অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
পুঁজি বাজার সূচকের উন্নতি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আশঙ্কাই সত্যি হলো। ১৭ মে হঠাৎ পুঁজি বাজার সূচকের উত্থান নিয়ে সাময়িক যে স্বস্তি তৈরি হয়েছিল তা ২৪ ঘণ্টাও টিকল না। ১৮ মে সপ্তাহের দ্বিতীয় কর্মদিবসে আবার সেই পুরনো পতনের ধারায়ই ফিরে গেল পুঁজি বাজার আচরণ। আর এবার হতাশায় আক্রান্ত বিনিয়োগকারীরা কোনো উপায় খুঁজে না পেয়ে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে কফিন মিছিলের আয়োজন করেছে। ১৮ মে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে থেকে পুঁজি বাজার ইনভেস্টরস অ্যাসোসিয়েশনের ব্যানারে তারা এ কফিন মিছিল ও বিক্ষোভের আয়োজন করে।
এ আয়োজনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে চাইলে আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এ মুহূর্তে পুঁজি বাজার অনেকটা মৃতপ্রায়। তাই এখন কফিনই এর স্থান হওয়া উচিত। পুঁজি বাজারে ধারাবাহিক পতনের ফলে পুঁজি হারিয়ে ব্যাপক তির মুখে পড়েছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। এ সময় সংগঠনটির সভাপতি এস এম ইকবাল হোসেন, সমন্বয়ক ও মুখপাত্র নুরুল ইসলাম মানিকসহ অন্যান্য নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আরো বড় কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেন তারা।
প্রধান পুঁজি বাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ১৮ মে ২৯ দশমিক ৩৮ পয়েন্ট অবনতি ঘটে। চার হাজার ৮২০ দশমিক ৪৬ পয়েন্ট থেকে দিন শুরু করা সূচকটি ১৮ মে দিনশেষে স্থির হয় চার হাজার ৭৯১ দশমিক ০৮ পয়েন্টে। এ সময় বাজারটির অন্য দুই সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ হারায় যথাক্রমে ৮ দশমিক ০১ ও ৬ দশমিক ৬২ পয়েন্ট। অপরদিকে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ৭৮ দশমিক ০৪ পয়েন্ট পতন ঘটে। বাজারটির অন্য দুই সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের পতন ঘটে যথাক্রমে ১৯ দশমিক ৩০ ও ৫০ দশমিক ০২ পয়েন্ট।
এদিকে, পুঁজি বাজার পরিস্থিতির চলমান সঙ্কট নিয়ে বৈঠকের পর বৈঠক অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু তার কোনো প্রভাবই নেই বাজারে। ১৭ মে সন্ধ্যায় অংশীজনদের নিয়ে পরিস্থিতি উত্তরণে আবারো দীর্ঘ সভা করেছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। সংস্থাটির মুখপাত্র মো: আবুল কালাম স্বাক্ষরিত এ প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানা যায়।
বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের সভাপতিত্বে সভায় কমিশনার মু: মোহসিন চৌধুরী, মো: আলী আকবর, ফারজানা লালারুখ এবং বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও পরিচালকরা উপস্থিত ছিলেন। পুঁজি বাজারের অংশীজনদের মধ্যে ঢাকা স্টক এক্সেচেঞ্জ পিএলসি (ডিএসই), চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ পিএলসির (সিএসই), ব্রোকারদের সংগঠন ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ), মার্চেন্ট ব্যাংকারদের সংগঠন বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমবিএ) ও রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) শীর্ষ প্রতিনিধিরা সভায় উপস্থিত ছিলেন।
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দেশের পুঁজি বাজারের বিভিন্ন বিষয়ে ওই সভায় আলোচনা হয়। এতে পুঁজি বাজার নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার সাথে হওয়া সভা ও তার নির্দেশনার বিষয়ে আলোচনা হয়। এ ছাড়াও পুঁজি বাজারে তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানির কর হারের ব্যবধান ন্যূনতম ১০ শতাংশ করা, পুঁজি বাজারে এক লাখ টাকা পর্যন্ত লভ্যাংশ আয়ের ওপর আরোপিত কর মওকুফ করা, পরিকল্পনা অনুসরণ করে নেগেটিভ ইক্যুইটির উত্তরণ ও স্থায়ী সমাধান করা, বিও হিসাবের ম্যানটেন্যান্স ফি মওবুফ করা, ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স মওকুফ করা, ব্রোকারদের টার্নওভারের ওপর প্রদত্ত অগ্রিম কর (এআইটি) হ্রাস করা, দেশের ভালো মৌলভিত্তি সম্পন্ন বৃহৎ দেশীয় কোম্পানি, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি কিংবা বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে পুঁজি বাজারে তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়ে আলোচনা হয়।
