অর্থকাগজ প্রতিবেদন
ঢাকার মতিঝিলের ব্রোকারেজ হাউসগুলোতে এখন প্রায় প্রতিদিনই একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। বড় পর্দাজুড়ে লাল সংকেত, ধারাবাহিকভাবে কমছে সূচক, বেশিরভাগ শেয়ারের দামও নিম্নমুখী। দিনের শুরুতে কিছুটা ইতিবাচক প্রবণতা থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিক্রির চাপ তীব্র হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত লোকসানের হতাশা নিয়েই বাড়ি ফিরছেন বিনিয়োগকারীরা।
ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী মিজানুর রহমান পাঁচ বছর আগে মুনাফার আশায় শেয়ার বাজারে প্রায় সাড়ে আট লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। দীর্ঘদিনের দরপতনে সেই বিনিয়োগের মূল্য এখন নেমে এসেছে প্রায় তিন লাখ টাকায়।
তার ভাষ্য, করোনার পর থেকেই বাজারে অস্থিরতা বেড়েছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর স্বল্প সময়ের জন্য কিছুটা উত্থান দেখা গেলেও তা স্থায়ী হয়নি। বর্তমানে টানা দরপতনে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, সংকটটি শুধু শেয়ার বাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সুদের হার বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট, ডলারের চাপ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সম্মিলিত প্রভাব পড়ছে দেশের পুঁজি বাজারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে বিনিয়োগকারীদের আস্থার ঘাটতি। বাজারে স্থায়ী ইতিবাচক প্রবণতার অভাবে সামান্য উত্থান দেখা দিলেই বড় বিনিয়োগকারীরা দ্রুত মুনাফা তুলে নিচ্ছেন। এতে বাজার আবারও নিম্নমুখী হয়ে পড়ছে।
তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে বড় ও ভালো মানের কোম্পানির আইপিও না আসাও বাজারের স্থবিরতার অন্যতম কারণ। প্রায় দুই বছর ধরে উল্লেখযোগ্য নতুন আইপিও না থাকায় নতুন বিনিয়োগকারীদের আগ্রহও কমে গেছে।
Midway Securities–এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আশিকুর রহমান বলেন, শেয়ার বাজার মূলত একটি পণ্যের বাজার। সেখানে মানসম্পন্ন কোম্পানি না এলে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি নিতে আগ্রহী হবেন না।
তার মতে, বর্তমানে অনেক ক্ষুদ্র মূলধনী ও দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়ছে মূলত জল্পনা-কল্পনার ভিত্তিতে। পরে বড় বিনিয়োগকারীরা মুনাফা তুলে নিলে বাজার আবার পড়ে যাচ্ছে।
এদিকে ব্যাংক আমানত ও ট্রেজারি বন্ডে উচ্চ সুদহারও শেয়ার বাজারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক বিনিয়োগকারী এখন ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ারের পরিবর্তে নিরাপদ আমানতের দিকে ঝুঁকছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংকঋণের সুদহার ১৪ থেকে ১৫ শতাংশে পৌঁছানোয় ব্যবসা সম্প্রসারণও কমে গেছে। নতুন শিল্প বিনিয়োগ কম হলে পুঁজি বাজারেও বড় ধরনের মূলধনের চাহিদা তৈরি হয় না।
অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি, তেলের দাম বৃদ্ধি এবং আমদানি ব্যয় বাড়ার প্রভাব দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে। ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও এখন সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও নীতিগত ধারাবাহিকতা দেখতে চান। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই আস্থা পুরোপুরি তৈরি হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজারে টেকসই গতি ফেরাতে হলে বড় ও মানসম্পন্ন কোম্পানিকে আইপিওতে আনতে হবে। পাশাপাশি সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা, সুদহার হ্রাস, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং শক্তিশালী করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করাও জরুরি।
তাদের মতে, শুধু সূচক বাড়ালেই হবে না; বিনিয়োগকারীদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি আস্থা ফিরিয়ে আনাই এখন বাংলাদেশের শেয়ার বাজারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সর্বশেষ হালনাগাদ 9 hours আগে

