আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতের আদেশের ফলে এসব ফান্ডকে বেমেয়াদি (ওপেন-এন্ড) ফান্ডে রূপান্তর কিংবা অবসায়নের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বাধা কার্যত দূর হয়েছে। এতে একদিকে যেমন নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও ট্রাস্টি প্রতিষ্ঠানগুলো স্বস্তি পেয়েছে, অন্যদিকে বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও ফান্ডগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা অনেকটাই কেটে গেছে।
এর আগে কয়েকজন ইউনিটহোল্ডারের দায়ের করা রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট সংশ্লিষ্ট ফান্ডগুলোর রূপান্তর ও অবসায়ন কার্যক্রমে দুই মাসের জন্য স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ফলে নির্ধারিত প্রক্রিয়াগুলো সাময়িকভাবে স্থগিত হয়ে যায় এবং বেশ কয়েকটি ট্রাস্টি প্রতিষ্ঠান তাদের পরিকল্পিত বিশেষ সাধারণ সভা (ইজিএম) আয়োজনের প্রস্তুতি বন্ধ রাখে। তবে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ওই আদেশের বিরুদ্ধে আবেদন করলে শুনানি শেষে চেম্বার আদালত হাইকোর্টের স্থিতাবস্থা আদেশ স্থগিত করেন। এর ফলে সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পুনরায় চালুর সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম জানিয়েছেন, মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের রূপান্তর সংক্রান্ত নির্দেশনা কমিশন গত ৯ জুন জারি করে। পরবর্তীতে হাইকোর্টের আদেশের পর ১১ জুন ট্রাস্টিদের জানানো হয়েছিল যে, স্থিতাবস্থা কেবল রিটকারী ইউনিটহোল্ডারদের জন্য প্রযোজ্য হবে। ফলে অন্য ইউনিটহোল্ডারদের ক্ষেত্রে রূপান্তর ও অবসায়নের কার্যক্রম চলমান রাখা সম্ভব ছিল। তবে সর্বশেষ আদালতের আদেশে সেই সীমাবদ্ধতাও দূর হয়েছে। এখন কোনো ইউনিটহোল্ডারই এ প্রক্রিয়ার বাইরে থাকছেন না এবং সব ট্রাস্টি প্রতিষ্ঠান তাদের অধীনস্থ ফান্ডের বিষয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের সুযোগ পাচ্ছে।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশের অধিকাংশ ক্লোজড-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ড বাজারদরে নিট সম্পদমূল্যের (এনএভি) তুলনায় উল্লেখযোগ্য ডিসকাউন্টে লেনদেন হয়ে আসছে। ফলে বিনিয়োগকারীরা প্রত্যাশিত মূল্য পাচ্ছিলেন না। এ অবস্থায় ওপেন-এন্ড ফান্ডে রূপান্তর বা অবসায়নের সুযোগ তৈরি হলে ইউনিটহোল্ডারদের বিনিয়োগের প্রকৃত মূল্য পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা বাড়বে।
নতুন ‘মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা, ২০২৫’-এ এ বিষয়ে সুস্পষ্ট কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো ফান্ডের ইউনিটের গড় বাজারদর যদি গেজেট প্রকাশের ছয় মাসের মধ্যে ক্রয়মূল্য অথবা ঘোষিত নিট সম্পদমূল্যের (এনএভি) মধ্যে যেটি বেশি, তার তুলনায় ২৫ শতাংশের বেশি কমে যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ট্রাস্টিকে ইউনিটহোল্ডারদের নিয়ে বিশেষ সাধারণ সভা আহ্বান করতে হবে।
সেই সভায় উপস্থিত ভোটদানকারী ইউনিটহোল্ডারদের অন্তত ৭৫ শতাংশ সমর্থন দিলে এবং বিএসইসির অনুমোদন পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ফান্ডকে ওপেন-এন্ড ফান্ডে রূপান্তর অথবা অবসায়নের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা যাবে। এই বিধান বাস্তবায়নের জন্য চলতি বছরের ৭ মে বিস্তারিত নির্দেশনা জারি করে কমিশন।
তবে কয়েকজন ইউনিটহোল্ডার কমিশনের ওই নির্দেশনার বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হন। তাদের যুক্তি ছিল, ২০১৮ সালের সরকারি গেজেটের মাধ্যমে যেসব ক্লোজড-এন্ড ফান্ডের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিল, সেসব ফান্ডের বর্ধিত মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই রূপান্তর বা অবসায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলে ইউনিটহোল্ডারদের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
রিট আবেদনের শুনানি শেষে গত ২১ মে হাইকোর্ট বিএসইসির ৭ মে জারি করা নির্দেশনা এবং মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা, ২০২৫-এর ৬২, ৬৩ ও ৬৪ নম্বর বিধির বৈধতা নিয়ে রুল জারি করেন। একই সঙ্গে দুই মাসের জন্য রূপান্তর ও অবসায়ন কার্যক্রমে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেন। ওই আদেশের পর বিষয়টি নিয়ে পুঁজিবাজারে নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়।
তবে সর্বশেষ চেম্বার আদালতের সিদ্ধান্তে সেই অনিশ্চয়তা অনেকটাই কেটে গেছে। এখন থেকে মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর ভবিষ্যৎ নির্ধারণে মূল ভূমিকা পালন করবেন ইউনিটহোল্ডাররাই। বিশেষ সাধারণ সভায় উপস্থিত ভোটদাতাদের কমপক্ষে ৭৫ শতাংশ যে সিদ্ধান্তের পক্ষে মত দেবেন এবং বিএসইসি তা অনুমোদন করবে, সেই সিদ্ধান্তই চূড়ান্তভাবে কার্যকর হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ প্রক্রিয়া একদিকে যেমন বিনিয়োগকারীদের মতামতকে গুরুত্ব দিচ্ছে, অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে ডিসকাউন্টে লেনদেন হওয়া ক্লোজড-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর কাঠামোগত সমস্যার সমাধানের পথও তৈরি করছে। ফলে দেশের মিউচুয়াল ফান্ড খাতে নতুন গতি সঞ্চারের পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারেও এ সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সর্বশেষ হালনাগাদ 5 hours আগে

