অর্থকাগজ প্রতিবেদন
দেশের তৈরি পোশাক শিল্প এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে শতাধিক কারখানার ঝাঁপ বন্ধ, ব্যাপক শ্রমিক ছাঁটাই এবং প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার মানুষের কর্মহীন হয়ে পড়া—অন্যদিকে নতুন বিনিয়োগ, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন এবং বড় শিল্পগোষ্ঠীর সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে খাতটি নতুন এক রূপান্তরের পথে হাঁটছে। সংখ্যার হিসাবে ক্ষতির পাল্লাই এখনো ভারী, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে শিল্পের কাঠামোগত পরিবর্তনের যে ইঙ্গিত মিলছে, সেটিকে ভবিষ্যতের সম্ভাবনার ভিত্তি হিসেবে দেখছেন উদ্যোক্তা ও বিশ্লেষকেরা।
গত ছয় মাসে দেশের পোশাক, টেক্সটাইল, নিটওয়্যার ও অ্যাকসেসরিজ খাত মিলিয়ে ১০০টির বেশি কারখানা বন্ধ হয়েছে। একই সময়ে অন্তত ৫০টি প্রতিষ্ঠানে কর্মী ছাঁটাই হয়েছে। শিল্প-সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এর ফলে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। বিপরীতে নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রায় ৭০টি নতুন কারখানা উৎপাদনে এসেছে বা চালুর অপেক্ষায় রয়েছে, যেখানে প্রায় ৬০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। অর্থাৎ নতুন কর্মসংস্থান বাড়লেও তা এখনো হারানো চাকরির এক-তৃতীয়াংশও পূরণ করতে পারেনি।
তবে এ সংকটকে অনেকেই কেবল শিল্পের সংকোচন হিসেবে দেখছেন না; বরং এটি একটি পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের প্রবৃদ্ধি নির্ভর ছিল স্বল্পমূল্যের বেসিক পোশাক উৎপাদনের ওপর। কিন্তু বৈশ্বিক বাজারের পরিবর্তন, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত রূপান্তর এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার কারণে এখন শিল্পটি উচ্চমূল্যের পণ্য, ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ ও মূল্য সংযোজনমূলক উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছে।
বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান মনে করেন, বাজারে নতুন প্রতিষ্ঠানের আগমন এবং অদক্ষ বা দুর্বল প্রতিষ্ঠানের বিদায় একটি স্বাভাবিক অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া। তবে তিনি স্বীকার করেন, গত দুই বছরে শ্রমিকসংখ্যা কমার যে প্রবণতা শুরু হয়েছিল, গত ছয় মাসে তা আরও তীব্র হয়েছে। তাঁর মতে, নতুন সরকারের শিল্পবান্ধব নীতি, বন্ধ কারখানা পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ, বিশেষ তহবিল এবং নগদ সহায়তা আগামী দিনে পরিস্থিতি বদলাতে পারে।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে—নতুন বিনিয়োগের ধরন। আগে যেখানে অধিকাংশ বিনিয়োগ যেত সাধারণ গার্মেন্টস অ্যাসেম্বলিতে, এখন সেখানে গুরুত্ব পাচ্ছে সুতা, কৃত্রিম তন্তু (ম্যান-মেইড ফাইবার), অ্যাকসেসরিজ, অন্তর্বাস এবং উচ্চমূল্যের টেক্সটাইল পণ্য। এতে শুধু উৎপাদন সক্ষমতাই বাড়ছে না, আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় শিল্পের সক্ষমতাও শক্তিশালী হচ্ছে।
এই রূপান্তরের নেতৃত্ব দিচ্ছে দেশের কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠী। এনভয় গ্রুপ ইতোমধ্যে সুতা ও ম্যান-মেইড ফাইবার উৎপাদনের দুটি নতুন কারখানায় বিনিয়োগ করছে। প্রতিদিন প্রায় ৪০ টন উৎপাদন সক্ষমতার এসব ইউনিটে নতুন করে প্রায় ৫০০ মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এনভয় টেক্সটাইলের কোম্পানি সেক্রেটারি এম সাইফুল ইসলাম চৌধুরীর মতে, স্থানীয় সুতা ব্যবহারে সরকারের সাম্প্রতিক নীতিগত সুবিধার কারণে দেশীয় ইয়ার্নের চাহিদা আরও বাড়বে। তাঁর ভাষায়, বিশ্ববাজারে পোশাকের চাহিদা কমার সম্ভাবনা নেই; বরং চীন ধীরে ধীরে সাধারণ পোশাক উৎপাদন থেকে প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে চলে যাওয়ায় বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর সামনে নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
একইভাবে হা-মীম গ্রুপ নরসিংদীতে একটি পুরোনো পাটকলের জায়গায় চীনা অংশীদারের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে গড়ে তুলেছে অত্যাধুনিক অ্যাকসেসরিজ কারখানা। বর্তমানে সেখানে প্রায় ২০০ কর্মী কাজ করছেন। পূর্ণ উৎপাদনে গেলে এই কারখানায় ১০ হাজারেরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলে আশা করা হচ্ছে। উদ্যোক্তাদের মতে, স্থানীয়ভাবে অ্যাকসেসরিজ উৎপাদন বাড়লে বিদেশ থেকে আমদানি কমবে, লিড টাইম কমবে এবং একই সঙ্গে রফতানি আয়ও বাড়বে।
