অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে বড় ধরনের রূপান্তরের পথে এগোচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করার প্রাথমিক পরিকল্পনা থাকলেও তা সংশোধন করে এখন তিনটি ব্যাংককে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই তিন ব্যাংক হলো—ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংক।
এই উদ্যোগ ঘিরে ব্যাংক তিনটির প্রায় ১৪ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা ও চাকরি হারানোর আশঙ্কা। ব্যাংক একীভূত হলে একই ধরনের বহু পদে একাধিক কর্মকর্তা থাকার সম্ভাবনা থাকায় কর্মী ছাঁটাই অবশ্যম্ভাবী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে, একীভূতকরণ প্রক্রিয়া থেকে পিছিয়ে এসেছে বাকি দুই শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক—সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (এসআইবিএল) ও এক্সিম ব্যাংক। এ দুটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ একীভূতকরণের পরিবর্তে আর্থিক অবস্থার উন্নয়নে স্বতন্ত্রভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।
ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আলোচনায় থাকা ব্যাংকগুলোর বড় একটি অংশের শেয়ার মালিকানা চট্টগ্রামের একটি শিল্পগোষ্ঠীর হাতে। দীর্ঘদিন ধরে এসব ব্যাংক তারল্য সংকটে ভুগছে, খেলাপি ঋণের পরিমাণ অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে এবং ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বারবার রেগুলেটরি সাপোর্ট দিলেও কার্যকর পরিবর্তন আসেনি। ফলে এই মার্জার বা একীভূতকরণকেই স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে কর্মী সংকোচনের আশঙ্কা প্রবল। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে বর্তমানে কর্মরত প্রায় ৫ হাজার ৯৯৬ জন, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে প্রায় ২ হাজার ২০০ জন এবং ইউনিয়ন ব্যাংকে আছেন প্রায় ৫ হাজার ৮০৭ জন। সব মিলিয়ে জনবল প্রায় ১৪ হাজার। একীভূত ব্যাংকে এত বিপুল জনবল রাখা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন কর্মকর্তারা।
জানা গেছে, এই ব্যাংকগুলো নিয়মিত বেতন দিতে পারছে না। বেতন-বোনাস পেতে দেরি হচ্ছে, বিশেষ করে মাঠপর্যায়ের কর্মীরা পরিবার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা কাজ করছে সকল স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে।
তবে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান দাবি করেন, একীভূত ব্যাংক নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। তার ভাষায়, “কোনো কর্মকর্তা ছাঁটাইয়ের সুযোগ নেই। বরং প্রত্যেকটি উপজেলায় নতুন করে শাখা খোলা হবে। এটি সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকে পরিণত হবে এবং সোনালী ব্যাংকের পর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নেটওয়ার্ক হবে এই ব্যাংকের।”
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, এই তিন ব্যাংকের আর্থিক চিত্র খুবই দুর্বল। মার্চ ২০২৫ পর্যন্ত ইউনিয়ন ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা এবং ফার্স্ট সিকিউরিটির খেলাপি ঋণ ২২ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকা। গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার ৫৪ শতাংশেরও বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সদ্য প্রকাশিত অডিট প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক প্রকৃতপক্ষে ২ হাজার ২৫৯ কোটি টাকার লোকসানে রয়েছে, কিন্তু ব্যালান্স শিটে কারসাজির মাধ্যমে ১২৮ কোটি টাকার মুনাফা দেখানো হয়েছে।
ব্যাংকগুলোয় কর্মরত বিভিন্ন কর্মকর্তাদের অভিযোগ, তারা বেতন-বৃদ্ধি বা পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, গত দুই বছর ধরে তিনি পদোন্নতির জন্য অপেক্ষা করছেন, কিন্তু ব্যাংকের অব্যবস্থাপনার কারণে কিছুই হয়নি। এখন একীভূত হলে এই পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা করছেন।
ইউনিয়ন ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংক আশ্বস্ত করলেও মাঠপর্যায়ে কর্মীদের মধ্যে চাকরি হারানোর ভয় থেকেই যাচ্ছে। বিশেষ করে উচ্চ পর্যায়ের (এমডি, ডিএমডি) কর্মকর্তাদের সবাইকে নতুন ব্যাংকে রাখা সম্ভব হবে না।”
বিশ্লেষকদের মতে, একীভূতকরণ কাঠামোগত সমাধান হতে পারে ঠিকই, কিন্তু কার্যকর গভর্ন্যান্স ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা ছাড়া তা টিকবে না। তারা বলেন, “যদি পুরোনো ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিহীনতা বহাল থাকে, তাহলে শুধু নাম বদলালেই সংকট দূর হবে না। কর্মী ছাঁটাই নয়, দক্ষতা বৃদ্ধির দিকে নজর দিতে হবে।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, কর্মী রক্ষার জন্য জনবল পুনর্বিন্যাস পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। একীভূত ব্যাংকগুলো প্রাথমিকভাবে সরকারি ব্যাংকের মতো পরিচালিত হবে। এই সময়ে কর্মীদের চাকরি হারানোর সম্ভাবনা নেই।
তবে বাস্তবতা ভিন্ন। কর্মকর্তারা বলছেন, তাদের সঙ্গে এখন পর্যন্ত কোনো স্পষ্ট পরিকল্পনা বা প্রতিশ্রুতি শেয়ার করা হয়নি। বরং শাখা পর্যায়ে ছাঁটাই, বেতন বিলম্ব ও কর্মপরিবেশের অবনতির নানা খবরই তাদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
এদিকে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান নূরুল আমীন বলেন, ব্যাংকগুলোর আর্থিক সূচক খুব খারাপ। এ জন্যই কেন্দ্রীয় ব্যাংক একীভূতকরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এক্ষেত্রে একটি ফরেনসিক অডিটের মাধ্যমে আর্থিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। যদি ওই বিশ্লেষণে ব্যাংকগুলো সন্তোষজনক অবস্থানে থাকে, তবে হয়তো একীভূত না-ও হতে পারে। কিন্তু আর্থিক দুরবস্থা বহাল থাকলে একীভূত না হয়ে কোনো বিকল্প থাকবে না।
তবে তিনি আশাবাদী। তার মতে, “সব ব্যাংক যেহেতু শরিয়াহভিত্তিক, একীভূত হলে একটি বৃহৎ শরিয়াহভিত্তিক শক্তিশালী ব্যাংক গড়ে উঠতে পারে। কিন্তু এই ব্যাংক পরিচালনায় দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং আস্থার ঘাটতি মেটাতে হবে।”
সব মিলিয়ে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই পদক্ষেপ দেশের ব্যাংক খাতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে। তবে কেবল একীভূত করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য দরকার বলিষ্ঠ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা, মানবসম্পদ রক্ষার অঙ্গীকার এবং ব্যাংকিং নীতিমালার কঠোর প্রয়োগ। তা না হলে এ সংকট শুধু নাম বদলেই সীমাবদ্ধ থাকবে। ●
অকা/ব্যাংখা/ই/সকাল/১৪ জুলাই, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 8 months আগে

