অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
পুঁজি বাজারে বিনিয়োগ করে লোকসানের বৃত্ত থেকে বের হতে পারছে না দেশের ব্যাংকিং খাত। কেনা মূল্যের চেয়ে শেয়ারের দাম ক্ষেত্র বিশেষ অর্ধেকে নেমে এসেছে। বড় অঙ্কের লোকসানের মুখে ব্যাংকগুলো তাদের শেয়ার বিক্রি করতে পারছে না। এভাবে ৩০ বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ আটকে গেছে। এ দিকে লোকসানের বিপরীতে বাড়তি প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হচ্ছে। আবার বাজারভিত্তিক শেয়ারের বিনিয়োগ মূল্যায়ন না করায় ব্যাংকগুলোর নতুন বিনিয়োগ করার সুযোগও পাচ্ছে না। ফলে শেয়ার দর সমন্বয় করতে পারছে না। এতে দীর্ঘ মেয়াদে লোকসানের মুখে পড়ে যাচ্ছে। অপর দিকে বেশির ভাগ ব্যাংকেরই নগদ টাকার সঙ্কট দেখা দিয়েছে। সব মিলেই ব্যাংকগুলোতে এখন ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা বিরাজ করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী ব্যাংকগুলো তাদের মোট মূলধনের ২৫ শতাংশ পর্যন্ত পুঁজি বাজারে বিনিয়োগ করতে পারে। এটাই ব্যাংকগুলোর পুঁজি বাজারে বিনিয়োগসীমা। যেমন একটি ব্যাংকের মোট মূলধল এক হাজার কোটি টাকা। নীতিমালা অনুযায়ী ২৫০ কোটি টাকার শেয়ার ধারণ করতে পারবে। এখন ব্যাংক ২৫০ কোটি টাকার বিনিয়োগও করল। কিন্তু শেয়ারের দাম ১৫০ কোটি টাকা নেমে এলো। ক্রয়মূল্য ও বাজার মূল্যের পার্থক্য হলো ১০০ কোটি টাকা। এই ১০০ কোটি টাকাই ব্যাংকের লোকসান। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী এ ১০০ কোটি টাকার ওপর প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হবে। আর প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয় ব্যাংকের মুনাফা থেকে। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে ব্যাংকগুলোর এখন বাড়তি প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হচ্ছে। এতে কমে যাচ্ছে ব্যাংকগুলোর প্রকৃত মুনাফা।
অপর দিকে এক সময় ব্যাংকগুলো পুঁজি বাজারে বিনিয়োগ দেখাত মার্ক টু মার্কেট অর্থাৎ বাজারমূল্য ভিত্তিতে। অর্থাৎ ক্রয়মূল্য যাই হোক না কেন, তাদের বাজার মূল্যকেই দেখাতে হতো। এ কারণে এক সময় যে শেয়ারের ক্রয় মূল্য ছিল ১০০ টাকা, দাম বেড়ে যাওয়ায় তার বাজার মূল্য হলো ১২০ টাকা। এতে কোনো ব্যাংকের বিনিয়োগসীমা যদি থাকে ১০০ কোটি টাকা, ২০ শতাংশ দাম বেড়ে যাওয়ায় বিনিয়োগসীমা বেড়ে হয় ১২০ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেঁধে দেয়া সীমার মধ্যেই পুঁজি বাজারে বিনিয়োগ থাকতে হবে। অন্যথায় ব্যাংকগুলোর জরিমানা গুনতে হয়।
পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় অনেক ক্ষেত্রেই নিয়ম কানুনের তোয়াক্কা করা হতো না। নিজেদের সুবিধার জন্য নিয়ম-কানুন পরিবর্তন করা হতো। এ কারণে পতিত সরকারের শেষ সময়ে অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের সময়ে এ নীতিমালা কিছুটা পরিবর্তন করা হয়। তখন বলা হয়, ক্রয়মূল্যের ভিত্তিকেই শেয়ারের বিনিয়োগসীমা গ্রহণ করতে হবে। অর্থাৎ কোনো শেয়ারের ক্রয়মূল্য ১০০ টাকা হলে আর সেইক্ষেত্রে ২০ শতাংশ দাম বাড়লেও শেয়ার ধারণ ১২০ টাকা না হয়ে ১০০ টাকাই দেখানোর সুযোগ করে দেয়া হয়। এতে বিনিয়োগসীমার মধ্যে আনতে ব্যাংকগুলোর শেয়ার বিক্রি করতে হতো না।
ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের বিদায়ের পর পুঁজি বাজারে তদারকি বাড়ানো হয়েছে। এজন্য জুয়াড়িরা আর কৃত্রিমভাবে দর বাড়াতে পারছে না। এতে প্রতি নিয়তই পুঁজি বাজারের সূচক কমে যাচ্ছে। এভাবে ব্যাংকের কোনো কোনো শেয়ারের মূল্য ক্রয়মূল্য থেকে অর্ধেকে নেমে গেছে। এখানেই ব্যাংকগুলো পড়েছে বিপত্তিতে। যেমন ১০০ কোটি টাকা শেয়ারের দাম অর্ধেকে অর্থাৎ ৫০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। পরিবর্তিত নীতিমালা অনুযায়ী ব্যাংকগুলো শেয়ারের ধারণ ৫০ কোটি টাকা না দেখিয়ে ক্রয়মূল্য ১০০ কোটি টাকাই দেখাতে হচ্ছে। এতে ব্যাংকগুলোর পুঁজি বাজারে বিনিয়োগসীমার বাইরে আর বিনিয়োগ করতে পারছে না। যদি বাজারভিত্তিতে দেখানো যেত তাহলে ব্যাংকের শেয়ার ধারণ হতো ৫০ কোটি টাকা। বাড়তি ৫০ কোটি টাকা নতুন করে বিনিয়োগ করতে পারত। এতে শেয়ারের মূল্য গড় করার সুযোগ পেত। এভাবে এক সময় লোকসানের ধকল কাটিয়ে মুনাফা নিয়ে বের হতো পারত। কিন্তু ব্যাংকগুলো তা আর পারছে না। নতুন করে বিনিয়োগ করতে পারছে না। ফলে দীর্ঘ মেয়াদি লোকসানের বৃত্ত থেকে বের হতে পারছে না ব্যাংকগুলো। এভাবেই ব্যাংকগুলোর প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ আটকে পড়েছে। ব্যাংকগুলোর এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য নীতিসহায়তা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলেছেন এমনিতেই ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে। ব্যাংক থেকে ঋণের নামে টাকা বের করে এস আলম, বেক্সিমকো, নাসাসহ বেশির ভাগ ব্যাংক ডাকাত বিদেশে পাচার করে দিয়েছে। তারা আর ব্যাংকের অর্থ পরিশোধ করছেন না। এমনি পরিস্থিতিতে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ আটকে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো ত্রাহি ত্রাহি অবস্থার মুখে পড়েছে। ●
অকা/পুঁবা/ফর/রাত/২৩ জুন, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 8 months আগে

