অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
আন্তর্জাতিক বাজারে লম্বা সময় ধরে নিম্নমুখী থাকলেও দেশে ২০১৬ সালের এপ্রিলের পর সাড়ে ছয় বছর কমানো হয়নি জ্বালানি তেলের দাম। এতে (২০১৪-১৫ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর) সাত বছরে প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকা মুনাফা করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। তবে ২০২১ সাল থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়তে শুরু করে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম। সে কারণে ২০২১ সালের অক্টোবরে ডিজেলের দাম এক লাফে ১৫ টাকা বাড়ানো হয়।
২০২২ সালের জুনে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছায়। এতে ২০২১-২২ অর্থবছর লোকসানের মুখে পড়ে দেশে জ্বালানি তেলের একমাত্র আমদানিকারক ও বিপণনকারী সংস্থাটি। এতে ২০২২ সালের আগস্টে দেশে রেকর্ড বাড়ানো হয়েছিল সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম। যদিও ওই বছরই জুলাই থেকে আবারও আন্তর্জাতিক বাজারে কমতে শুরু করে তেলের দাম। এরপর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম অনেকটাই হ্রাস পায়। তবে দেশের বাজারে দাম নামমাত্র সমন্বয় করা হয়।
এতে ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছর আবারও বড় মুনাফা করে বিপিসি। সব মিলিয়ে ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে গত ১০ বছরের মধ্যে ৯ বছরে বিপিসি মুনাফা করেছে ৫১ হাজার ৫২১ কোটি টাকা। এক দশকের মধ্যে শুধু ২০২১-২২ অর্থবছর সংস্থাটি লোকসান গুনেছিল ২ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা। এতে ৯ বছরে বিপিসির নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৪৮ হাজার ৮১৬ কোটি টাকা। সংস্থাটির গত ১০ অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এ চিত্র পাওয়া গেছে। গত অর্থবছরের আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০২৩-২৪ অর্থবছর বিপিসি আয় করেছে ৭৫ হাজার ৭৯৪ কোটি ৫১ লাখ টাকা। আর কস্ট অব গুডস সোল্ড ছিল ৬৯ হাজার ৮৪৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। অন্যান্য আয়-ব্যয় সমন্বয় করে গত অর্থবছর সংস্থাটি নিট মুনাফা করেছে তিন হাজার ৯৪৩ কোটি ২৯ লাখ টাকা। যদিও ২০২২-২৩ অর্থবছর বিপিসি নিট মুনাফা করেছিল চার হাজার ৫৮৬ কোটি ১০ লাখ টাকা। অর্থাৎ গত অর্থবছর সংস্থাটির মুনাফা কমেছে ৬৪২ কোটি ৮১ লাখ টাকা বা ১৪ শতাংশ। তবে জ্বালানি তেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা মুনাফা অস্বাভাবিক বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আন্তর্জাতিক বাজারের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২১ সালের জানুয়ারিতে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ছিল প্রতি ব্যারেল ৫৪ দশমিক ৭৭ ডলার। এরপর প্রতি মাসেই তা বেড়েছে। ওই বছর জুনে তা পৌঁছায় ৭৫ দশমিক ১৭ ডলারে। পরের মাসগুলোয় দ্রুত বাড়ে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম। যদিও মাঝে দু-তিন মাস কিছুটা হ্রাস পায়। এতে ২০২২ সালের জুনে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম পৌঁছায় ১২২ দশমিক ৭১ ডলারে। পরের মাস থেকেই তা টানা কমতে শুরু করে। মাঝে দু-এক মাস সামান্য বাড়লেও ২০২৩ সালের জুনে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম প্রতি ব্যারেল পৌঁছায় ৭৪ দশমিক ৮৪ ডলারে, যা ২০২১ সালের জুনের চেয়েও কম। পরে জ্বালানি তেলের দাম কিছুটা ওঠানামা করলেও ২০২৪ সালের জুন শেষে তা ৭৯ ডলারের ঘরেই ছিল।
এদিকে নিম্নমুখী পরিস্থিতিতে ২০২২ সালের আগস্টে দেশে জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড বাড়িয়ে সমালোচনার মুখে পড়ে সরকার। এতে আগস্টেই জ্বালানি তেলের দাম সামান্য কমানো হয়। এরপর আন্তর্জাতিক বাজারে কমলেও দেশে আর কমানো হয়নি তেলের দাম। এর মধ্যে জ্বালানি তেলে ভর্তুকি তুলে দেয়ার শর্ত দেয় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। ঋণের শর্ত হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে তেলের দাম প্রতি মাসে সমন্বয়ের শর্ত দেয় সংস্থাটি।
