ড. নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ
আজ ১০ মে ২০২৬ তারিখে আমি যখন এ লেখাটা লিখছি, তখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলায় চলছে শোকের মাতন। এখানকার ধজনগড় গ্রামের মোরসালিন (২০) ও মধুপুর গ্রামের নবীর হোসেন (৪০) প্রাণ হারিয়েছেন ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের গুলিতে। প্রায় এক মাস আগে (২৯ মার্চ ২০২৬) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রেস ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানান, অবৈধভাবে লিবিয়া থেকে গ্রিসে যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে ভাসমান একটি নৌকায় থাকা ২২জন অভিবাসন প্রত্যাশীর করুন মৃত্যু ঘটেছে। এসময় উদ্ধার করা হয়েছে ২৬ জনকে, যাদের মধ্যে ২১ জনই নাগরিক। নিহত যাত্রীদের মধ্যে নারী ও শিশু ছিল, যা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে উদ্বেগজনক। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, পাচারকারীরা কোন ধরনের ঝুঁকি বা মানবিক দিক বিবেচনা না করেই বিপজ্জনক যাত্রার দিকে ঠেলে দিচ্ছে অসহায় অভিবাসন প্রত্যাশীদের। একটি সঙ্ঘবদ্ধ আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী দল অবৈধ অভিবাসনের সাথে জড়িত, যাদের দৌরাত্ম্য অতীতের রেকর্ড ভঙ্গ করেছে।
বিশ্বব্যাপী কদিন পরপরই প্রচারে আসে লিবিয়া থেকে অবৈধ পথে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়ার পথে নৌকাডুবির ঘটনায় উদ্ধার করা বাংলাদেশিরদের কথা। ইতালির কোস্টগার্ডের ভাষ্যমতে, লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে নানা আকৃতির নৌকা বিরূপ আবহাওয়ার কারণে উল্টে যাওয়ার ফলে এই বিপত্তি ঘটে।
লিবিয়াসহ বেশকিছু দেশ থেকে অবৈধ উপায়ে ভূমধ্যসাগর হয়ে নৌকাযোগে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বেআইনি অনুপ্রবেশের ঘটনা বিগত কয়েক বছরে ক্রমেই বাড়ছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেন সীমান্ত, সিরিয়া, আফগানিস্তান, ইয়েমেন বা দুর্ভিক্ষপীড়িত আফ্রিকার কোনো দেশ থেকে যেকোনোভাবে বেঁচে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত নাগরিকদের এভাবে দেশান্তরই হওয়ার ঘটনা তেমন সাড়া ফেলে না। তবে বাণিজ্য সম্মেলন বা বিভিন্ন রোড শো করে আমরা যখন বাংলাদেশকে অমিত সম্ভাবনার দেশ ও বিনিয়োগের স্বর্গ বলে বিশ্বের সামনে তুলে ধরছি, তখন জীবন বাজি রেখে এ দেশের যুবকদের নৌকাযোগে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়া ও জীবিকার অন্বেষণে ইউরোপে মরণযাত্রা বড় বেমানান। শুধু ইউরোপই নয়, ভারত, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে নানাভাবে বেআইনি অনুপ্রবেশের ও অবৈধভাবে অবস্থানের খবর প্রায়ই শিরোনাম হয় দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমে।
