অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
পুঁজি বাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে ন্যূনতম ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণ বাধ্যতামূলক হলেও দীর্ঘদিন ধরেই এই নির্দেশনা লঙ্ঘন করছে একাধিক কোম্পানি। বিএসইসির সর্বশেষ পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ৪৪টি কোম্পানি এখনো এই নিয়ম মানছে না। বিষয়টি নতুন নয়, কিন্তু রহস্যজনক কারণে এসব কোম্পানির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়নি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
নিয়ম মানাতে এর আগে আলাদা ক্যাটেগরি চালুর ঘোষণা, নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া এবং শেয়ার ধারণ না করলে শাস্তির হুঁশিয়ারি দেওয়া হলেও বাস্তবে এর কোনো কার্যকর প্রতিফলন দেখা যায়নি। তবে সম্প্রতি বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে, বিশেষ করে গত ১৭ এপ্রিল একটি জাতীয় দৈনিকে প্রতিবেদন প্রকাশের পর। এরপর বিএসইসি আবারও কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে চিঠি দিয়ে নির্দেশনা মেনে চলার তাগিদ দিয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, আইন না মানলে কমিশন কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। প্রয়োজনে এসব কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন কিংবা স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের মতো ব্যবস্থাও নিতে পারে সংস্থাটি।
২০১০ সালের পুঁজি বাজার ধসের পর বাজারে আস্থা ফেরাতে বিএসইসি একাধিক সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেয়। এরই অংশ হিসেবে ২০১১ সালের ২২ নভেম্বর একটি নির্দেশনার মাধ্যমে বলা হয়, তালিকাভুক্ত প্রতিটি কোম্পানির উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে কমপক্ষে ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে নির্ধারিত হয়, কোনো ব্যক্তি উদ্যোক্তা পরিচালক হতে চাইলে তাঁর নিজের নামে কমপক্ষে ২ শতাংশ শেয়ার থাকতে হবে। এই নীতিমালার মূল লক্ষ্য ছিল, কোম্পানির ব্যবস্থাপনায় জড়িত ব্যক্তিদের অর্থনৈতিকভাবে দায়বদ্ধ রাখা, যাতে তারা কোম্পানির স্বার্থরক্ষায় আন্তরিক থাকে এবং বাজারে বিনিয়োগকারীর আস্থা বাড়ে।
বিএসইসির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৪৪টি তালিকাভুক্ত কোম্পানি ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণের নির্দেশনা মানছে না। উদাহরণস্বরূপ, বস্ত্র খাতের ডেল্টা স্পিনার্সের উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে রয়েছে মাত্র ২০.৫৮ শতাংশ শেয়ার, তাল্লু স্পিনিংয়ের ২৯.৬১ শতাংশ, মিথুন নিটিং অ্যান্ড ডায়িংয়ের ১৬.৭৭ শতাংশ, জেনারেশন নেক্সট ফ্যাশনসের ১৬.২৬ শতাংশ, ফ্যামিলিটেক্সের ৪.১০ শতাংশ এবং সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলের ৭.১০ শতাংশ। জীবন বীমা খাতে সন্ধানী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারধারণ ২৯.৪৫ শতাংশ, পপুলার লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ২৩.৭০ শতাংশ।
ওষুধ ও রসায়ন খাতে অ্যাকটিভ ফাইন কেমিক্যালসের ১২.৪০ শতাংশ, সালভো কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের ২৫.১৮ শতাংশ, সেন্ট্রাল ফার্মাসিউটিক্যালসের ৭.৬৭ শতাংশ, এএফসি অ্যাগ্রো বায়োটেকের ২৭.৮৪ শতাংশ, ইন্দো-বাংলা ফার্মার ২৭.৮৯ শতাংশ শেয়ার রয়েছে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে। খাদ্য ও আনুষঙ্গিক পণ্য খাতে ফু-ওয়াং ফুডসের ৭.৮৫ শতাংশ, বঙ্গজের ২৭.১৫ শতাংশ এবং ফাইন ফুডসের ১৫.২৬ শতাংশ শেয়ার ধারণ করা হয়েছে।
প্রকৌশল খাতে আজিজ পাইপস ১১.১৬ শতাংশ, আফতাব অটোমোবাইলস ২৯.৩২ শতাংশ, বিডি থাই অ্যালুমিনিয়াম ২৯.১৮ শতাংশ, অ্যাপোলো ইস্পাত কমপ্লেক্স ২০.২৪ শতাংশ, সুহৃদ ইন্ডাস্ট্রিজ ১২.১০ শতাংশ, রতনপুর স্টিল রি-রোলিং মিলস ২৯.৯৩ শতাংশ এবং বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিলস ২৩.৭৮ শতাংশ শেয়ার ধারণ করছে। অলিম্পিক অ্যাকসেসরিজের শেয়ারধারণ মাত্র ২৫.৮১ শতাংশ। সিরামিকস খাতের স্ট্যান্ডার্ড সিরামিকস এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতের ইনফরমেশন সার্ভিসেস নেটওয়ার্কের উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের শেয়ার রয়েছে যথাক্রমে ৩০ শতাংশের নিচে এবং ২১.৪৮ শতাংশ। এছাড়া ব্যাংকিং খাতের ৭টি এবং লিজিং ও ফাইন্যান্স খাতের ৬টি কোম্পানিও নির্দেশনা মানছে না।
বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম গণমাধ্যমকে বলেন, যেসব কোম্পানির উদ্যোক্তা ও পরিচালকেরা সম্মিলিতভাবে ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণে ব্যর্থ হয়েছে, তাদের চিঠি দিয়ে সতর্ক করা হয়েছে। নির্দেশনা না মানলে কমিশন আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
উল্লেখযোগ্য যে, অতীতেও বিএসইসি নানা উদ্যোগ নিয়েছিল। ২০১৯ সালের মে মাসে এক সম্পূরক আদেশে বলা হয়, ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণের শর্ত পূরণ না করলে উদ্যোক্তারা শেয়ার বন্ধক রেখে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারবেন না, উপহার হিসেবে হস্তান্তর বা বোনাস শেয়ারও দিতে পারবেন না। একই বছর জুলাই মাসে শেয়ার ধারণ না করা কোম্পানিগুলোর জন্য পৃথক ক্যাটেগরি চালুর নির্দেশনা দেওয়া হয়, তবে তা বাস্তবায়ন হয়নি। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে ২ শতাংশ শেয়ার না রাখার দায়ে ৯টি কোম্পানির ১৭ পরিচালককে অপসারণ করা হয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, কোম্পানিগুলোর শেয়ার ধারণের বাধ্যবাধকতা বাস্তবায়ন না হলে করপোরেট সুশাসন বিঘ্নিত হবে, যা বিনিয়োগকারীর আস্থা হ্রাস করবে এবং পুঁজি বাজারকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তারা মনে করেন, শুধু নির্দেশনা দিলেই হবে না, কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম মনিটরিং ও প্রয়োজনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করলেই কেবল বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। ●
অকা/পুঁবা/ই/ সকাল/২৯ মে, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 9 months আগে

