অর্থকাগজ প্রতিবেদন
দেশের নাজুক ব্যাংকিং খাতকে পুনর্গঠন, আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং অর্থনীতিতে টেকসই প্রবৃদ্ধির ভিত্তি শক্তিশালী করতে বাংলাদেশকে ৪৫ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক। এই অর্থায়নের মাধ্যমে শুধু ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোই নয়, বরং দীর্ঘদিনের সুশাসনের ঘাটতি, দুর্বল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং সংকট ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা দূর করেও একটি অধিক স্থিতিশীল ও আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
গত ২৪ জুন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংকের সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত নির্বাহী পরিচালক পর্ষদের সভায় ‘ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট-২’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় এই ঋণ অনুমোদন দেওয়া হয়। রোববার বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায়।
বিশ্বব্যাংক বলছে, প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য হলো দেশের আমানত সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি ও নিয়ন্ত্রক সক্ষমতা বাড়ানো এবং ব্যাংকিং খাতে সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলার জন্য একটি কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর সংস্কারের ভিত্তি তৈরি এবং আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠায়ও এই অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
প্রকল্পের আওতায় আমানত সুরক্ষা তহবিলের মূলধন বাড়ানো হবে, যাতে কোনো ব্যাংক আর্থিক সংকটে পড়লেও ক্ষুদ্র আমানতকারীদের সঞ্চয় অধিক সুরক্ষিত থাকে। পাশাপাশি আধুনিক আমানত বিমা ব্যবস্থা, জরুরি তারল্য সহায়তা (Emergency Liquidity Assistance) কাঠামো, সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের পুনর্গঠন ও সমাধান (Bank Resolution Framework) এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়নে সহায়তা দেওয়া হবে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) অবকাঠামো আধুনিকায়ন করা হবে। উন্নত ডেটা অ্যানালিটিক্স, রিয়েল-টাইম ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ এবং সাইবার নিরাপত্তা জোরদারের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি ব্যবস্থা আরও কার্যকর হবে। এর ফলে ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারি, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আর্থিক খাতের স্থিতিস্থাপকতা (Financial Resilience) উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে আশা করছে বিশ্বব্যাংক।
এই অর্থায়নের পেছনে রয়েছে দেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান দুর্বল বাস্তবতা। দীর্ঘদিনের দুর্বল করপোরেট সুশাসন, রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়মিত ঋণ বিতরণ, ঋণ পুনঃতফসিলের অপব্যবহার এবং দুর্বল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার কারণে ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে দেশের খেলাপি ঋণের হার ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার গড় ৭ দশমিক ৯ শতাংশের প্রায় চার গুণ। একই সময়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে পুরো ব্যাংকিং খাতের মূলধন ও ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের অনুপাত (Capital to Risk-weighted Assets Ratio) ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে আসে, যা আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং মানদণ্ডের তুলনায় অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
বাংলাদেশ ও ভুটানের জন্য বিশ্বব্যাংকের ডিভিশন ডিরেক্টর জঁ পেসমে বলেন, ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার বাংলাদেশের লক্ষ্য অর্জনে একটি শক্তিশালী, স্থিতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক ব্যবস্থা অপরিহার্য। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের মোট আর্থিক খাতের প্রায় ৯০ শতাংশ সম্পদ ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় থাকলেও বর্তমানে এই খাত উল্লেখযোগ্য চাপের মধ্যে রয়েছে।
তার ভাষায়, নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে এমন নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা গড়ে তোলা হবে, যা ক্ষুদ্র আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে, ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠন করবে এবং আর্থিক খাতকে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় আরও প্রস্তুত করে তুলবে। এর ফলে ব্যাংকগুলো পুনরায় বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে কার্যকর অবদান রাখতে পারবে।
বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর স্পেশালিস্ট ও প্রকল্পটির টাস্ক টিম লিডার তোশিয়াকি ওনো বলেন, এই প্রকল্পটি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের চলমান সংস্কার কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বয় করে বাস্তবায়ন করা হবে। তার মতে, এ উদ্যোগ শুধু তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলায় নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক, প্রযুক্তিনির্ভর ও টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সর্বশেষ হালনাগাদ 15 hours আগে