বিবিসির ২৭ জানুয়ারি ২০২৩-এর তথ্যমতে, ২০২২ শুধু মালয়েশিয়াতেই ৪ লাখের বেশি অবৈধ শ্রমিক সরকার ঘোষিত ‘লেবার রিক্যালিব্রেশন প্রোগ্রাম’ প্রদত্ত সুযোগ নিয়ে বৈধতা লাভের জন্য নিবন্ধিত হয়। দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি ইংরেজি দৈনিক ২৫ জানুয়ারি ২০২২ তারিখে লিখেছে, লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগরীয় দ্বীপ ল্যাম্পেদুসায় যাওয়ার পথে অতিরিক্ত ঠান্ডায় জমে ৭ বাংলাদেশির মৃত্যু ঘটেছে। ইতালির উপকূলের একটি জনবসতিহীন দ্বীপের কাছে এই হতভাগ্যদের পাওয়া যায়। ইতালির রোমে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের ৪ কর্মকর্তা পরে জানান যে জাহাজটির ২৮৭ আরোহীর মধ্যে ২৭৩ জনই ছিলেন বাংলাদেশি।
২৮ মার্চ ২০২৩ তারিখের অন্য একটি বাংলা দৈনিকের প্রথম পৃষ্ঠার খবরে দেখা যায়, লিবিয়ার বন্দি শিবিরে দুই বছর আটক অবস্থায় অকথ্য নির্যাতন সহ্য করে ১২ লাখ টাকার বিনিময়ে সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছেন ভৈরবের জগন্নাথপুর এলাকার যুবক আরিফ আহমেদ। ২ বছর আগে ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে দেশ ছেড়ে লিবিয়ায় পাড়ি জমানো আরিফ দেশে ফিরতে না পারলেও তার পরিবারকে এক্ষেত্রে ৩০ লাখ ৫০ হাজার টাকা খরচ করতে হয়েছে। ২০২০ সালের মে মাসের শেষে লিবিয়ার এক মানবপাচারকারী পরিবারের সদস্যরা গুলি চালিয়ে ৩০ জন অভিবাসীকে হত্যা করে, যার মধ্যে ২৬ জনই ছিল বাংলাদেশি। এ ঘটনায় আহত হয় আরও ১১ জন বাংলাদেশি যুবক। লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে পারলেই ইউরোপ। তাই ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে ডিঙি নৌকায়ও মরণযাত্রা করে এ দেশের একশ্রেণির যুবক। নৌকাডুবি, নৌকা উল্টানো, ঝড়ে পতিত হওয়া, অতিরিক্ত ঠান্ডাসহ নানা কারণে প্রতিবছর শত সহস্র বাঙালির করুণ মৃত্যু ঘটে ভূমধ্যসাগর নামের এই মৃত্যুকূপে।
মিয়ানমারের সামরিক জান্তা ও স্থানীয় রাখাইন অধিবাসীদের নির্মম অত্যাচারে ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা তাদের বাস্তুভিটা ছেড়ে বাংলাদেশের কক্সবাজার এলাকায় আশ্রয় নিয়েছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে রোহিঙ্গা যুবকরা বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন উপকূল ছেড়ে জীবন বাজি রেখে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাত্রা করে। তাদের সঙ্গে একই নৌকায় শিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত বা প্রশিক্ষিত বাংলাদেশি যুবকদের অবস্থান অবশ্যই উদ্বেগের কারণ। এই অবৈধ অভিবাসনের নেপথ্যে রয়েছে নানাবিধ সমীকরণ। বাংলাদেশে যেকোনো ক্ষুদ্র বা মাঝারি ব্যবসা বা উন্নত প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে কৃষি বা মাছ ও পশুপাখির খামার করে সফল হওয়ার বহু বাস্তবতা থাকলেও ন্যায্য মূল্য না পেয়ে কৃষকের মাথায় হাত, হাজার হাজার বন্ধ পোল্ট্রি খামার বা যৌক্তিক মূল্য না পেয়ে খামারিদের রাস্তায় দুধ ফেলে দেওয়ার করুণ দৃশ্য যুবকদের চোখে বেশি দৃষ্টিগোচর হয়। একই খবর পৌঁছে অভিভাবকদের কাছেও। তাই