অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেশের ব্যাংক খাতের উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে দেশের ২৪টি ব্যাংক মারাত্মক মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে, যা দেশের আর্থিক খাতকে এক গভীর বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। গত মার্চে এই সংখ্যা ছিল ২৩টি, অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে গেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দীর্ঘদিনের অনিয়ম, ঋণ জালিয়াতি ও রাজনৈতিক প্রভাবাধীন ঋণ বণ্টনের ফলে ব্যাংকগুলো এখন তারল্য ও মূলধন সংকটে পড়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চলমান লুটপাট ও শিথিল নজরদারি এই সংকটকে তীব্র করেছে বলে প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়।
২৪টি ব্যাংকের সম্মিলিত মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা। মার্চ শেষে এই ঘাটতি ছিল ১ লাখ ১০ হাজার ২৬০ কোটি টাকা, অর্থাৎ তিন মাসে ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ৪৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। নতুন করে এনআরবিসি ব্যাংক ও আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক ঘাটতিতে পড়েছে, যদিও বিদেশি খাতের হাবিব ব্যাংক ঘাটতি থেকে বেরিয়ে এসেছে।
এনআরবিসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান আলী হোসেন প্রধানিয়া বলেন, “গত বছরের ডিসেম্বরেও আমাদের খেলাপি ঋণ ছিল ৫ শতাংশ, এখন তা বেড়ে সাড়ে ২৮ শতাংশে পৌঁছেছে। ফলে বড় অঙ্কের প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হচ্ছে, যা মূলধন ঘাটতির কারণ।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, পূর্ববর্তী সরকারের সময় বিপুল অঙ্কের ঋণ জালিয়াতি হয়েছিল, যার অনেকগুলো তখন খেলাপি দেখানো হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই “লুকানো খেলাপি ঋণ” সামনে এসেছে। ফলে এখন ব্যাংকগুলোর প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৭ লাখ কোটি টাকারও বেশি, যা ব্যাংকগুলোকে বিপুল প্রভিশন রাখতে বাধ্য করছে। কিন্তু পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে না পারায় ব্যাংকগুলো মূলধন হারাচ্ছে, আর এতে দেশের পুরো আর্থিক ব্যবস্থাই ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, জুন শেষে ব্যাংক খাতে মূলধন ঝুঁকিজনিত সম্পদের অনুপাত (সিআরএআর) কমে দাঁড়িয়েছে ৪.৪৭ শতাংশে, যেখানে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ন্যূনতম হার হওয়া উচিত ১০ শতাংশ। মার্চ শেষে এই হার ছিল ৬.৭৪ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকগুলোর মূলধন ভিত্তি দ্রুত দুর্বল হচ্ছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি জনতা ব্যাংকে, যার মূলধন ঘাটতি ১৭,০২৫ কোটি টাকা। এরপর রয়েছে অগ্রণী ব্যাংক (৭,৬৯৮ কোটি), রূপালী ব্যাংক (৪,১৭৩ কোটি) এবং দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত বেসিক ব্যাংক (৩,৭৮৩ কোটি)। বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান হেলাল আহমেদ চৌধুরী বলেন, “একসময় ব্যাংকটি খুব ভালো অবস্থায় ছিল, মাঝখানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। এখন পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চলছে।”
বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় ঘাটতিতে আছে ন্যাশনাল ব্যাংক, যার ঘাটতির অঙ্ক ৮,৪৫৯ কোটি টাকা। এরপর রয়েছে এবি ব্যাংক (৬,৭৭৫ কোটি), পদ্মা ব্যাংক (৫,৬১৯ কোটি), আইএফআইসি ব্যাংক (৪,০৫১ কোটি), বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক (১,৮৭৮ কোটি), প্রিমিয়ার ব্যাংক (১,৬৪০ কোটি), ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (১,৩৮৫ কোটি), এনআরবিসি ব্যাংক (৩১৬ কোটি), সিটিজেন ব্যাংক (৮৬ কোটি) এবং সীমান্ত ব্যাংক (৪৫ কোটি)।
ইসলামি বা শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি ইউনিয়ন ব্যাংকে, যার ঘাটতি ২১,৩৮৭ কোটি টাকা। এরপর ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ (১৮,৫০৪ কোটি), ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক (১০,৫০১ কোটি), গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক (৫,৫৫২ কোটি), সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (২,০৭৯ কোটি), আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক (১,৯৭৫ কোটি), এক্সিম ব্যাংক (৯০১ কোটি) এবং আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক (২৫৪ কোটি) ঘাটতিতে রয়েছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থায় আছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, যার মূলধন ঘাটতি ২৯,১৬১ কোটি টাকা—যা শুধু বিশেষায়িত ব্যাংকের নয়, বরং দেশের পুরো ব্যাংক খাতের সর্বোচ্চ। রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ঘাটতিও কম নয়, দাঁড়িয়েছে ২,৬২০ কোটি টাকায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই প্রতিবেদন স্পষ্ট করছে যে, দেশের ব্যাংক খাত এখন এক গভীর কাঠামোগত দুর্বলতার মধ্যে আছে। অতীতের রাজনৈতিক প্রভাব, ঋণ জালিয়াতি, দুর্বল তদারকি এবং গোপন খেলাপি ঋণ এখন বাস্তব ঘাটতিতে রূপ নিয়েছে। যদি শিগগিরই পুঁজি পুনর্গঠন, দায়বদ্ধতা বাড়ানো ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে এ সংকট পুরো আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতাকে গভীরভাবে নাড়া দিতে পারে। ●
অকা/ব্যাংখা/ই/সকাল/১১ নভেম্বর, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 1 month আগে

