অর্থকাগজ প্রতিবেদন
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন বাণিজ্যিক শুল্ক কাঠামোয় বাংলাদেশ সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্কহার পাওয়ায় দেশের রফতানি খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে। বৈশ্বিক বাণিজ্যে শুল্কনীতি এখন প্রতিযোগিতা নির্ধারণের অন্যতম প্রধান উপাদান। এমন বাস্তবতায় চীন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের মতো প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের তুলনায় কম শুল্কহার পাওয়ায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভোক্তা বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে এই সুযোগকে দীর্ঘমেয়াদি রফতানি প্রবৃদ্ধিতে রূপ দিতে হলে উৎপাদন সক্ষমতা, শ্রমমান, সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা আরও জোরদার করতে হবে বলে মনে করছেন বাণিজ্য বিশ্লেষকরা।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৪ সালের যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেড অ্যাক্টের ৩০১ ধারার আওতায় পরিচালিত তদন্ত শেষে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয় (ইউএসটিআর) বিশ্বের ৮৬টি দেশের প্রতিনিধিত্বকারী ৬০টি অর্থনীতির জন্য নতুন শুল্কহার ঘোষণা করেছে। ২৩ জুলাই ঘোষিত এ সিদ্ধান্ত ওয়াশিংটন সময় ২৫ জুলাই রাত ১২টা ১ মিনিট থেকে কার্যকর হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ট্রেড অ্যাক্টের ১২২ ধারার আওতায় আগে আরোপিত অস্থায়ী ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্কের পরিবর্তে দেশভিত্তিক নতুন শুল্কব্যবস্থা কার্যকর হলো।
নতুন ব্যবস্থায় বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা পণ্যের ওপর বিদ্যমান মোস্ট ফেভার্ড নেশন (এমএফএন) শুল্কের পাশাপাশি অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। যদিও এটি অতিরিক্ত শুল্ক, তবু ঘোষিত তালিকায় থাকা ৮৬টি দেশের মধ্যে মাত্র ১৭টি দেশ এই সর্বনিম্ন শুল্কস্তরে স্থান পেয়েছে। বাংলাদেশও সেই তালিকায় থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরি পোশাকসহ দেশের সামগ্রিক রফতানি প্রতিযোগিতা অক্ষুণ্ন থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, দেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী তৈরি পোশাক রফতানিকারক দেশ চীন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্কের আওতায় রাখা হয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের তুলনায় এসব দেশের পণ্যের ওপর ২ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি শুল্ক আরোপ হবে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এই ব্যবধান আপাতদৃষ্টিতে ছোট মনে হলেও বৃহৎ পরিসরের পোশাক আমদানিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। মূল্য সংবেদনশীল মার্কিন বাজারে সামান্য শুল্ক পার্থক্যও ক্রেতাদের ক্রয় সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখে। ফলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের পণ্যের আকর্ষণ আরও বাড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রফতানি গন্তব্য। প্রতি বছর কয়েক বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক এই বাজারে রফতানি হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে পরিবর্তন, উৎপাদন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি এবং ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্র খুঁজছেন। এমন প্রেক্ষাপটে তুলনামূলক কম শুল্কহার বাংলাদেশের জন্য নতুন ক্রয়াদেশ আকর্ষণ, বাজার অংশীদারিত্ব বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদে রফতানি সম্প্রসারণের বাস্তব সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুল্ক সুবিধা একাই প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে পারে না। সময়মতো পণ্য সরবরাহ, উৎপাদনের ধারাবাহিকতা, আন্তর্জাতিক শ্রমমান, পরিবেশগত মানদণ্ড, জ্বালানি ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে না পারলে এই সুবিধার পূর্ণ সুফল পাওয়া কঠিন হবে। অর্থাৎ কম শুল্ককে কার্যকর বাণিজ্যিক সুবিধায় পরিণত করতে হলে অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়ানোই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশের জন্য আরও একটি সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের বিবেচনাধীন ট্যারিফ-রেট কোটা (টিআরকিউ) ব্যবস্থা। ইউএসটিআর বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার জন্য তিন বছর মেয়াদি এই সুবিধা চালুর বিষয়টি পর্যালোচনা করছে। এটি কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ও বস্ত্র উপকরণ ব্যবহার করে উৎপাদিত নির্দিষ্ট পণ্যের ক্ষেত্রে ৩০১ ধারার অতিরিক্ত শুল্ক মওকুফ হতে পারে। এতে বাংলাদেশের রফতানিকারকরা আরও বড় প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পাবেন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কাঁচামালের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক শ্রমমান বজায় রাখা, দেশের রফতানিমুখী শিল্পের টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত সংস্কার অব্যাহত রাখতে বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা চালিয়ে যাবে। বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক বাণিজ্যের নতুন বাস্তবতায় শুধু কম উৎপাদন ব্যয় নয়; শ্রম অধিকার, সরবরাহ শৃঙ্খলের স্বচ্ছতা, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন এবং টেকসই শিল্পচর্চাও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হয়ে উঠেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো এই তুলনামূলক শুল্ক সুবিধাকে বাস্তব অর্থনৈতিক অর্জনে রূপান্তর করা। এজন্য বন্দর ও কাস্টমস ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, লজিস্টিক ব্যয় হ্রাস, পণ্যের বহুমুখীকরণ, উচ্চমূল্য সংযোজনকারী পোশাক উৎপাদনে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন উৎপাদন পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে সম্ভাব্য ট্যারিফ-রেট কোটা সুবিধা বাস্তবায়নে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক তৎপরতাও জোরদার করতে হবে।
বিশ্ব বাণিজ্যের দ্রুত পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক কাঠামোয় সর্বনিম্ন শুল্কস্তরে বাংলাদেশের অবস্থান নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক অগ্রগতি। তবে এই অর্জনের প্রকৃত মূল্য নির্ভর করবে বাংলাদেশ কত দ্রুত এই সুবিধাকে নতুন বিনিয়োগ, অধিক ক্রয়াদেশ, বাজার সম্প্রসারণ এবং রফতানি আয় বৃদ্ধির বাস্তব সুযোগে রূপান্তর করতে পারে তার ওপর। প্রয়োজনীয় নীতিগত সংস্কার ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে পারলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আগামী বছরগুলোতে আরও সুদৃঢ় হবে।
সর্বশেষ হালনাগাদ 1 hour আগে