একজন যুবক অভিভাবকদের কাছে পুঁজি বা ঋণ হিসেবেও যদি টাকা চায়, তা পায় না । অথচ একই অভিভাবক সেই যুবককে বিদেশে যাওয়ার জন্য জমি-জিরাত বা স্বর্ণ বিক্রি করে বা বন্ধক রেখে অবলীলায় টাকা খরচ করে। বৈধ এবং অবৈধ উভয় প্রকার অভিবাসী বা প্রবাসীর সাফল্য ও সমাজে তাদের কদর যেকোনো যুবককেই লোভী করে তোলে। আর আড়ালে থাকে প্রবাসীদের বোবা কান্না। আর অভিবাসনপ্রত্যাশী এই লোভী যুবকদেরই ফাঁদে ফেলে একশ্রেণির দেশীয় দালাল ও তাদের বিদেশি দালালরা।
নীতিগতভাবে সরকারি নীতিমালা ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও অবৈধ অভিবাসনকে উৎসাহিত করে। সুদানসহ আফ্রিকার বেশকিছু দেশে অবৈধভাবে বাংলাদেশি একজন যুবক প্রবেশের নেপথ্যে থাকে লিবিয়া হয়ে ইউরোপে পাড়ি জমানো। অথচ কাজের কথা বলে যুদ্ধবিধ্বস্ত সুদানে কাজ পেতে প্রলুব্ধ করে পাচারকারীরা। কেউ তাদের প্রশ্ন করে না যুদ্ধ ও ক্ষুধাপীড়িত এসব দেশে কি এমন কাজ বা বাড়তি আয়ের হাতছানি। যুদ্ধ চলছে রাশিয়া-ইউক্রেন সীমান্তে। সেখানেও কাজ আছে বলে প্রচার করছে দালালরা। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সদস্যদের চোখের সামনে কিশোরী বা যুবতীরা বিমানবন্দর ব্যবহার করেই ট্যুরিস্ট ভিসায় মধপ্রাচ্যে যায়। তাদের বিরাট অংশের ঠাঁই হয় ড্যান্স বারে নাচ বা হোটেলকক্ষে অবৈধ কাজের জন্য। অথচ যে কিশোরী বা যুবতী ভালো করে শুদ্ধ বাংলাও বলতে পারে না, সে কি করে ট্যুরিস্ট ভিসায় মধ্যপ্রাচ্যে যায়, তা জিজ্ঞেস করে না কেউ । তাদের ট্যুরের খরচ কোত্থেকে আসে, তার হদিস করে না জাতীয় আয়কর বিভাগ। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় কোন ঘাটতির কারণে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষত্ব তৈরি পোশাক খাতে মাঠপর্যায়ে এত ভারতীয় বাংলাদেশের মাটিতে চাকরির সুযোগ পায়, তা নিয়ে গবেষণা ও প্রতিকারের উপায় খোঁজা অত্যাবশ্যক। বিদেশীরা এদেশে কাজ না করলে সে কাজ অবশ্যই বাংলাদেশিরা করার সুযোগ পাবেন।
মূলত বিচ্ছিন্ন কোনো উদ্যোগ নয়, অবৈধ অভিবাসন বন্ধে চাই সুপরিকল্পিত ও সম্মিলিত প্রচেষ্টা। সরকরি ও বেসরকারি সব অংশীজনের অংশগ্রহণে বেকার সমস্যা সমাধানের আরও কার্যকর উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে অত্যাবশক। গণমাধ্যমগুলোকে নিজ উদ্যোগে অবৈধ অভিবাসনের ঝুঁকি সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করতে হবে । শ্রমের মর্যাদা দিতে হবে, বিশেষত কৃষিকাজে নিয়োজিতদের চাষাভুষা বলে অবজ্ঞা করা চলবে না। ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে কৃষিজাত পণ্য রপ্তানিতে গুরুত্ব দিতে হবে। ভূমধ্যসাগরের নোনা জলে এ দেশের আর কোনো যুবকের চোখের জল যেন না মেশে, আর কোনো ফেলানীকে ভারতে কাজের আশায় গিয়ে যেন কাঁটাতারে ঝুলন্ত লাশ হতে না হয়, এটাই প্রত্যাশা।
লেখক : মানব পাচার বিষয়ক গবেষক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক।
ইমেইল : directoradmin2007@gmail.com
সর্বশেষ হালনাগাদ 5 hours আগে

