অর্থকাগজ প্রতিবেদন
দেশের শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত মেয়াদি (ক্লোজড-এন্ড) মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর মেয়াদ বাড়ানোর দীর্ঘদিনের চর্চার অবসান ঘটিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। নতুন বিধিমালার আওতায় এখন থেকে কোনো ক্লোজড-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডের মেয়াদ বৃদ্ধি করা যাবে না। নির্ধারিত মেয়াদ শেষে ফান্ডটি ওপেন-এন্ডেড কাঠামোয় রূপান্তরিত হবে অথবা অবসায়নের মাধ্যমে বন্ধ হবে কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন ইউনিটধারীরাই।
এ লক্ষ্যে বিএসইসি সম্প্রতি ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (মিউচুয়াল ফান্ড) বিধিমালা, ২০২৫’-এর গেজেট প্রকাশ করেছে। গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে নতুন বিধিমালা কার্যকর হয়েছে। এর ফলে ২০১৫ সালের সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা বাতিল হয়ে গেছে।
নতুন বিধিমালায় ক্লোজড-এন্ড ফান্ডকে ওপেন-এন্ডেড ফান্ডে রূপান্তরকে ফান্ডের মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তন হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ফলে এ ধরনের রূপান্তরের ক্ষেত্রে বিদ্যমান মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা ও অন্যান্য প্রযোজ্য আইনি বিধান অনুসরণ বাধ্যতামূলক হবে।
বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো অ্যাসেট ম্যানেজার ফান্ড রূপান্তরের প্রস্তাব দিলে তা প্রথমে অ্যাসেট ম্যানেজার ও ট্রাস্টির পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন নিতে হবে। পাশাপাশি ট্রাস্টিকে নিশ্চিত করতে হবে যে প্রস্তাবটি ইউনিটধারীদের স্বার্থ সংরক্ষণ করছে। এ ধরনের প্রস্তাব ফান্ডের মেয়াদ শেষ হওয়ার অন্তত ১৫০ দিন আগে উত্থাপন করতে হবে।
অন্যদিকে, বিশেষ কিছু পরিস্থিতিতে ট্রাস্টিকে বাধ্যতামূলকভাবে ইউনিটধারীদের বিশেষ সাধারণ সভা (ইজিএম) আহ্বান করতে হবে। বিশেষ করে বাজারদর ও নিট সম্পদমূল্যের (এনএভি) মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান থাকলে এ বিধান কার্যকর হবে।
সভা আয়োজনের জন্য নির্দিষ্ট রেকর্ড ডেট নির্ধারণ করতে হবে এবং কমপক্ষে ২১ দিন আগে নোটিশ প্রকাশ করতে হবে। রেকর্ড ডেট অনুযায়ী যাদের নামে ইউনিট থাকবে, কেবল তারাই ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন। কোনো রূপান্তর প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য মোট ইউনিটের অন্তত ৭৫ শতাংশের সমর্থন প্রয়োজন হবে।
তবে বিশেষ পরিস্থিতির আওতায় থাকা কোনো ফান্ডে প্রয়োজনীয় সমর্থন না মিললে ইউনিটধারীদের সিদ্ধান্ত অবসায়নের পক্ষে বলে গণ্য হবে। সেক্ষেত্রে ট্রাস্টিকে ফান্ড লিকুইডেশনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। আর অন্য ক্ষেত্রে রূপান্তর প্রস্তাব ব্যর্থ হলে ইউনিটের লেনদেন পুনরায় চালু হবে এবং ফান্ড পূর্বের অবস্থায় ফিরে যাবে।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের অধিকাংশ ক্লোজড-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ড দীর্ঘদিন ধরে তাদের প্রকৃত সম্পদমূল্যের তুলনায় অনেক কম দামে লেনদেন হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ইউনিটের বাজারদর এনএভির তুলনায় প্রায় অর্ধেক পর্যন্ত কমে গেছে। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে এবং মেয়াদ শেষে ফান্ডগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। অতীতে কিছু ফান্ডের মেয়াদ বৃদ্ধির সিদ্ধান্তও বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল। নতুন বিধিমালার মাধ্যমে সেই সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ করা হয়েছে।