গভর্নমেন্ট বা সরকারি সিকিউরিটিজের নিলাম পুঁজি বাজারের এক্সচেঞ্জ প্ল্যাটফর্মে আনয়ন, সিকিউরিটিজ হাউজে থাকা বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের সুরা নিশ্চিত করা ইত্যাদি বিষয়ে গঠনমূলক এবং সমন্বিত গ্রাহক হিসাব থেকে প্রাপ্ত আয়ের অর্থের ব্যবহার বিষয়ে আলোচনা হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে আরো জানানো হয়, সভায় ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিরঞ্জন চন্দ্র দেবনাথ বিনিয়োগকারীদের কল্যাণের স্বার্থে মিউচ্যুয়াল ফান্ডগুলোর চলতি অর্থবছরের অর্জিত আয়ের ২০ শতাংশ প্রভিশনিং করে বাকি ৮০ শতাংশ ইউনিটহোল্ডারদের মধ্যে ডিভিডেন্ড হিসেবে বিতরণ করার প্রস্তাবনা পেশ করেন।
বিএসইসির বৈঠকে আলোচিত সবগুলো বিষয়ই এ মুহূর্তে পুঁজি বাজারের সব স্টেক হোল্ডারদের প্রাণের দাবি। কিন্তু তা সত্ত্বেও এসব আলোচনা বাজারের সঙ্কট উত্তরণে কোনো ইতিবাচক প্রভাব রাখতে পারছে না।
১৮ মে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেনে অংশ নেয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে লেনদেনের শীর্ষে উঠে এসেছে বিচ হ্যাচারি লিমিটেড। এ দিন কোম্পানিটির ১৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকা কোম্পানিটির ৩২ লাখ ৩৯ হাজার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। লেনদেনের শীর্ষ তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা সিটি ব্যাংকের লেনদেন হয়েছে ১৩ কোটি ৮৯ লাখ টাকায় ৬০ লাখ ৫৪ হাজার। আর ১২ কোটি ৭০ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন নিয়ে শীর্ষ তালিকার তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছে এনআরবি ব্যাংক পিএলসি। লেনদেনের শীর্ষ তালিকায় থাকা অন্যান্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে-শাইনপুকুর সিরামিকস, বারাকা পতেঙ্গা পাওয়ার, উত্তরা ব্যাংক, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন, সিটি ইন্স্যুরেন্স, খান ব্রাদার্স এবং ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড।
সিএসইতে এ তালিকায় ছিল যথাক্রমে খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ, ব্র্যাক ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক, ওয়ালটন হাইটেক ইঞ্জিনিয়ারিং, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, মোবিল যমুনা, রবি অজিয়াটা, শাইনপুকুর সিরামিকস ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক।
ডিএসইতে লেনদেনে অংশ নেয়া কোম্পানিগুলোর দর বৃদ্ধির শীর্ষে উঠে এসেছে সোনারগাঁও টেক্সটাইল লিমিটেড। এ দিন ডিএসইতে কোম্পানির শেয়ারদর বেড়েছে ২ টাকা ৭০ পয়সা বা ৯ দশমিক ৭১ শতাংশ। দর বৃদ্ধির দ্বিতীয় স্থানে থাকা সিটি জেনারেল ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারদর ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ বেড়েছে। আর তৃতীয় স্থানে থাকা বাটা সুর দর বেড়েছে ৭ দশমিক ৪৯ শতাংশ।
এ দিন দর বৃদ্ধির শীর্ষে উঠে আসা অপর কোম্পানিগুলো হলো- এইচআর টেক্সটাইল, ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্স, শাইনপুকুর সিরামিক, ফিনিক্স ইন্স্যুরেন্স, এক্সপ্রেস ইন্স্যুরেন্স, রহিম টেক্সটাইল এবং স্ট্যান্ডার্ড ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড।
এ সময় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেনে অংশ নেয়া কোম্পানিগুলোর দরপতনের শীর্ষে উঠে এসেছে ফার্স্ট বাংলাদেশ ফিক্সড ইনকাম ফান্ডের। এ দিন ফান্ডটির ইউনিট দর আগের দিনের চেয়ে ৪০ পয়সা বা ৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ কমেছে। তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা এনআরবি ব্যাংকের শেয়ারদর আগের দিনের চেয়ে ৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ কমেছে। আর শেয়ারদর ৮ দশমিক ০৪ শতাংশ কমে যাওয়ায় তালিকায় তৃতীয় স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স।
তালিকায় থাকা অন্যান্য কোম্পানির মধ্যে- বারাকা পতেঙ্গা পাওয়ার, সিএপিএম আইবিবিএল ইসলামিক মিউচ্যুয়াল ফান্ড, আইএফআইসি ফার্স্ট মিউচ্যুয়াল ফান্ড, এসইএমএল গ্রোথ ফান্ড, এনআরবিসি ব্যাংক, শাহাজিবাজার পাওয়ার এবং পিএইচপি ফার্স্ট মিউচ্যুয়াল ফান্ড। ●
অকা/পুঁবা/ফর/রাত/১৮ মে, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 10 months আগে
