বিশেষ প্রতিনিধি>
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আবদুর রহমানের আপন ভাতিজাকে কর পরিদর্শক পদে পদোন্নতির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করাকে কেন্দ্র করে পুরো পদোন্নতি প্রক্রিয়া তড়িঘড়ি করে সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগ উঠেছে আয়কর বিভাগের ভেতরে। এ ঘটনায় বিপুল অর্থ লেনদেন, সিন্ডিকেট গঠন এবং প্রভাব খাটানোর অভিযোগও সামনে এসেছে।
অভিযোগ রয়েছে, বিসিএস কর একাডেমির ব্যক্তিগত সহকারী মো. লোকমান হোসেনকে পদোন্নতির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য প্রক্রিয়াটি দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চলছে। এ উদ্দেশ্যে কর অঞ্চল-১০-এর সাঁট-মুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটর মো. আসাদুজ্জামান ভূঁইয়া ও সংশ্লিষ্ট একটি চক্র মিলে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে বলে দাবি করেছেন একাধিক কর্মচারী।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, কর পরিদর্শক পদে পদোন্নতির জন্য প্রায় ৩৮৫ জন কর্মচারীর কাছ থেকে প্রায় দুই কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে। একটি ম্যাসেঞ্জার গ্রুপের মাধ্যমে এসব লেনদেন ও যোগাযোগ পরিচালিত হয়েছে বলেও তারা দাবি করেন।
সূত্রের দাবি, সমন্বিত জ্যেষ্ঠতা তালিকায় ৬৫১ জন থাকলেও এবার ৩৮৫ জনকে পদোন্নতির আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে, যার ফলে দীর্ঘদিন অপেক্ষমাণ অনেক যোগ্য কর্মচারী বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এবারের প্রমোশন প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ ৩৮৫ জনকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, এই তালিকাটি মূলত একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তির সুবিধার্থেই পুনর্গঠন করা হয়েছে। বিশেষ করে চেয়ারম্যানের ভাতিজা লোকমানের সিরিয়াল নম্বর ৫০৫ হলেও তাকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার উদ্দেশ্যেই পুরো প্রক্রিয়াটি সাজানো হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, মোট ৬৫১ জন প্রমোশনের জন্য বিবেচনায় থাকলেও এর মধ্যে মাধ্যমিক পাস এবং বিভাগীয় পরীক্ষায় অকৃতকার্য একাধিক প্রার্থীও ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, তাদের অনেককে বাদ দিয়ে শুধুমাত্র নির্দিষ্ট স্বার্থে ৩৮৫ জনের একটি সীমিত তালিকা চূড়ান্ত করা হচ্ছে।
এছাড়া সমালোচকদের দাবি, পরীক্ষার নির্ধারিত তারিখ ঘোষণার আগেই তড়িঘড়ি করে সিনিয়রিটি উপেক্ষা করে প্রমোশন প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও প্রশ্ন উঠেছে।



এদিকে, এনবিআর চেয়ারম্যানের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মেয়াদ আগামী ২৮ জুন শেষ হওয়ার আগেই পদোন্নতি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে প্রশাসনিক চাপ দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে এসব বিষয়ে চেয়ারম্যান বা সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সূত্রের দাবি, সাধারণত ডিপিসির পর ফাইল আইআরডিতে পৌঁছাতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগে। তবে এ ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি দ্রুত সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্টদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয় বলে জানা গেছে। আরও অভিযোগ রয়েছে, বিষয়টি তড়িঘড়ি সম্পন্ন করার পেছনে একটি বিশেষ বিবেচনা কাজ করেছে, যাতে নির্ধারিত সময়সীমার আগেই প্রক্রিয়াটি শেষ করা যায়।
কর পরিদর্শক পদে পদোন্নতির জন্য বিভাগীয় পরীক্ষা বাধ্যতামূলক হলেও এ পরীক্ষা আয়োজন নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম ও অনিশ্চয়তার অভিযোগ রয়েছে। কর্মচারীদের দাবি, নির্দিষ্ট সময়সূচি না থাকায় যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেকে পদোন্নতির সুযোগ পাচ্ছেন না।
কর অঞ্চল-২-এর এক কর্মচারী জানান, দীর্ঘ ১৬ বছরের চাকরি জীবনে তিনি মাত্র দুইবার বিভাগীয় পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতে দেখেছেন। অপরদিকে কর অঞ্চল-৫-এর এক কর্মচারীর অভিযোগ, নিয়মিত পরীক্ষা না হওয়ায় বহু কর্মচারী পদোন্নতির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
জানা গেছে, ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর আয়কর বিভাগের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের জন্য কর পরিদর্শক পদে পদোন্নতির বিভাগীয় পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলেও সাত মাস পেরিয়ে গেলেও পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। সর্বশেষ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২৩ সালে। অকৃতকার্যরা আবেদন করেও প্রতিষ্ঠান থেকে জবাব পাননি। আবার তাদের সুযোগ না দিয়েই জ্যেষ্ঠতা লংঘন করে চলে পদোন্নতির আয়োজন।
চলতি বছরের ২ মার্চ প্রকাশিত সমন্বিত জ্যেষ্ঠতা তালিকার পর নতুন করে পদোন্নতি প্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষ আরও বেড়েছে। কর্মচারীদের আশঙ্কা, বিভাগীয় পরীক্ষার সুযোগ না থাকায় অনেকে তালিকা থেকে বাদ পড়বেন।
অন্যদিকে, কিছু প্রভাবশালী কর্মচারী বিভিন্ন কর অঞ্চলে নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গ্রুপ ব্যবহার করে প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আয়কর অনুবিভাগে দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি বঞ্চনা, গ্রুপিং ও সিন্ডিকেটের অভিযোগ চলমান রয়েছে। অনেক কর্মচারী পুরো চাকরি জীবনে মাত্র একবার পদোন্নতি পেয়েছেন, আবার কেউ কেউ অবসরে গেছেন কোনো পদোন্নতি ছাড়াই—এমন দাবিও রয়েছে।
তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে বিসিএস কর একাডেমির ব্যক্তিগত সহকারী মো. লোকমান হোসেন বলেন, এনবিআর চেয়ারম্যান আমার চাচা, একথা সত্যি। তবে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, প্রকাশ করার আগে আপনারা যাচাই করে দেখবেন।
কর অঞ্চল-১০-এর সাঁট-মুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটর মো. আসাদুজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, লোকমান হোসেন তার বন্ধু হওয়ায় অনেকে বলতে পারে আমিও চেয়ারম্যানের বন্ধু। তবে এতোসব অভিযোগের বিষয়ে আমাকে ফোন করেছেন কেন। এসব উত্তর দেওয়ার জন্য কর্মকর্তারা আছেন।
এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কেউই নাম প্রকাশ করে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তাদের ভাষ্য, অতীতে এই চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে আন্দোলন করার পর ইউনূস সরকারের সময়ে অনেকের চাকরি হারানোর ঘটনা ঘটেছে—এ কারণে তারা এখনো আতঙ্কের মধ্যে আছেন।
এদিকে এই পরিস্থিতির মধ্যেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আবদুর রহমানের বিরুদ্ধে শেষ সময়ে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত কোনো চাপের কোনো চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে না আলোচনা রয়েছে। একই সঙ্গে তার মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয়েও তিনি বিভিন্ন পর্যায়ে লবিং ও তদবির অব্যাহত রেখেছেন বলে জানা গেছে।
সর্বশেষ হালনাগাদ 15 hours আগে

