অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
প্রতিটি ডালে থোকায় থোকায় লাল হয়ে আছে অসংখ্য কফি ফল। দেখতে দূর থেকে অনেকটাই জামের মতো। পাহাড়ের ঢালে সেই লাল হওয়া কফি ছিঁড়ে ছিঁড়ে মাথায় বাঁধা বাঁশের ঝুড়িতে রাখছেন বিরোবালা ত্রিপুরা (৪০)। খাগড়াছড়ি পাহাড়ী কৃষি গবেষণা কেন্দ্র্রে প্রায় দুই একরের মতো জমিতে ৩৭০টি গাছে কফি এসেছে। প্রতিদিনই উঠানো হচ্ছে পাকা কফি। এসব পাকা কফি উঠিয়ে প্রতিদিন বিরোবালা ত্রিপুরার আয় ৪০০ টাকা। আরও অনেকেই বর্তমানে কফি শ্রমিক হিসেব নিয়োজিত। পশ্চিমা দেশের অন্যতম পানীয় কফি সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সারাবিশ্বের সবার কাছেই বেশ জনপ্রিয়। ইতোমধ্যে বাংলাদেশও কফি চাষের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দ্রুতগতিতে। বিশেষ করে পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে কফি চাষে বদলে যাবে পাহাড়ী জীবন। অর্থনৈতিক সচ্ছলতাসহ এই কফি আবাদ ভূমিকা রাখবে দেশের উন্নয়নেও এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, ২০০১ সালের দিকে খাগড়াছড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে পরীক্ষামূলকভাবে কফি চাষ শুরু হয়। যা ইতোমধ্যে সাফল্যের মুখ দেখতে শুরু করেছে। খুব দ্রুতই গবেষণার সাফল্য হিসেবে বারি কফি-১ রিলিজ দেয়া হবে বলেও জানা গেছে। এছাড়াও কফি চাষ সম্প্রসারণে কৃষি মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা কর্মসূচী হাতে নিয়েছে। এসব কর্মসূচীর সফল বাস্তবায়নে সম্ভাবনাময় কফি চাষে বদলে যাবে পাহাড়ী জীবন। সমৃদ্ধ হবে আর্থিক খাতও। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে পাহাড়ী এলাকায় কৃষক পর্যায়ে কফি চাষের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নিশ্চিত করা গেলে এটি হবে পাহাড়ের অন্যতম অর্থকরী ফসল।
কফি হতে পারে বাংলাদেশের পাহাড়ী মানুষের বিকল্প আয়ের উৎস। কফি চাষের সঙ্গে আন্তঃফসল হিসেবে পেঁপে, আনারস, গোলমরিচ অনায়াসে চাষ করা যায়। কফি হালকা ছায়ায় ভাল হয় এবং অতিরিক্ত সার ও সেচের তেমন প্রয়োজন হয় না যা পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। স্থানীয় চাহিদা অনেক বেশি ও রফতানির সুযোগ রয়েছে বলে এটির উৎপাদন বৃদ্ধিতে সরকার বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সরেজমিনে খাগড়াছড়িতে পাহাড়ের ঢালু অংশের উর্বর জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে কফি চাষ করে সফলতা মিলেছে। বর্তমান সময়ে প্রতিদিনই উঠানো হচ্ছে পাকা কফি।
জানা যায়, ‘২০০১ সালে খাগড়াছড়িতে পাহাড়ী কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে পরীক্ষামূলকভাবে কফির চাষাবাদ শুরু হয়। বর্তমানে এই কেন্দ্রের প্রায় প্রতিটি গাছের শাখায় শাখায় রঙিন কফি ফল শোভা পাচ্ছে। কফি ফল তুলতে তুলতে চাইন্না মারমা (৪০) বলেন, একজন শ্রমিক ১০ কেজি কফি তুলতে পারে প্রতিদিন। খাগড়াছড়ি পাহাড়ী কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে চাষকৃত এরাবিয়ান (মিসরীয়) জাত এবং রোভাস্টা জাতের চাষ হচ্ছে। বর্তমানে রোভাস্টা জাতের কফি ফল এসেছে। পাহাড়ী কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে উৎপাদিত কফি সনাতন পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াজাত করেন মোঃ জামাল উদ্দিন। তিনি জানান, পাকা কফি ফল বাগান থেকে সংগ্রহ করার পর শুকানো হয়। শুকানো কফি ঘরোয়া উপায়ে ক্রাশিং করে পান উপযোগী করা হয়। তিনি আরও জানান, এই কেন্দ্রে উৎপাদিত কফি অত্যন্ত সুস্বাদু এবং সুঘ্রাণে ভরা। জানা গেছে, গত বছর প্রায় ৪০০ কেজি ফলন পাওয়া গিয়েছিল এবারও একই রকম ফলন পাওয়া যাবে বলে জানান বৈজ্ঞানিক সহকারী বলিন্দ্র ত্রিপুরা।
