অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
পুঁজি বাাজারে এক ধরনের রক্তক্ষরণ চলছে। প্রতিদিনই কমছে সূচক। ২৮ মে নিয়ে টানা ছয় দিন এ প্রবণতা অব্যাহত ছিল। এর মধ্যে প্রতিদিনই পতনের মাত্রা বাড়ছে। শুধু গত দুই দিনেই ঢাকা শেয়ার বাজারের প্রধান সূচকটির ১০৩ পয়েন্টের বেশি অবনতি ঘটেছে। আর চট্টগ্রাম শেয়ার বাজারের প্রধান সূচকের অবনতি ঘটে প্রায় ২০০ পয়েন্ট। কতদিন এ পতন চলবে বা সূচকের অবস্থান কোথায় নামতে পারে তা সংশ্লিষ্টদের কেউ বলতে পারছেন না।
পুঁজি বাজারের টানা এ পতন এক দিকে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারিদের পথে বসিয়েছে অন্য দিকে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারিরা সক্ষমতা হারিয়ে দিনদিন এমনপর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে যেখানে এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত জনশক্তির একটি বড় অংশই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানের আয়ের ওপরই নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতনভাতা।
বাজার পরিস্থিতি নিয়ে দেশের দুই পুঁজি বাজারের সাথে সম্পর্কিত একটি শীর্ষপর্যায়ের মাচেন্ট ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীর কাছে বাজার পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। কেউ বলতে পারছে না সূচক কোথায় নামতে পারে। তিনি নিজের প্রতিষ্ঠানের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরে বলেন, আমরা একটি ভালো ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি হিসেবে মার্কেটে আছি। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমাদের সক্ষমতা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। যেখানে প্রতিনিয়তই লোকসান গুনতে হচ্ছে সেখানে আমাদের লোকবল নিয়ে টিকে থাকা অনেকটাই অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাধারণ যে ব্রোকার বা ছোটখাটো যে মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো কতদিন টিকতে পারবে তা কেউ বলতে পারে না।
এ সঙ্কটের সমাধান কি; এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, সমাধান সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা তথা নীতি নির্ধারকদের হাতে। কেউ বলতে পারছে না কি করলে বাজার টেকসই আচরণ করবে। তবে সামনের বাজেটে যদি সরকার সত্যিকার কিছু প্রণোদনা দেন তাতে সাময়িক কিছু কাজ হতে পারে।
গত বছরের ৫ আগস্ট পরবর্তী পুঁজি বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেয়ার পর সপ্তাহ দুয়েক পুঁজি বাজারে কিছুটা গতি ছিল। ৬ আগস্ট ডিএসইর প্রধান সূচকটির অবস্থান ছিল ৫ হাজার ৪২৬ দশমিক ৪২ পয়েন্টে। সেখান থেকে ১১ আগস্ট সূচকটি পৌঁছে যায় ৬ হাজার ১৫ দশমিক ৯০ পয়েন্টে। অর্থাৎ মাত্র চারটি কর্মদিবসে ডিএসই সূচকের উন্নতি ঘটে প্রায় ৬০০ পয়েন্টে। এর পর আর সামনের দিকে এগোতে পারেনি সূচকটি। মাত্র ৯ মাসের ব্যবধানে সূচকটি গতকাল নেমে আসে ৪ হাজার ৬১৫ দশমিক ৪০ পয়েন্টে। সে হিসাবে উল্লিখিত সময়ে ডিএসই সূচক হারায় ১ হাজার ৪০০ দশমিক ৫০ পয়েন্ট।
এ দিকে পুঁজি বাজারের বিনিয়োগকারীদের বেনিফিসিয়ারি ওনার্স অ্যাকাউন্টের (বিও অ্যাকাউন্ট) নবায়ন তথা মেইনটেন্যান্স ফি কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। ২৭ মে অনুষ্ঠিত বিএসইসির ৯৫৬তম কমিশন সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে। বিও অ্যাকাউন্ট মেইটেন্যান্স ফি ৪৫০ টাকা থেকে কমিয়ে ১৫০ টাকা করা হয়েছে। প্রতি বছর বিও অ্যাকাউন্ট মেইনটেন্যান্সের ফি ব্রোকারহাউজের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হয়।
বর্তমান মন্দা বাজারের বাস্তবতায় নতুন বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার ল্েয ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডিবিএ) সহ বিভিন্ন সংগঠনের প থেকে বিও একাউন্ট মেইনটেইন্যান্স সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করার দাবি জানিয়ে আসছিল। এই দাবির প্রেেিত নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি বিও একাউন্ট মেইনটেইন্যান্স ফি কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এছাড়া কমিশনের বৈঠকে ব্রোকারহাউজের সমন্বিত গ্রাহক হিসাব (সিসিএ) হতে অর্জিত সুদ আয় ব্যবহার সংক্রান্ত বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত অনুসারে, ব্রোকারহাউজগুলো অর্জিত সুদ আয়ের অর্থের ২৫ শতাংশ স্টক এক্সচেঞ্জের ইনভেস্টরস প্রটেকশন ফান্ডে জমা দিয়ে বাকি অর্থ তারা ব্যবহার করতে পারবে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান ষূচক ডিএসইএক্সের ২৮ মে ৬২ দশমিক ৭২ পয়েন্ট অবনতি ঘটে। ৪ হাজার ৬৭৮ দশমিক ১৩ পয়েন্ট থেকে দিন শুরু করা সূচকটি ২৮ মে দিনশেষে নেমে আসে ৪ হাজার ৬১৫ দশমিক ৪০ পয়েন্টে। এ সময় ডিএসইর অন্য দু’টি সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ হারায় যথাক্রমে ১৫ দশমিক ৮১ ও ১৬ দশমিক ২৯ পয়েন্ট। দেশের দ্বিতীয় পুঁজি বাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ২৮ মে হারায় ১৩৮ দশমিক ৭৫ পয়েন্ট। সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স এ সময় যথাক্রমে ১২৭ দশমিক ৫০ ও ৯০ দশমিক ৫৪ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়।
এ দিকে পুঁজি বাজারে তালিকাভুক্ত যেসব কোম্পানি ঘোষিত লভ্যাংশ বিতরণে ব্যর্থ হয়েছে এমন ২২টি কোম্পানির সাথে বৈঠক করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। ২৮ মে বিএসইসি হতে প্রেরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
জানা গেছে, বৈঠকে বিএসইসির কর্মকর্তাবৃন্দ এবং উক্ত কোম্পানিগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। সভায় ঘোষিত লভ্যাংশ বিতরণে ব্যর্থতার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে এবং যত দ্রুত সম্ভব বিষয়টি সমাধানের জন্য কোম্পানিগুলোকে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। ব্যর্থতার জন্য কোম্পানিগুলোর বিরূদ্ধে সিকিউরিটিজ আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়াও শুরু করতে যাচ্ছে বিএসইসি।
এ ছাড়া পুঁজি বাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিসমূহে স্পন্সর-ডিরেক্টরদের যৌথভাবে ৩০ শতাংশ শেয়ার হোল্ডিং রাখার বিধান থাকলেও কিছু কোম্পানিতে তার ব্যত্যয় দেখতে পেয়েছে বিএসইসি। বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, এ বিষয়ে ৪৪টি কোম্পানিকে উক্ত বিধান নিশ্চিত করার জন্য নির্দেশনা দিয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে। ব্যর্থতার জন্য কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে সিকিউরিটিজ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। ●
অকা/পুঁবা/ফর/রাত/২৮ মে, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 9 months আগে