নতুন নিয়মে ফান্ডের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ইউনিটধারীদের ভূমিকা আরও জোরদার করা হয়েছে। বিশেষ সাধারণ সভায় ভোটের মাধ্যমে তারা সিদ্ধান্ত নেবেন ফান্ডটি ওপেন-এন্ডেড কাঠামোয় রূপান্তরিত হবে নাকি অবসায়নের পথে যাবে। রূপান্তরের জন্য মোট ইউনিটের অন্তত ৭৫ শতাংশ সমর্থন প্রয়োজন হবে। এ সমর্থন না মিললে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে ফান্ড অবসায়নের প্রক্রিয়া শুরু হবে।
রূপান্তর কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর ফান্ডের সম্পদ ও প্রশাসনিক দায়িত্ব ট্রাস্টির কাছে হস্তান্তর করা হবে। ট্রাস্টি সম্পদ সংরক্ষণ, মূল্যায়ন, নিরীক্ষা এবং রূপান্তর প্রক্রিয়া তদারকির দায়িত্ব পালন করবে। তবে নতুন কোনো বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তার থাকবে না।
ফান্ড রূপান্তরের আগে সম্পদের স্বাধীন মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য এমন অডিটর নিয়োগ দিতে হবে, যার সঙ্গে অ্যাসেট ম্যানেজার, ট্রাস্টি বা কাস্টডিয়ানের কোনো স্বার্থসংশ্লিষ্ট সম্পর্ক থাকবে না। অডিটরকে পৃথক অডিট রিপোর্ট ও ভ্যালুয়েশন রিপোর্ট জমা দিতে হবে, যেখানে সম্পদের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি এবং প্রকৃত এনএভির বিস্তারিত তথ্য থাকবে।
ক্লোজড-এন্ড ফান্ড ওপেন-এন্ডেড ফান্ডে রূপান্তরিত হলে সেটিকে কার্যত নতুন ফান্ড হিসেবে পরিচালনা করতে হবে। এ জন্য নতুন প্রসপেক্টাস, ট্রাস্ট ডিড এবং বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা চুক্তিসহ প্রয়োজনীয় নথিপত্র কমিশনে দাখিল করতে হবে। তবে বিদ্যমান ইউনিটধারীদের স্বার্থ বিবেচনায় নতুন স্পন্সর সাবস্ক্রিপশনের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি।
রূপান্তর প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত ব্যয় চাপিয়ে বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিগ্রস্ত করার সুযোগ বন্ধ করতে ব্যয়ের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করেছে বিএসইসি। বিধিমালা অনুযায়ী, মোট রূপান্তর ব্যয় ফান্ডের আকারের ১ শতাংশের বেশি হতে পারবে না। অ্যাসেট ম্যানেজারের ফি সর্বোচ্চ শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ এবং ট্রাস্টির ফি সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন বিধিমালার ফলে ক্লোজড-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর দীর্ঘদিনের ডিসকাউন্ট সমস্যা কমতে পারে। ওপেন-এন্ডেড কাঠামোয় রূপান্তরের পর বিনিয়োগকারীরা প্রকৃত সম্পদমূল্যভিত্তিক দামে ইউনিট ক্রয় ও রিডেম্পশনের সুযোগ পাবেন। এতে বাজারদর ও এনএভির মধ্যকার ব্যবধান সংকুচিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
একই সঙ্গে দীর্ঘদিন দুর্বল পারফরম্যান্স করা বা বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ ফান্ডগুলোর জন্য সুশৃঙ্খল অবসায়নের পথও তৈরি হবে। ফলে মিউচুয়াল ফান্ড খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং বিনিয়োগকারী সুরক্ষা আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সর্বশেষ হালনাগাদ 15 hours আগে