কফি নিয়ে দীর্ঘদিনের গবেষণার অংশ এবং সাফল্য হিসেবে দ্রুতই বারি কফি ১ রিলিজের জন্য প্রস্তাব দেয়া হবে। আগামী ২ মাসের মধ্যে প্রস্তাবনা কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে বলেও জানান প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং উদ্যান তাত্ত্বিক ফসলের গবেষণা জোরদারকরণ এবং চর এলাকায় উদ্যান ও মাঠ ফসলের প্রযুক্তি বিস্তার প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. মোঃ আবু তাহের মাসুদ। তিনি আরও বলেন, পাহাড়ী একটা সমৃদ্ধ এলাকা। কফি ফলদ, বনজের মধ্যে চাষ করা যায়। যার কারণে সুবিধা হলো বাড়তি জায়গার প্রয়োজন হয় না। কফিতে ভাল করতে হলে ভাল জাত দরকার। আমরা গবেষণার অংশ হিসেবে রিলিজের প্রস্তাব দেব। পাহাড়ের মতো সমতলের অনেক স্থানেই হচ্ছে কফি চাষ। এতে সাধারণ মানুষের মনে আগ্রহ বাড়ছে। টাঙ্গাইলের মধুপুরে সানোয়ার হোসেন বাড়ির আঙ্গিনায় শখের বশে বেশ কিছু কফি গাছ লাগান। তার কফি গাছেও প্রচুর ফল আসে। সানোয়ার হোসেন এই পাহাড়ী কেন্দ্র থেকে প্রথম কফির চারা সংগ্রহ করেন। অথচ এখন নিজেই কফির চারা তৈরি করতে পারছেন।
খাগড়াছড়ি পাহাড়ী কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুন্সী রাশীদ আহমদ জানান, পাহাড়ে কফি চাষের মধ্যে ব্যাপক অর্থনৈতিক লাভ লুকিয়ে আছে। কৃষকদের মধ্যে ভাল জাতের কফি বীজ সরবরাহ, উৎপাদিত কফি সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে সহায়তা ও উদ্বুদ্ব করা গেলে কৃষকরা কফি উৎপাদনে ব্যাপকভাবে লাভবান হবে। আশা করা যাচ্ছে সামনের দিনগুলোতে এখানে কফি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে উঠবে এবং কফি পাহাড়ের অন্যতম অর্থনৈতিক ফসলে পরিণত হবে। গত বছরও এই গবেষণা কেন্দ্র থেকে ২০ হাজার কফি চারা উৎপাদন করা হয় যা ২০ টাকা পিস হিসেবে বিক্রি হচ্ছে। এই চারা বিক্রিটাও আগে খুব একটা হতো না। যা দুই বছর আগেও চারা বিক্রি একেবারেই ছিল না বলে জানা গেছে। ২০১৮ সাল থেকে কফি চারা বিক্রি বেড়েছে এবং মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. মোঃ নাজিরুল ইসলাম বলেন, কফির একটি বিরাট সম্ভাবনা আমাদের দেশে। এছাড়াও সরকারের অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় পাহাড়ী অঞ্চল উত্তরাঞ্চল দক্ষিণাঞ্চল এসব স্থান নিয়ে বিভিন্ন ফসল উৎপাদনের পরিকল্পনা আছে। আর পাহাড়ে কফির সম্ভাবনা আরও বেশি এ কারণে এখানে সব ফসল ফলানো সম্ভব নয় কেননা পরিবহন খরচ বেশি। সে হিসেবে এটি অল্প খরচে খুবই ভাল একটি ফসল। আর বর্তমানে কফির অন্যান্য প্রক্রিয়াও সহজ করা হচ্ছে।
খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে চাহিদা থাকলেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কফির আবাদ হচ্ছে না। খাগড়াছড়ি পাহাড়ী কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে পরীক্ষামূলকভাবে কফির চাষ শুরু হয়। সরকারও নতুন করে উদ্যোগ নেয়ায় আশা করা যায় শীঘ্রই কফি চাষ ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফরের রাঙ্গামাটি অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক পবন কুমার চাকমা জানান, বর্তমানে রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান তিন পার্বত্য জেলায় ১০২ হেক্টর জমিতে কফি আবাদ হচ্ছে। যার মধ্যে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ২১ টন কফি। পাহাড়ী এলাকা বাদে বাংলাদেশের অন্যান্য এলাকায় ইতোমধ্যে চাষ শুরু হয়েছে। উত্তরাঞ্চলের নীলফামারী ও রংপুর জেলায় এবং টাঙ্গাইলে কফির চাষ শুরু হয়েছে।
সর্বশেষ হালনাগাদ 5 years আগে