আইএমএফের পরামর্শে নীতিমালা করলেও জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অজুহাতে তা বাস্তবায়ন বিলম্বিত করা হয়। ধারণা করা হয়েছিল নীতিমালাটি বাস্তবায়িত হলে বিপিসির মুনাফা বা লোকসান প্রায় শূন্য পর্যায়ে নেমে আসবে। তবে বাস্তবে তেমনটি হয়নি। বরং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয়ের ক্ষেত্রেও নিজের মুনাফার অংশ ঠিকই বহাল রেখেছে বিপিসি। এতে আগের মতোই জনগণের পকেট কেটে মুনাফা করছে সংস্থাটি। স্বয়ংক্রিয় সমন্বয় পদ্ধতি চালুর পর গত ৮ মার্চ ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটারে মাত্র ৭৫ পয়সা কমানো হয়। সে সময় পেট্রোলের দাম তিন টাকা ও অকটেনের দাম লিটারে চার টাকা কমানো হয়। এপ্রিলে পেট্রোল ও অকটেনের দাম অপরিবর্তিত থাকলেও ডিজেল ও কেরোসিনের দাম আরও দুই টাকা ২৫ পয়সা কমানো হয়। তবে পরের দুই মাসে ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটারে ৭৫ পয়সা করে মোট এক টাকা ৫০ পয়সা বাড়ানো হয়। আর পেট্রোল ও অকটেনের দাম দুই ধাপে পাঁচ টাকা বাড়ানো হয়। বিপিসির এক দশকের আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম অনেকটা হ্রাস পাওয়ায় ২০১৪-১৫ অর্থবছর বড় অঙ্কের মুনাফার দেখা পায় বিপিসি। সে অর্থবছর সংস্থাটি মুনাফা করে চার হাজার ২১২ কোটি দুই লাখ টাকা। যদিও এর আগে টানা ছয় অর্থবছর লোকসান করেছিল বিপিসি। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও কমায় পরের অর্থবছর সংস্থাটির মুনাফা বেড়ে দাঁড়ায় ছয় হাজার ৬৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা। অর্থাৎ ২০১৫-১৬ অর্থবছর বিপিসির মুনাফা বৃদ্ধি পায় প্রায় ৪৪ শতাংশ।
বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিম্নমুখী থাকায় সংস্থাটির মুনাফার একই ধারা অব্যাহত থাকে পরের অর্থবছরও। এতে ২০১৬-১৭ অর্থবছর বিপিসির মুনাফা বেড়ে দাঁড়ায় আট হাজার ৪৪ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ ওই অর্থবছর মুনাফা বৃদ্ধির হার ছিল ৩২ দশমিক ৬৭ শতাংশ। তবে উচ্চ মুনাফার পরও দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম না কমানোয় সমালোচনার মুখে পড়ে সরকার। এতে অনেকটা বাধ্য হয়ে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম কমানো হয় ২০১৬ সালের ২৫ এপ্রিল। এর প্রভাবে পরের অর্থবছর বিপিসির মুনাফা কিছুটা হ্রাস পায়। এতে ২০১৭-১৮ অর্থবছর বিপিসির মুনাফা দাঁড়ায় ছয় হাজার ৫৩৩ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। এরপর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কিছুটা বৃদ্ধি পায়। এতে বিপিসির মুনাফা আরও হ্রাস পায়। ফলে ২০১৮-১৯ অর্থবছর সংস্থাটি মুনাফা করে তিন হাজার ৯৮০ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। এরপর বিশ্ববাজারে তেলের দাম খুব বেশি ওঠানামা করেনি।
যদিও করোনা সংক্রমণ শুরুর পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম আবার নিম্নমুখী হতে শুরু করে। এতে বিপিসির মুনাফা বাড়তে থাকে। ফলে ২০১৯-২০ অর্থবছর সংস্থাটি মুনাফা করে পাঁচ হাজার ৬৫ কোটি ৩০ লাখ টাকা। ২০২০ সালের মাঝামাঝি বিশ্ববাজারে তেলের দাম রেকর্ড পর্যায়ে নামে। এর প্রভাবে বিপিসির মুনাফা বাড়ে প্রায় ৮০ শতাংশ। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় ২০২০-২১ অর্থবছর লোকসান করে সংস্থাটি। ওই অর্থবছর লোকসানের পরিমাণ ছিল দুই হাজার ৭০৫ কোটি ৬৫ লাখ টাকা।
পরের অর্থবছর জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড বৃদ্ধির ফলে আবারও লোকসান থেকে মুনাফায় ফেরে বিপিসি। সে সময় এক লাফে সংস্থাটির মুনাফা দাঁড়ায় চার হাজার ৫৮৬ কোটি ১০ লাখ টাকা। ●
অকা/জ্বা/ই/ সকাল, ৩ ডিসেম্বর ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 2 years আগে

