অর্থকাগজ প্রতিবেদন
প্রবাসী আয়ের বিপরীতে সরকার ঘোষিত নগদ প্রণোদনা পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতার কারণে দেশের ব্যাংক খাতে আর্থিক চাপ ক্রমেই বাড়ছে। বর্তমানে রেমিট্যান্সের বিপরীতে ২ দশমিক ৫ শতাংশ হারে নগদ প্রণোদনা প্রবাসীদের হাতে তুলে দিচ্ছে ব্যাংকগুলো, কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে সেই অর্থ ফেরত পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ফলে এ খাতে বকেয়ার পরিমাণ টানা নয় মাসেরও বেশি সময় ধরে ৫ হাজার কোটি টাকার ওপরে অবস্থান করছে।
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে রেমিট্যান্স প্রণোদনার বকেয়া ছিল প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে তা বেড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার সীমা অতিক্রম করেছে। এর মধ্যে ১০টি ব্যাংকের কাছেই সরকারের বকেয়া দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৭০১ কোটি টাকা। সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স গ্রহণকারী ব্যাংকগুলোর একটি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশে এককভাবে এ বকেয়ার পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা বলে জানা গেছে।
ব্যাংকারদের ভাষ্য, সরকার ঘোষিত এই প্রণোদনার অর্থ প্রাথমিকভাবে ব্যাংকগুলো নিজেদের তহবিল থেকেই পরিশোধ করে। পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে সরকার সেই অর্থ সমন্বয় করে দেয়। কিন্তু গত দেড় বছরে অর্থ ছাড়ে বিলম্ব অস্বাভাবিক মাত্রায় বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোকে দীর্ঘ সময় নিজেদের অর্থ আটকে রাখতে হচ্ছে।
এর ফলে ব্যাংকগুলোর তহবিল ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হচ্ছে। সাধারণত এ ধরনের অর্থ সরকারি সিকিউরিটিজ, বিশেষ করে ট্রেজারি বিলে বিনিয়োগ করে ব্যাংকগুলো উল্লেখযোগ্য আয় করতে পারে। বর্তমানে এক বছর মেয়াদি ট্রেজারি বিলে সুদের হার প্রায় ১০ দশমিক ২০ শতাংশ। সেই হিসাবে ৫ হাজার কোটি টাকা ট্রেজারি বিলে বিনিয়োগ করা হলে নয় মাসে প্রায় ৩৮৩ কোটি টাকা আয় করা সম্ভব হতো। কিন্তু প্রণোদনা বাবদ অর্থ আটকে থাকায় ব্যাংকগুলো সেই সম্ভাব্য আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
অন্যদিকে, প্রণোদনা প্রদানের জন্য ব্যবহৃত অর্থের বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে আমানতের সুদ ও অন্যান্য তহবিল ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। ব্যাংকারদের ধারণা, এ খাতে ব্যয়ের পরিমাণ ইতোমধ্যে প্রায় ৩০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ একদিকে সম্ভাব্য মুনাফা হারাতে হচ্ছে, অন্যদিকে তহবিলের ব্যয়ও বহন করতে হচ্ছে, যা সরাসরি ব্যাংকগুলোর মুনাফার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বেসরকারি খাতের কয়েকজন শীর্ষ ব্যাংকারের মতে, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে রেমিট্যান্স ব্যবসায় ব্যাংকগুলোর আগ্রহ কমে যেতে পারে। কারণ প্রবাসীদের কাছে দ্রুত প্রণোদনা পৌঁছে দিতে গিয়ে ব্যাংকগুলোকে নিজেদের তারল্য ব্যবহার করতে হচ্ছে, অথচ সেই অর্থ সময়মতো ফেরত পাওয়া যাচ্ছে না। এতে তারল্য ব্যবস্থাপনা জটিল হয়ে উঠছে এবং আমানত সংগ্রহের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, তার প্রতিষ্ঠানের কাছেই সরকারের বকেয়া প্রায় ৭০০ কোটি টাকা। এই অর্থ সময়মতো ফেরত পাওয়া গেলে তা বিনিয়োগের মাধ্যমে অতিরিক্ত আয় করা সম্ভব হতো। কিন্তু দীর্ঘ বিলম্বের কারণে সেই সুযোগ হারাতে হচ্ছে এবং এর প্রভাব বার্ষিক মুনাফার হিসাবেও পড়বে।
ব্যাংক খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকারের প্রণোদনা দায়ও বেড়েছে। একই সময়ে রাজস্ব আহরণ প্রত্যাশার তুলনায় কম হওয়ায় সরকারের নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হয়েছে। আগামী অর্থবছরে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনাও সরকারি আর্থিক চাহিদার উচ্চমাত্রাকে নির্দেশ করে।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ব্যাংকার্স সভায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়। সেখানে বিভিন্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান চলতি অর্থবছরের মধ্যেই বকেয়া প্রণোদনার অর্থ পরিশোধের বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, রেমিট্যান্স প্রণোদনার অর্থ সরকারের ভর্তুকি কর্মসূচির অংশ। তাই অর্থ ছাড়ে বিলম্ব হলেও শেষ পর্যন্ত তা পরিশোধ হবে। তবে ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, অর্থ পরিশোধের নিশ্চয়তার পাশাপাশি সময়মতো অর্থ ছাড় নিশ্চিত করাও এখন জরুরি হয়ে উঠেছে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে বিপুল অঙ্কের অর্থ আটকে থাকায় ব্যাংকগুলোর মুনাফা, তারল্য এবং তহবিল ব্যবস্থাপনা—সব ক্ষেত্রেই চাপ বাড়ছে।
সর্বশেষ হালনাগাদ 5 hours আগে

