অর্থকাগজ প্রতিবেদন>
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলে যখন একটি পুরোনো জাহাজ শেষবারের মতো নোঙর ফেলে, আর সেখান থেকেই শুরু হয় অভাবনীয় এক শিল্পের। যে শিল্প দেশের অর্থনীতিতে বছরে প্রায় ২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার অবদান রাখছে, কর্মসংস্থান দিচ্ছে লাখো মানুষকে এবং জোগান দিচ্ছে দেশের ইস্পাত শিল্পের প্রধান কাঁচামাল—সেটি হলো জাহাজ পুনর্ব্যবহার বা শিপ রিসাইক্লিং শিল্প।
বিশ্ব জাহাজ পুনর্ব্যবহার শিল্পে বাংলাদেশ এখন অন্যতম প্রধান শক্তি। সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, বৈশ্বিক জাহাজ পুনর্ব্যবহার কার্যক্রমের ৪৫ শতাংশেরও বেশি এখন বাংলাদেশের দখলে। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ জাহাজের অন্যতম গন্তব্য হয়ে উঠেছে দেশের উপকূলীয় এলাকা।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, জাহাজ পুনর্ব্যবহার শিল্প শুধু পুরোনো জাহাজ ভাঙার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি জাহাজ থেকে উদ্ধার হওয়া স্টিল, যন্ত্রাংশ, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, আসবাবপত্র এবং বিভিন্ন পুনঃব্যবহারযোগ্য উপকরণ দেশের শিল্প উৎপাদন ও নির্মাণ খাতে নতুন প্রাণ সঞ্চার করে।
বিশেষ করে দেশের রি-রোলিং মিল ও নির্মাণশিল্পের বড় অংশই জাহাজ থেকে পাওয়া স্ক্র্যাপ স্টিলের ওপর নির্ভরশীল। এতে একদিকে আমদানি নির্ভরতা কমছে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে।
সীতাকুণ্ডকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই শিল্পে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। জাহাজ কাটার শ্রমিক থেকে শুরু করে পরিবহন, অক্সিজেন সরবরাহ, স্ক্র্যাপ ব্যবসা, ইস্পাত কারখানা এবং বিভিন্ন সহায়ক শিল্পের সঙ্গে যুক্ত বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা নির্ভর করছে এই খাতের ওপর।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও কম নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে পরিবেশ ও নিরাপত্তা মান নিশ্চিত করার চাপ বাড়ছে। এ কারণে দেশের অনেক জাহাজ পুনর্ব্যবহার ইয়ার্ড আধুনিকায়নের পথে হাঁটছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ জাহাজ পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যথাযথ নীতিগত সহায়তা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ নিশ্চিত করা গেলে জাহাজ পুনর্ব্যবহার শিল্প আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখতে পারবে।
তাদের ভাষ্য, তৈরি পোশাক, রেমিট্যান্স ও কৃষির বাইরে বাংলাদেশের অর্থনীতির আরেকটি নীরব শক্তি হয়ে উঠেছে এই শিল্প। সমুদ্রপাড়ের ভাঙা জাহাজ থেকে যে অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি হচ্ছে, তা দেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং অবকাঠামো উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।

