অর্থকাগজ ডেস্ক>
বাংলাদেশের করব্যবস্থাকে আরও সহজ ও কার্যকর করতে একক ভ্যাট হার এবং একক করপোরেট করহার চালুর পরামর্শ দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। একই সঙ্গে সদ্য ঘোষিত জাতীয় বাজেটে সরকার যেসব কর অব্যাহতি ও কর ছাড় দিয়েছে, সেগুলোর কারণে রাজস্ব আয়ে কী ধরনের প্রভাব পড়বে, সে বিষয়েও বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে সংস্থাটি।
সোমবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও আইএমএফ প্রতিনিধিদলের বৈঠকে এসব বিষয় গুরুত্ব পায়। বৈঠকে এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিবসহ বাজেট ও রাজস্ব নীতির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বর্তমানে দেশে ১ দশমিক ৫, ৭ দশমিক ৫, ১০ ও ১৫ শতাংশ—এই চার ধরনের ভ্যাট হার কার্যকর রয়েছে। করপোরেট করও বিভিন্ন খাতে ১২ দশমিক ৫০, ২৭ দশমিক ৫০ ও ৪৫ শতাংশ হারে আরোপ করা হয়। আইএমএফের মতে, বহুমাত্রিক হার তুলে দিয়ে একটি অভিন্ন হার চালু করলে করব্যবস্থা সহজ হবে, স্বচ্ছতা বাড়বে এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমবে।
বৈঠকে বিদ্যমান কর অব্যাহতি ও বিভিন্ন খাতে দেওয়া কর-সুবিধা ভবিষ্যতেও বহাল থাকবে কি না, সে বিষয়েও জানতে চায় আইএমএফ। জবাবে এনবিআর কর্মকর্তারা জানান, নতুন রাজস্ব উৎস চিহ্নিত করা, কর ও শুল্ক-সংক্রান্ত মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি এবং কর ফাঁকি রোধে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারিসহ বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
এর আগে সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে আইএমএফের বাংলাদেশ ও হংকং মিশনপ্রধান ইভো ক্রজনারের নেতৃত্বাধীন ১১ সদস্যের প্রতিনিধিদল বৈঠক করে। বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী জানান, সম্ভাব্য নতুন ঋণ কর্মসূচির নীতিগত কাঠামো ও সংস্কার রোডম্যাপ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে।
তিনি বলেন, সরকার ও আইএমএফ একমত হয়েছে যে, কোনো ধরনের আকস্মিক বা কঠোর সংস্কার নয়; বরং দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে ধাপে ধাপে প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন করা হবে।
অর্থমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, একটি নির্বাচিত সরকারের জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা রয়েছে। তাই সাধারণ মানুষের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়—এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। আইএমএফও এই অবস্থানকে সম্মান জানিয়েছে।
বৈঠকে আর্থিক খাত, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, শেয়ারবাজার, রাজস্ব প্রশাসন, কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ভর্তুকি, ক্যাপাসিটি চার্জ এবং আর্থিক খাতের সুশাসন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সরকারের সাম্প্রতিক সংস্কার উদ্যোগে সন্তোষ প্রকাশ করেছে আইএমএফ বলেও জানান অর্থমন্ত্রী।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকারের প্রথম চার মাসেই আর্থিক খাতের সংস্কার, পুঁজিবাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং রাজস্ব আহরণে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে বলে আইএমএফ ইতিবাচক মূল্যায়ন করেছে। কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর সরকারি পরিকল্পনাও সংস্থাটি ইতিবাচকভাবে দেখছে।
নতুন ঋণ কর্মসূচি প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, আলোচনা সন্তোষজনক পর্যায়ে থাকলেও এখনই অনুমোদনের নির্দিষ্ট সময় বলা সম্ভব নয়। আইএমএফ প্রতিনিধিদল মূল্যায়ন শেষে তাদের সুপারিশ ওয়াশিংটনে সদর দপ্তরে পাঠাবে। এরপর আগামী ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর ব্যাংককে অনুষ্ঠিত আইএমএফ-विश्वব্যাংকের বার্ষিক সভার পর সংস্থাটির উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে এসে আনুষ্ঠানিক আলোচনা করবে।
সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে বাংলাদেশ ৪ থেকে সাড়ে ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের নতুন ঋণ কর্মসূচির আওতায় আসতে পারে।
অর্থমন্ত্রী আরও জানান, সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো (পে-স্কেল) নিয়ে বৈঠকে কোনো আলোচনা হয়নি। একইভাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ভর্তুকি সংস্কারের বিষয়টি আলোচনায় এলেও এ বিষয়ে এখনো কোনো নির্দিষ্ট শর্ত বা সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়নি।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালে বাংলাদেশ ও আইএমএফের মধ্যে ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচি অনুমোদিত হয়। পরে সেটির আকার বাড়িয়ে ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার করা হয়। এ পর্যন্ত বাংলাদেশ ৩ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার ঋণের কিস্তি পেয়েছে।
সর্বশেষ হালনাগাদ 11 hours আগে

