অর্থকাগজ প্রতিবেদন
একসময় দেশের শিল্পায়নের অন্যতম সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে বিবেচিত কাগজ শিল্প এখন বহুমুখী সংকটের মুখোমুখি। উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও স্বল্পমূল্য দেখিয়ে প্রস্তুত কাগজ আমদানি, আন্ডার-ইনভয়েসিং, রাজস্ব ফাঁকি এবং অসম প্রতিযোগিতার কারণে একের পর এক কাগজকল উৎপাদন কমাতে বা বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের দাবি, দ্রুত কার্যকর নীতি গ্রহণ না করা হলে কয়েক দশকের বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।
বাংলাদেশ পেপার মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএমএ) বলছে, প্রকৃত মূল্যের তুলনায় অনেক কম মূল্য দেখিয়ে প্রস্তুত কাগজ আমদানির প্রবণতা এখন দেশীয় শিল্পের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে। এর ফলে একদিকে সরকার বিপুল পরিমাণ শুল্ক ও কর রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয় বেশি হওয়ায় দেশীয় কারখানাগুলো বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছে না।
শিল্প মালিকদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে কাগজ শিল্পে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার বিনিয়োগ রয়েছে। এ খাতে প্রায় ১০ লাখ মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থান হয়েছে, আর পরিবহন, কাঁচামাল, বিপণন ও অন্যান্য সহযোগী খাত মিলিয়ে পরোক্ষভাবে প্রায় অর্ধকোটি মানুষের জীবিকা এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। অথচ দীর্ঘদিনের বাজার বৈষম্যের কারণে ইতোমধ্যে ৮০টি কাগজকল বন্ধ হয়ে গেছে এবং আরও ২৬টি মিল বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে বিপিএমএ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে আমদানিকৃত প্রস্তুত কাগজের ন্যূনতম অ্যাসেসমেন্ট মূল্য প্রতি মেট্রিক টন ৯৪৫ মার্কিন ডলার নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) নির্ধারিত ২৯ দশমিক ৫ ইঞ্চি রোল, ২০/৩০ শিট এবং ৭০/৮০ জিএসএম অফ-হোয়াইট ন্যাচারাল শেড প্রিন্টিং পেপার বিদেশ থেকে আমদানি বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে, কারণ এসব কাগজ দেশীয় শিল্পেই উৎপাদন করা সম্ভব বলে দাবি করা হচ্ছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো দেশের উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি থাকা সত্ত্বেও বিদেশি কাগজের ওপর নির্ভরতা কমছে না।
মেঘনা পাল্প অ্যান্ড পেপার মিলস লিমিটেডের সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার (মার্কেটিং) মোহাম্মদ ইয়ারুল ইসলাম বিদ্যুৎ জানান, বর্তমানে দেশে প্রায় ৩০টি রাইটিং ও প্রিন্টিং পেপার মিল চালু রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১৬ লাখ মেট্রিক টন, যেখানে দেশের মোট চাহিদা মাত্র ৯ লাখ মেট্রিক টন। অর্থাৎ চাহিদা পূরণের পরও বছরে প্রায় ৭ লাখ মেট্রিক টন অতিরিক্ত উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে।
তার মতে, সরকার যদি নীতিগত সহায়তা এবং সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করে, তাহলে শুধু এনসিটিবির প্রয়োজনীয় সব কাগজই নয়, উদ্বৃত্ত উৎপাদন আন্তর্জাতিক বাজারেও রফতানি করা সম্ভব হবে। ইতোমধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ পাল্প আমদানি করে উৎপাদনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। কিন্তু প্রস্তুত কাগজের অব্যাহত আমদানি সেই বিনিয়োগকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী বসুন্ধরা গ্রুপের সিনিয়র ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আগে দেশে বাঁশ ও কাঠ থেকে পাল্প উৎপাদিত হলেও বর্তমানে কাঁচামালের সীমাবদ্ধতার কারণে প্রায় পুরো শিল্প বিদেশ থেকে আমদানিকৃত পাল্পের ওপর নির্ভরশীল।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পাল্প আমদানির ক্ষেত্রে প্রতি টনের অ্যাসেসমেন্ট মূল্য ৮৪০ মার্কিন ডলার ধরা হলেও অনেক আমদানিকারক প্রস্তুত কাগজের মূল্য মাত্র ৬০০ মার্কিন ডলার দেখিয়ে শুল্কায়ন করছেন। ফলে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে কাঁচামালের ঘোষিত মূল্যই প্রস্তুত পণ্যের ঘোষিত মূল্যের চেয়ে বেশি। শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, এটি শুধু অস্বাভাবিকই নয়, বরং সম্ভাব্য আন্ডার-ইনভয়েসিংয়েরও স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে।
তাদের যুক্তি, পাল্প আমদানির মূল্য, উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি, শ্রম, পরিবহন ও অন্যান্য খরচ বিবেচনায় প্রস্তুত কাগজের অ্যাসেসমেন্ট মূল্য বাস্তবসম্মতভাবে প্রতি টন প্রায় ১ হাজার মার্কিন ডলার হওয়া উচিত। এ কারণে বিপিএমএর প্রস্তাবিত ৯৪৫ ডলারের ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণকে তারা যৌক্তিক বলেই মনে করছেন।
শিল্প মালিকরা অবশ্য আমদানি নিষিদ্ধ করার পক্ষে নন। তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের স্বার্থে আমদানি চলবে, তবে সেটি হতে হবে প্রকৃত মূল্য ঘোষণা এবং সমান প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে। অন্যথায় যারা নিয়ম মেনে উৎপাদন করছে, তারা ক্রমেই বাজার হারাবে এবং অসাধু আমদানিকারকরা সুবিধা পাবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কাগজ শিল্প শুধু একটি উৎপাদন খাত নয়; শিক্ষা, প্রকাশনা, প্যাকেজিং, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি ও রফতানিমুখী শিল্পের সঙ্গে এর প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। ফলে এ শিল্প দুর্বল হলে তার প্রভাব বহুমাত্রিক হবে। একই সঙ্গে শিল্প বন্ধ হলে ব্যাংকঋণ আদায়, কর্মসংস্থান, সরকারি রাজস্ব এবং শিল্পায়নের গতিও নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকট মোকাবিলায় সরকারের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ করণীয় রয়েছে। প্রথমত, আন্ডার-ইনভয়েসিং ও শুল্ক ফাঁকি রোধে আন্তর্জাতিক মূল্য যাচাই এবং ঝুঁকিভিত্তিক কাস্টমস অডিট জোরদার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বিবেচনায় সরকারি ক্রয়ে স্থানীয় শিল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতি কার্যকর করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, কাগজ শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে জ্বালানি ব্যয়, অর্থায়ন এবং কাঁচামাল আমদানিতে যৌক্তিক নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের বিশ্বাস, প্রয়োজনীয় নীতিগত সংস্কার, স্বচ্ছ শুল্ক ব্যবস্থাপনা এবং ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের কাগজ শিল্প শুধু দেশের চাহিদা পূরণেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং ভবিষ্যতে এটি একটি সম্ভাবনাময় রফতানিমুখী শিল্পে পরিণত হতে পারে। তবে সে জন্য দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। অন্যথায় আন্ডার-ইনভয়েসিংয়ের চাপ, রাজস্ব ফাঁকি এবং বাজার বৈষম্যের কারণে দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় এই শিল্প আরও গভীর সংকটে নিমজ্জিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উল্লেখ্য, এ বিষয়ে শিল্প মালিকদের অভিযোগ ও দাবির বিষয়ে বক্তব্য জানতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সর্বশেষ হালনাগাদ 1 day আগে

