মারুফা ইয়াসমিন ●
প্রযুক্তির বিশ্ব। সে জন্য যাপন এখন অনেক সহজ ও গতিশীল। ইন্টারনেট মানুষের সামনে সম্ভাবনার এক বিশাল আকাশ খুলে দিয়েছে। নারীদের পড়াশোনা, চাকরি কিংবা নিজের একটা পরিচয় তৈরির ক্ষেত্রে ডিজিটাল মাধ্যম এখন দারুণ এক হাতিয়ার। যে ইন্টারনেট নারীকে ডানা মেলার সুযোগ দিচ্ছে সেই ভার্চুয়াল জগতটাই অনেকের জন্য হয়ে উঠছে চরম আশংকার! ডিজিটাল মাধ্যমে নারীদের ফাঁদে ফেলার কর্মকাণ্ড রয়েছে অব্যাহত। বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘প্রযুক্তি-সহায়তাপ্রাপ্ত লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা।’ ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামে স্ক্রল করতে গিয়ে পদে পদে নারীদের মুখোমুখি হতে হচ্ছে ট্রলিং, অশ্রাব্য মন্তব্য বা সাইবার স্টকিংয়ের। কারও ব্যক্তিগত তথ্য ইন্টারনেটে ছেড়ে দেওয়া (ডক্সিং), ফেক আইডি খুলে হয়রানি, কিংবা ডিপফেক প্রযুক্তির সাহায্যে ছবি বিকৃত করে অসামজিক ও ইতর এক শ্রেণির কাজ। সে প্রক্রিয়ায় ব্ল্যাকমেইল করার ঘটনা নিয়মিতই ঘটছে। সাইবার এ হেনস্তা শুধু স্ক্রিনের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়, একজন মানুষের বাস্তব জীবন, তার মানসিক শান্তি আর সামাজিক সম্মানকে এক নিমেষে তছনছ করে দিচ্ছে। নারীর এই নিরাপত্তাহীনতা আসলেই গোটা সমাজের জন্য লজ্জাজনক।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এবং জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ)-এর একটি সাম্প্রতিক যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৮৯ শতাংশ নারী জীবনের কোনো না কোনো সময়ে অনলাইন সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছেন। বিস্ময়ের বিষয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারী প্রতি ১০ জনের মধ্যে প্রায় ৯ জন নারীই এই যন্ত্রণার মধ্য আছেন! সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ১৮ থেকে ৩০ বছরের তরুণীরাই এর মূল শিকার। এছাড়া, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এর তথ্য বলছে, গত বছর আপত্তিকর কনটেন্ট সরানোর জন্য যত আবেদন জমা পড়েছে, তার ৯০ শতাংশই এসেছে নারীদের কাছ থেকে। আবার পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন এর ডাটা অনুযায়ী, ভুক্তভোগীদের ৪১ শতাংশ ডক্সিং, ১৮ শতাংশ আইডি হ্যাকিং এবং ১৭ শতাংশ সরাসরি ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকার হন। একটা স্ক্রিনশট বা একটা বিকৃত ছবি দিয়ে বছরের পর বছর ধরে কষ্ট করে অর্জন করা সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে। প্রযুক্তি যেন এখানে নারীদের হেনস্তা করার একটা নতুন অস্ত্র।
সংকটটির পেছনের আসল কারণ- আমাদের সামাজিক ও মানসিক গঠনে। দুঃখজনক যে, আমরা এখনো সাইবার অপরাধকে ‘ভার্চুয়াল’ বা হালকা একটা বিষয় মনে করি। ফোনের ওপাশে বসে কাউকে গালি দেওয়া, চরিত্র নিয়ে কথা বলা বা ছবি এডিট করাকে অনেকেই সস্তা বিনোদন ভাবেন। নোংরা এ মানসিকতা আসে পারিবারিক শিক্ষার অভাব আর কঠোর শাস্তির উদাহরণ না থাকা থেকে। এর চেয়েও বড় ট্র্যাজেডি হলো, কোনো নারী যখন এই হয়রানির শিকার হন, সমাজ তখন অপরাধীকে ছেড়ে উল্টো ওই নারীর বিপক্ষে াবস্থান নেয়। শাসানো আঙুলে প্রশ্ন-‘কেন ছবি দিলে?’, কেন এত রাতে অনলাইনে থাকলে? ইত্যাদি প্রশ্নে ভুক্তভোগীকে আরও কোণঠাসা করা হয়। লোকলজ্জা আর পরিবারের চাপের কারণে প্রায় ৭৫ শতাংশ নারী কোনো আইনি পদক্ষেপই নেন না। ফলে অপরাধীরা পার পেয়ে আরও আগ্রাসী হয়ে ওঠে। আমাদের থানা-পুলিশ বা সাইবার ইউনিটের সংবেদনশীলতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। অনেক সময় অভিযোগ জানাতে গিয়ে ভুক্তভোগীকে এমন সব অদ্ভূত আর কুরুচিপূর্ণ প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়, যা তাকে দ্বিতীয়বার মানসিক যন্ত্রণায় ফেলে। দীর্ঘসূত্রতা আর অপেশাদার আচরণ পুরো আইনি প্রক্রিয়াকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে!
