অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
দেশের পুঁজি বাজারের পতন থামছেই না। মাসের পর মাস পতন চলছেই। এভাবে বিনিয়োগকৃত মূলধনের প্রায় সবটুকু হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন ৮০ শতাংশের বেশি বিনিয়োগকারী। অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছলতার স্বপ্ন নিয়ে পুঁজি বাজারে বিনিয়োগ করে এখন কপাল পুড়ছে তাদের। সর্বস্ব হারিয়ে পথে বসেছেন সবাই। দিনের পর দিন পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটছে।
এ দিকে বিনিয়োগকারীদের এ কষ্ট নিরসনের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই সরকারের নীতিনির্ধারকদের। অর্থ মন্ত্রণালয় ও পুঁজি বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাসহ সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নানা দৌড়ঝাঁপ চোখে পড়লেও এর কোনোটাই বাজার পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটাতে পারছে না। সর্বশেষ গত ১১ মে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টাও সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বৈঠক করে সঙ্কট উত্তরণে পাঁচটি নির্দেশিকা প্রদান করেন। কিন্তু বাজার পরিস্থিতি রয়েছে আগের মতোই।
আবার বিগত সরকারের সময়ে সংঘটিত আর্থিক খাতের বিশৃঙ্খলার অজুহাতকে বারবার সামনে নিয়ে আসা হলেও তা উপশমের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই। ফলে প্রতিদিনই বাজারে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। অংশীজনদের একটি অংশ সার্বিক পরিস্থিতির জন্য এককভাবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার দিকে এর দায়ভার চাপাতে চাইলেও বাস্তব অবস্থা ভিন্ন। কারণ নতুন কমিশন গঠনের পর ৯ মাসে পুঁজি বাজারে এমন কোনো নতুন কোন আইন বা বিধান সংযোজিত হয়নি যার ফলে বাজার পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে।
বাজার পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের একজন সাবেক পরিচালক বলেন, পুঁজি বাজারের এ মুহূর্তে মূল সমস্যা নেগেটিভ ইকুইটি। মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্র্রোকারেজ হাউজগুলো এখন আর এ বোঝা টানতে চাচ্ছে না। ফলে প্রতিদিনই বিক্রয়চাপ তৈরি হচ্ছে বাজারে। আর এভাবে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে বারবার অংশীজনদের সাথে এ নিয়ে বৈঠক করা হলেও বাজারে তার প্রয়োগ নেই। তা ছাড়া বাজারে তারল্য সঙ্কট দিন দিন বাড়ছে। নতুন বিনিয়োগ আসছে না। অন্য দিকে সরকারি বন্ড ও সঞ্চয়পত্রগুলোতে সূদের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় সক্ষম বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ বাজার থেকে বিনিয়োগ তুলে নিচ্ছেন।
স্টেক হোল্ডারদের একটি অংশ গোটা বিষয়টির জন্য বিএসইসিকে দায়ি করে যাচ্ছেন যার ফলে বাজারে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে, এ কমিশন থাকলে বাজার পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। তিনি মনে করেন, দীর্ঘদিন ধরে পুঁজি বাজার একটি মহলের হাতে জিম্মি ছিল। এখনো কোনো না কোনোভাবে মহলটি সক্রিয়। এর ফলে বাজার পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব হচ্ছে না।
দেশের প্রধান পুঁজি বাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৩৮ দশািমক ৯৭ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। সকালে ৪ হাজার ৮৭৪ দশমিক ৫৮ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি মঙ্গলবার দিনশেষে ৪ হাজার ৮৩৫ দশমিক ৬০ পয়েন্টে স্থির হয়। একই সময় ডিএসইর অপর দুই সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ হারায় যথাক্রমে ৭ দশমিক ৬০ ও ১০ দশমিক ৩৫ পয়েন্ট। অনুরূপভাবে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সবগুলো সূচকেরও পতন ঘটে। এখানে সিএসই সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ৭১ দশমিক ৬৪ পয়েন্ট হ্রাস পায়। সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি ঘটে যথাক্রমে ২২ দশমিক ১৪ ও ৩৮ দশমিক ৮০ পয়েন্ট।