ডিবিএল গ্রুপও অন্তর্বাস ও পোশাকের বিভিন্ন অ্যাকসেসরিজ উৎপাদনে নতুন বিনিয়োগের প্রস্তুতি নিচ্ছে। শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের বিনিয়োগ বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে শুধু শ্রমনির্ভর খাত থেকে প্রযুক্তি ও মূল্য সংযোজননির্ভর শিল্পে রূপান্তরিত করবে।
তবে বাস্তবতা হলো, নতুন কারখানা চালু হলেও শ্রমবাজারে সংকট এখনো কাটেনি।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ), বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) এবং বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে টেক্সটাইল খাতে। এ সময়ে অন্তত ৬২টি টেক্সটাইল মিল বন্ধ হয়েছে, যেখানে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। একই সময়ে ১৪টি নতুন মিল চালু হয়ে প্রায় ২৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।
বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, ২৩টি পোশাক কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়েছে এবং কার্যাদেশ কমে যাওয়ায় আরও প্রায় ৫৭টি কারখানা শ্রমিক ছাঁটাই করেছে। ফলে প্রায় ৪০ হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন। বিপরীতে নতুন ৪৪টি কারখানায় প্রায় ১৬ হাজার মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
নিটওয়্যার খাতেও একই চিত্র। বন্ধ কারখানার কারণে প্রায় ১৮ হাজার শ্রমিক বেকার হয়েছেন, যদিও নতুন বিনিয়োগে প্রায় ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। অন্যদিকে গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ ও প্যাকেজিং খাতে অন্তত ২০টি কারখানা বন্ধ হয়ে আরও দুই হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন।
এই পরিস্থিতির মধ্যেও নতুন উদ্যোক্তাদের একটি বড় অংশ ব্যাংকঋণের পরিবর্তে নিজস্ব মূলধনের ওপর নির্ভর করে শিল্পে প্রবেশ করছেন। কারণ বর্তমান উচ্চ সুদের হার নতুন বিনিয়োগের অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্টাইলোমোর লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইয়াহিয়া খান দীর্ঘদিন শিল্পে কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়ে নিজস্ব মূলধনে একটি মাঝারি আকারের কারখানা প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর মতে, ছোট পরিসরে শুরু করলেও ক্রয়াদেশ পাওয়া শুরু হয়েছে এবং ব্যাংকঋণের ঝুঁকি না নেওয়াই বর্তমানে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত।
একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ফ্যাশন ফ্লোর বিডি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জসিম উদ্দিন। তিনি বলেন, প্রায় ১৫ শতাংশ সুদে ব্যাংকঋণ নিয়ে পোশাক ব্যবসা টেকসইভাবে পরিচালনা করা প্রায় অসম্ভব। তাই ব্যক্তিগত সঞ্চয় ও পারিবারিক অর্থায়নের ওপর নির্ভর করেই তারা নতুন কারখানা গড়ে তুলেছেন।
উদ্যোক্তাদের মতে, সরকারের সাম্প্রতিক কয়েকটি নীতিগত সিদ্ধান্ত শিল্পে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। বন্ধ কারখানা পুনরায় চালু করতে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠনের ঘোষণা, স্থানীয় সুতা ব্যবহার করে রপ্তানির ক্ষেত্রে নগদ সহায়তা ১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশে উন্নীত করা এবং কয়েকটি খাতে কর-সুবিধা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়িয়েছে।
তবে উদ্যোক্তারা মনে করেন, শুধু নীতিগত ঘোষণা যথেষ্ট নয়; কার্যকর বাস্তবায়নই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। ডিবিএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ জব্বারের ভাষায়, সরকারের সদিচ্ছা স্পষ্ট হলেও এর সুফল শিল্পে পুরোপুরি দৃশ্যমান হতে সময় লাগবে। বিনিয়োগকারীরা এখন ঘোষণার পাশাপাশি বাস্তব প্রয়োগ দেখতে চান।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্প আজ একদিকে সংকোচনের, অন্যদিকে পুনর্জন্মের গল্প লিখছে। অদক্ষ, ঋণনির্ভর ও কম প্রতিযোগিতামূলক কারখানাগুলো বাজার থেকে বিদায় নিচ্ছে; একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর, উচ্চ মূল্য সংযোজনকারী এবং রপ্তানিমুখী নতুন শিল্পভিত্তি তৈরি হচ্ছে। স্বল্পমেয়াদে এই পরিবর্তনের মূল্য দিচ্ছেন হাজার হাজার শ্রমিক। কিন্তু নীতিগত সহায়তা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং বৈশ্বিক বাজারের নতুন সুযোগ কাজে লাগানো গেলে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প আরও শক্তিশালী ও টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারে। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—এই রূপান্তর যেন কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নতুন অধ্যায় রচনা করতে পারে।
সর্বশেষ হালনাগাদ 7 hours আগে

