অর্থকাগজ প্রতিবেদন

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই প্রস্তাবিত বাজেটের মূল চ্যালেঞ্জ বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ)।

২০২৩-২০২৪ অর্থ বছরের জাতীয় বাজেটের ওপর বিসিআই’র প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি এ মন্তব্য করেন। শনিবার (৩ জুন) সংগঠনটির ভারপ্রাপ্ত সচিব কামরুন নাহার শিউলির সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

বিসিআই সভাপতি বলেন, বাজেটে সরকার ৫টি ক্ষেত্রকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, যার মধ্যে আছে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কৃষি ও সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ বৃদ্ধি, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং গ্রামীণ উন্নয়ন।

তিনি বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের মধ্যে রাখার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা এখন ৯ শতাংশের বেশি। অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বলেন, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আমদানি বিকল্প পণ্য উৎপাদনে জোর দেওয়া হবে। কিন্তু দেশীয় শিল্প সক্ষমতা ও টেকসই করার কোন নিদৃষ্ট দিকনির্দেশনা নেই বিশেষ করে মাইক্রো, কুটির ও ক্ষুদ্র শিল্পের উন্নয়নে কোন দিকনির্দেশনা নেই। মাইক্রো, কুটির ও ক্ষুদ্র শিল্প করোনা এবং রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে ইতোমধ্যে প্রায় ৪৫% ঝরে পড়েছে।

তিনি আরও বলেন, রাজস্ব আয় প্রধানত বেসরকারী খাত থেকে সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। কিন্তু বর্তমানে উচ্চমূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট, জ্বালানি সমস্যা কারণে মানুষের ক্রয় ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে, ফলে উৎপাদনশীল কারখানাগুলোর প্রবৃদ্ধি হারিয়েছে। এদিকে বেসরকারি খাতের ক্রেডিট গ্রোথ নিম্নগামী। রফতানিও মন্থর এবং রেমিট্যান্সও ওই পরিমাণে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে না। দেশের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে গেলে আমদানি বিকল্প শিল্প এবং কীভাবে কারখানাগুলোর প্রবৃদ্ধির সক্ষমতা ফিরিয়ে আনা যায় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে এর কোন দিকনির্দেশনা নেই।

বিসিআই সভাপতি বলেন, শুধু আইএমএফ এর শর্তের দিকে গুরুত্ব না দিয়ে দেশের অর্থনীতি কিভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে সে দিকে গুরুত্বারোপ করতে হবে। আমাদের এখন স্থানীয় শিল্প, আমদানি বিকল্প শিল্পের সক্ষমতা ফিরিয়ে আনা এবং টেকশই করা এবং কর্মসংস্থান ধরে রাখার দিকে অধিক গুরুত্ব দিতে হবে।

বিসিআইর বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যক্তি শ্রেনির করমুক্ত আয়ের সীমাঃ সাড়ে ৩ লাখ করা হয়েছে যা বিসিআই স্বাগত জানায় তবে উচ্চমূল্যস্ফীতি ও জীবন যাত্রার ব্যয় বিবেচনায় আগামী কর বৎসরের ব্যক্তি শ্রেনির করমুক্ত আয়ের সীমাঃ ৫ লক্ষ টাকা করার প্রস্তাব করছি। এবং উচ্চমূল্যস্ফীতির এ সময়ে করযোগ্য নয় এমন টিনধারীদের ওপর ন্যূনতম ২ হাজার টাকা আয়কর আরোপের সিদ্ধান্ত স্বল্প আয়ের জনগোষ্ঠীর ওপর করের বোঝা তৈরি করবে। তাই এ প্রস্তাব প্রত্যাহারের আহ্বান জানাচ্ছি।

এতে আরও বলা হয়, বাজেটে মোট আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫ লাখ কোটি টাকা। যার মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা যা বিগত বছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ১৬.২০% বেশি। অথচ গত এপ্রিল পর্যন্ত চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হয়েছে মোট লক্ষ্যের মাত্র ৬১ শতাংশ। বিদ্যমান ডলারসংকট এবং আমদানিতে নানা ধরনের বিধিনিষেধ থাকায় এই রাজস্ব আদায় নতুন র্অবছরে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়াবে।

সরকারের আয় মূলত বেসরকারি খাত ও রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যেমে হয়ে থাকে। বিসিআই মনে করে, বেসরকারি খাতে জ্বালানি স্বল্পতা, বিদ্যুৎ-গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি এবং নিরবিচ্ছিন্ন সাপ্লাই না থাকার কারণে শিল্প কারখানাগুলো ৫০-৬০ শতাংশের বেশি উৎপাদন ক্ষমতা ধরে রাখতে পারছে না। সাথে সাথে বাংলাদেশ ব্যাংকের কন্ট্রাকশন পলিছির কারণে গত ১০ মাসে শিল্প গুলি মূলধনি যন্ত্রপাতি ৫৬%, মধ্যবর্তি কাঁচামাল ৩১.৩% এবং কাঁচামাল ৩১.৫% কম ঋণপত্র খুলেছে। এব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা থাকা দরকার যেন কোন অবস্থাতেই শিল্পের কাঁচামাল, মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি বাধাগ্রস্থ না হয় এবং সরকারকে কমমূল্যে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। তা না করলে দেশিয় শিল্প তাদের সক্ষমতা ধরে রাখতে পারবে না, উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে তাতে করে মূল্যস্ফিতি কমবে না সাথে সাথে বেকারত্বের হার বেড়ে যাবে। যার ফলে এনবিআর এরও তাদের কর আহরন বাধাগ্রস্থ হতে হবে। বেসরকারি খাত এবং এনবিআরকে একসাথে কাজ করতে হবে। এক্ষেত্রে রাজস্ব বোর্ডের প্রাকটিসেরও পরিবর্তন আনা বাঞ্চনীয়।

বিসিআইয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সেক্টর ভিত্তিক থামরুলে গ্রোস প্রফিট (জিপি) ধরে শুল্কায়ন না করে কোম্পানি বিশেষে একচূয়াল একাউন্টিং প্রাক্টিস এর ভিত্তিতে শুল্কায়ন করা উচিৎ যেমন- একচূয়াল প্রফিট অথবা একচূয়াল লস মেনে কোম্পানি ওয়াইজ হিসেবে শুল্কায়ন করলে যে সব কোম্পানি যারা কর দিচ্ছে না তারা কর দিতে আগ্রহী হবে। সাথে সাথে কর নিট বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আমরা মনে করি ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে মোট করের ৮০% এর উপর সংগ্রহ হয়ে থাকে অথচ বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রায় ৪৫% অন্যান্ন জেলায় অবস্থিত। এসকল অঞ্চলে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ করে ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে মানুষের কাছে গেলে কর আদায় বৃদ্ধি পাবে এবং করনেট প্রসারিত হবে। ব্যবসায়ি এবং এনবিআরকে দায়িত্ব নিয়ে দেশের এই ক্রান্তি লগ্নে এগিয়ে আসতে হবে।

অকা/প্র/ সকাল, ৪ জুন, ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 3 years আগে

Leave A Reply

Exit mobile version