অর্থকাগজ প্রতিবেদন
সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আহরণে একটি ইতিবাচক দিক স্পষ্ট হয়েছে। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে না পারলেও আগের বছরের তুলনায় কর আদায়ে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে সংস্থাটি। অর্থবছরজুড়ে মোট রাজস্ব আদায় বেড়েছে ১১ শতাংশ, যা টাকার অঙ্কে ৪০ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা। ফলে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে চাপ থাকা সত্ত্বেও কর আহরণের ভিত্তি পুরোপুরি দুর্বল হয়ে পড়েনি—এমন একটি ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এনবিআর মোট ৪ লাখ ১০ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহ করেছে। আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই আদায়ের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৫২৮ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে রাজস্ব আদায়ে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা যোগ হওয়া নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক অর্জন। বিশেষ করে ব্যবসা-বাণিজ্যের ধীরগতি, আমদানি কমে যাওয়া, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং রাজনৈতিক ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মতো নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও এই প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।
তবে এই ইতিবাচক চিত্রের আড়ালে রয়েছে আরও বড় বাস্তবতা। রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি সরকারের ব্যয় বৃদ্ধি এবং উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়েনি। ফলে মোট আদায়ের অঙ্ক বাড়লেও তা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য যথেষ্ট হয়নি। সংশোধিত বাজেটে এনবিআরের জন্য নির্ধারিত ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রকৃত আদায় কম হয়েছে প্রায় ৯২ হাজার ৬১০ কোটি টাকা। অর্থাৎ রাজস্ব আদায় বাড়লেও প্রয়োজনীয় হারে বাড়েনি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ বাড়লেই সেটিকে সফলতা বলা যায় না। প্রকৃত মূল্যায়নের ক্ষেত্রে দেখতে হয়, অর্থনীতির আকার, সরকারের ব্যয়, কর-জিডিপি অনুপাত এবং বাজেট বাস্তবায়নের চাহিদার তুলনায় রাজস্ব কতটা বেড়েছে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের রাজস্ব প্রবৃদ্ধি এখনও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। কারণ অর্থনীতির সম্প্রসারণের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কর আদায়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি না পাওয়ায় প্রতি বছরই বড় অঙ্কের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজস্ব আহরণে এই সীমাবদ্ধতার পেছনে একাধিক কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। দেশে এখনও করজালের বাইরে বিপুলসংখ্যক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে। আয়করদাতার সংখ্যা অর্থনীতির আকারের তুলনায় খুবই কম। একই সঙ্গে কর ফাঁকি, ভ্যাট ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, মামলা জট, প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং কর ব্যবস্থার ডিজিটাল রূপান্তরের ধীরগতিও রাজস্ব আদায়ে বড় বাধা হয়ে আছে। অন্যদিকে আমদানি কমে যাওয়ায় শুল্ক ও আমদানি পর্যায়ের ভ্যাট থেকেও প্রত্যাশিত রাজস্ব আসেনি।
ব্যবসায়ীদের মতে, উচ্চ সুদহার, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট এবং শিল্প খাতের ধীরগতির প্রভাবও কর আদায়ের ওপর পড়েছে। যখন ব্যবসা সম্প্রসারণ ও নতুন বিনিয়োগ কমে যায়, তখন করযোগ্য আয়ও প্রত্যাশিত হারে বৃদ্ধি পায় না। ফলে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি থাকলেও তা সরকারের প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহের জন্য পর্যাপ্ত হয়ে ওঠে না।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, এই বড় ঘাটতির মধ্যেও নতুন অর্থবছরে এনবিআরের জন্য আরও উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সংস্থাটিকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহ করতে হবে। অর্থাৎ সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরের প্রকৃত আদায়ের তুলনায় প্রায় ১ লাখ ৯৪ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আহরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যমান কাঠামো ও নীতিতে বড় ধরনের সংস্কার ছাড়া শুধু লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে না। করজাল সম্প্রসারণ, স্বয়ংক্রিয় ও প্রযুক্তিনির্ভর কর প্রশাসন, কর ফাঁকি প্রতিরোধ, অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিকে কর ব্যবস্থার আওতায় আনা এবং ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমে রাজস্ব আহরণের ভিত্তি শক্তিশালী করতে হবে। অন্যথায় প্রতিবছর রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি থাকলেও লক্ষ্যমাত্রা থেকে বড় ব্যবধান তৈরি হবে, যা সরকারের উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, এনবিআরের রাজস্ব আদায়ে ১১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক সংকেত। কিন্তু এই প্রবৃদ্ধি দেশের ক্রমবর্ধমান রাজস্ব চাহিদা ও বাজেট বাস্তবায়নের প্রয়োজনের তুলনায় এখনও অনেক কম। ফলে রাজস্ব ব্যবস্থায় কাঠামোগত সংস্কার এবং কর আহরণের সক্ষমতা বৃদ্ধি এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
সর্বশেষ হালনাগাদ 17 hours আগে