ডিএসইতে সপ্তাহের তৃতীয় কার্যদিবস বুধবার লেনদেনে অংশ নেয়া কোম্পানিগুলোর মাঝে লেনদেনের শীর্ষে উঠে এসেছে বিচ হ্যাচারি লিমিটেড। ডিএসই সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।
১৪ মে ১৫ কোটি ৭৪ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ৩১ লাখ ৩৫ হাজার শেয়ার হাতবদল হয়েছে। লেনদেনের শীর্ষ তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা এনআরবি ব্যাংক লেনদেন হয়েছে ১১ কোটি ৯৩ লাখ টাকায় মোট ৯৫ লাখ ৩৪ হাজার শেয়ার। ১০ কোটি ৯১ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন নিয়ে শীর্ষ তালিকার তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছে মাগুরা মাল্টিপ্লেক্স। লেনদেনের শীর্ষ তালিকায় থাকা অন্যান্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে- ব্র্যাক ব্যাংক, বারাকা পতেঙ্গা পাওয়ার, এবি ব্যাংক ফার্স্ট মিউচ্যুয়াল ফান্ড, সিটি ব্যাংক, ফাইন ফুডস, ওয়াইম্যাক্স এবং বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন।
অপর দিকে চট্টগ্রাম শেয়ার বাজারে লেনদেনের শীর্ষ কোম্পানির তালিকায় ছিল যথাক্রমে ক্রাউন সিমেন্ট, খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ, লাভেলো আইসক্রিম, এনআরবি ব্যাংক, ইন্ট্রাকো সিএনজি রি-ফুয়েলিং স্টেশন, এসইএম লেকচার ইকুইটি ফান্ড, রবি অজিয়াটা, ওয়ালটন হাইটেক ইঞ্জিনিয়ারিং, এবি ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড ও আইএফআইসি ব্যাংক।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেনে অংশ নেয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে দর বৃদ্ধির শীর্ষে উঠে এসেছে বীমা খাতের কোম্পানি সিটি জেনারেল ইন্স্যুরেন্স। এ দিন কোম্পানিটির শেয়ারদর বেড়েছে ৩ টাকা ৩০ পয়সা বা ৯ দশমিক ৯০ শতাংশ। দর বৃদ্ধির দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ফার্স্ট বাংলাদেশ ফিক্সড ইনকাম ফান্ড। ফান্ডটির ইউনিট দর ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ বেড়েছে। আর তৃতীয় স্থানে থাকা মাগুরা মাল্টিপ্লেক্সের দর বেড়েছে ৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ। এদিন দর বৃদ্ধির শীর্ষে উঠে আসা অপর কোম্পানিগুলো ছিল- ওয়াইম্যাক্স ইলেক্ট্রোডস, বারাকা পতেঙ্গা পাওয়ার লিমিটেড, ফাইন ফুডস, ইস্টার্ণ ইন্স্যুরেন্স, বাংলাদেশ মনোস্পুল পেপার, বারাকা পাওয়ার এবং রহিম টেক্সটাইলস।
এ ছাড়া লেনদেনে অংশ নেয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে দর পতনের শীর্ষে ওঠে এসেছে ব্যাংকিং খাতের কোম্পানি এনআরবি ব্যাংক। এদিন কোম্পানিটির শেয়ারদর আগের দিনের তুলনায় কমেছে ৯০ পয়সা বা ০৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ। এতে দর পতনের শীর্ষে উঠেছে কোম্পানিটি। এ তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা তিতাস গ্যাসের শেয়ার দর কমেছে আগের দিনের তুলনায় ৬ দশমিক ২৫ শতাংশ। আর ৬ দশমিক ১৮ শতাংশ দর কমে যাওয়ায় পতনের শীর্ষ তালিকার তৃতীয় স্থানে জায়গা নিয়েছে বিডি ওয়েল্ডিং। দর পতনের শীর্ষ তালিকায় থাকা অন্যান্য কোম্পানিগুলো ছিল এনআরবিসি ব্যাংক, সোনারগাঁও টেক্সটাইলস, শাইনপুকুর সিরামিকস, খুলনা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেড, অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, রিজেন্ট টেক্সটাইলস এবং গোল্ডেন হার্ভেস্ট।
অকা/পুঁবা/ফর/বিকাল/১৫ মে, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 10 months আগে