অনলাইন সহিংসতার এই নেতিবাচক প্রভাব একজন নারীর জীবনে মারাত্মক বিপর্যয় নিয়ে আসে। এই ট্রমা বা মানসিক ক্ষত সহজে শুকায় না। অনেক সম্ভাবনাময় তরুণী পড়াশোনা ছেড়ে দেন। গুটিয়ে নেন অবসাদে ভুগে নিজেকে সমাজ থেকে। এর শেষ পরিণতি অনেক সময় আত্মহত্যার মতো ঘটনাতেও গড়ায়। শুধু তাই নয়, এর বড় একটা অর্থনৈতিক ক্ষতিও আছে। আজকাল অনেক নারী ফেসবুক বা এফ-কমার্সের মাধ্যমে নিজেদের ছোটখাটো ব্যবসা চালাচ্ছেন, স্বাবলম্বী হচ্ছেন। যখন তাদের পেইজ হ্যাক হয় বা তাদের নিয়ে ট্রলিং করা হয়, তখন তাদের আয়ের পথটা বন্ধ হয়ে যায়। নারীদের এভাবে ঘরের কোণে বন্দি করার সাইবার অপচেষ্টা দেশের অর্থনীতির জন্যও একটা বড় ধাক্কা।
সাইবার অপরাধ থেকে নারীর মুক্তি পেতে হলে সাইবার ট্রাইব্যুনালগুলোকে অধিক গতিশীল করতে হবে। তাতে করে অপরাধীদের মনে ভয়ের সৃষ্টি হবে। দ্বিতীয়ত, ভুক্তভোগী নারীদের জন্য প্রতিটি জেলায় নারী পুলিশ ও আইটি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটা ওয়ানস্টপ সাপোর্ট সেন্টার করা দরকার, যেখানে পরিচয় গোপন রেখে সহজে অভিযোগ করা যাবে। ভুয়া আইডি বন্ধ করতে সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট খোলার সময় জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) বা পাসপোর্ট ভেরিফিকেশনের নিয়ম করা যেতে পারে। তৃতীয়ত, বিটিআরসিকে ফেসবুক, টিকটক বা ইউটিউবের মতো বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে সুসমন্বয় করতে হবে, যাতে অভিযোগ পাওয়ার ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আপত্তিকর কনটেন্ট স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুছে ফেলা যায়। আর সবশেষে, একেবারে স্কুল-কলেজ থেকে আমাদের সন্তানদের শেখাতে হবে যে, ইন্টারনেটে কারও সম্মতি ছাড়া তার ছবি বা তথ্য ব্যবহার করা একটি বড় অপরাধ।
সাইবার নিরাপত্তা মানে শুধু পাসওয়ার্ড বা কোডিং নয়; এটা একটা মানুষের শান্তিতে বেঁচে থাকার অধিকার। ২০২৬ সালের এই আধুনিক সময়ে এসেও যদি আমাদের বোন বা কন্যা সন্তানকে ইন্টারনেটে ঢুকতে গিয়ে ভয়ে কাঁপতে হয়, তবে এই ডিজিটাল উন্নয়নের কোনো মূল্যই থাকে না। এই লড়াইয়ে সরকার, পুলিশ, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং পরিবার সবাইকে এক সঙ্গে নামতে হবে। ইন্টারনেট হোক নারীর ডানা মেলার একটা মুক্ত আকাশ। সুস্থ মূল্যবোধ এবং কঠোর নজরদারির মাধ্যমেই সুরক্ষিত হোক প্রতিটি নারীর ভার্চুয়াল পথচলা। ●
মতামত লেখকের নিজস্ব
লেখক কলাম লেখক ও বেসরকারি একটি কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা
antmail00111@gmail.com
সর্বশেষ হালনাগাদ 2 hours আগে

