অর্থকাগজ প্রতিবেদন
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এক অভূতপূর্ব পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। পাঁচটি সংকটাপন্ন ইসলামী ধারার ব্যাংককে একীভূত করে গঠন করা হয়েছে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’। এই সিদ্ধান্তকে কেউ দেখছেন দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্বলতার বিরুদ্ধে কঠিন পদক্ষেপ হিসেবে, আবার কেউ বলছেন— এটি কেবল সংকট ব্যবস্থাপনার প্রথম ধাপ। কারণ, নতুন নাম বা নতুন কাঠামো তৈরি করলেই একটি দুর্বল ব্যাংক শক্তিশালী হয়ে যায় না। বরং প্রকৃত পরীক্ষা শুরু হয় একীভূতকরণের পর।
ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে তিনটি বিষয়— বিপুল খেলাপি ঋণ কতটা উদ্ধার করা যায়, আমানতকারীদের আস্থা কত দ্রুত ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, জবাবদিহিমূলক ও পেশাদার ব্যবস্থাপনা কতটা নিশ্চিত করা যায়।
বাংলাদেশে পাঁচটি দুর্বল ব্যাংককে একীভূত করার সিদ্ধান্ত নজিরবিহীন হলেও বিশ্বে এটি নতুন নয়। বিভিন্ন দেশ আর্থিক সংকটের সময়ে ব্যাংক একীভূতকরণের পথ বেছে নিয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা একটি বিষয় স্পষ্ট করে— একীভূতকরণ কখনোই একক সমাধান নয়; এটি বৃহত্তর সংস্কারের একটি অংশমাত্র।
১৯৯৭ সালের এশীয় আর্থিক সংকটের পর মালয়েশিয়া ব্যাংকিং খাতকে নতুনভাবে সাজায়। দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে একীভূত করে মাত্র ১০টি শক্তিশালী ‘অ্যাঙ্কর ব্যাংক’ গড়ে তোলা হয়। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনার জন্য পৃথক অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (এএমসি) গঠন করা হয়। কঠোর তদারকি, দ্রুত ঋণ পুনরুদ্ধার এবং রাজনৈতিক প্রভাব কমিয়ে আনার মাধ্যমে দেশটি ব্যাংকিং খাতকে পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়।
সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা ছিল ভিন্ন। সেখানে সংকট মোকাবিলার জন্য নয়, বরং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠান তৈরির লক্ষ্যেই শক্তিশালী ব্যাংকগুলোর মধ্যে একীভূতকরণ করা হয়। অন্যদিকে থাইল্যান্ড আর্থিক সংকটের পর কর-সুবিধা, আইনি সুরক্ষা এবং নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে ব্যাংক পুনর্গঠনের পথ অনুসরণ করে, যেখানে সরকার ও বেসরকারি খাত যৌথভাবে ভূমিকা রাখে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের পরিস্থিতি এসব দেশের তুলনায় অনেক বেশি জটিল। কারণ, এখানে শুধু খেলাপি ঋণের বোঝা নয়; অর্থ পাচার, দুর্বল করপোরেট সুশাসন, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং দীর্ঘদিনের নিয়ন্ত্রক ব্যর্থতাও সংকটকে গভীর করেছে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসরুর রিয়াজের ভাষায়, বছরের পর বছর ঋণের নামে লুটপাট, অনিয়ম এবং দুর্বল তদারকির ফলে একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি কার্যত ভেঙে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে খেলাপি ঋণের হার ৯০ শতাংশেরও বেশি, মূলধন প্রায় নিঃশেষ এবং ব্যাংকগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতাও হারিয়ে গেছে।
তার মতে, এমন পরিস্থিতিতে শুধু একীভূতকরণই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজনে রেজল্যুশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যাংক বন্ধ করার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা উচিত। কারণ, শেষ পর্যন্ত আমানতকারীদের অর্থের দায় সরকারকেই বহন করতে হবে। নতুন আমানত সুরক্ষা ব্যবস্থায় একজন আমানতকারী সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত বীমা সুবিধা পেলেও বড় অঙ্কের আমানত পরিশোধে সরকারের ওপরই চাপ পড়বে।
তিনি আরও সতর্ক করেন, রাষ্ট্রীয় মালিকানা কোনো ব্যাংকের সফলতার নিশ্চয়তা নয়। অতীতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পরিচালনায়ও নানা দুর্বলতা দেখা গেছে। যদি নতুন ব্যাংকেও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও সুশাসনের ঘাটতি থেকে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে সরকারের আর্থিক দায় আরও বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন ব্যাংকের সামনে অন্তত চারটি বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ উদ্ধার। দেশে অবস্থানরত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া তুলনামূলক সহজ হলেও বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা সময়সাপেক্ষ এবং অত্যন্ত জটিল। ফরেনসিক অডিট, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সম্পদ জব্দের মতো কঠিন পদক্ষেপ ছাড়া এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব নয়।
দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ মূলধন জোগান। প্রাথমিকভাবে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক সহায়তা দিলেও দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকটিকে স্থিতিশীল করতে আরও বড় অঙ্কের মূলধনের প্রয়োজন হতে পারে। সেই অর্থ সরকারি কোষাগার, উন্নয়ন সহযোগী নাকি নতুন বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে আসবে— এ বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো রূপরেখা নেই।
তৃতীয় চ্যালেঞ্জ প্রযুক্তিগত সমন্বয়। পাঁচটি ব্যাংকের পৃথক কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার, গ্রাহক তথ্যভাণ্ডার, হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থা এবং শাখা নেটওয়ার্ককে একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে আনা শুধু সময়সাপেক্ষই নয়, বরং ব্যয়বহুলও।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ অবশ্য সুশাসন। অতীতের মতো যদি পরিচালনা পর্ষদে রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক প্রভাব ফিরে আসে, তাহলে পুরো পুনর্গঠন প্রক্রিয়াই ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ স্পষ্ট। তাদের প্রধান প্রত্যাশা একটি স্থিতিশীল কর্মপরিবেশ, চাকরির নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক চাপমুক্তভাবে কাজ করার সুযোগ।
ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে কাজ করতে হচ্ছে। চাকরি থাকবে কি না, এই দুশ্চিন্তাই সবচেয়ে বড় মানসিক চাপ। তার দাবি, পূর্ববর্তী মালিকপক্ষের অনিয়ম বা ঋণ জালিয়াতির দায় যেন মাঠপর্যায়ের নিরীহ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর না চাপানো হয় এবং কোনো গণছাঁটাই না করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন ব্যাংককে সফল করতে তিনটি বিষয়ে কোনো আপসের সুযোগ নেই।
প্রথমত, লুট হওয়া অর্থ অবশ্যই উদ্ধার করতে হবে। ঋণ পুনঃতফসিল বা সময় বাড়িয়ে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। যাদের বিরুদ্ধে অনিয়মের প্রমাণ মিলবে, তাদের দেশি-বিদেশি সম্পদ শনাক্ত করে আইনি প্রক্রিয়ায় জব্দ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। গ্রাহক যেন প্রয়োজনমতো নির্বিঘ্নে অর্থ তুলতে পারেন এবং পুনর্গঠনের অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য পান, তা নিশ্চিত করতে হবে। স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ গুজব ও আতঙ্ক কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তৃতীয়ত, পরিচালনা পর্ষদ ও শীর্ষ ব্যবস্থাপনায় দক্ষ, স্বাধীন ও পেশাদার ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিচালনাই দীর্ঘমেয়াদে নতুন ব্যাংকের টেকসই সাফল্যের প্রধান শর্ত।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, সমস্যার মূল আরও গভীরে। পাঁচটি ব্যাংকের একীভূতকরণ আসলে দেশের পুরো ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘদিনের দুর্বলতার প্রতিফলন। খেলাপি ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধি, করপোরেট সুশাসনের সংকট, দুর্বল ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং ঋণ অনুমোদনে অনিয়ম— এসব সমস্যা শুধু একটি ব্যাংক গঠন করে দূর করা সম্ভব নয়।
এ কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে এখন আরও বড় দায়িত্ব। ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি জোরদার, পরিচালকদের জবাবদিহি নিশ্চিত, ঋণ অনুমোদনে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং বড় ঋণগ্রহীতাদের ওপর কঠোর নজরদারির পাশাপাশি ঋণসংক্রান্ত মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তিও নিশ্চিত করতে হবে। বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকলে ব্যাংক যেমন অর্থ ফেরত পায় না, তেমনি খেলাপিরাও দায় এড়ানোর সুযোগ পেয়ে যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা ইতোমধ্যে দেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। তার মতে, ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদে অভিজ্ঞ ব্যাংকারদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং সুশাসনের ভিত্তিতে পুনর্গঠন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে। যথাযথ পরিকল্পনা ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ইসলামী ব্যাংক হিসেবে এটি ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হবে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে একসঙ্গে পাঁচটি বেসরকারি ব্যাংককে একীভূত করার ঘটনা নজিরবিহীন। তাই এই উদ্যোগ যেমন সাহসী, তেমনি ঝুঁকিপূর্ণও। এটি সফল হলে শুধু পাঁচটি ব্যাংক নয়, গোটা আর্থিক খাতের প্রতি মানুষের আস্থা পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি হবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছেও ইতিবাচক বার্তা যাবে যে, আর্থিক খাতে কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়নে বাংলাদেশ কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম।
কিন্তু ব্যর্থ হলে পরিস্থিতি হবে উল্টো। খেলাপি ঋণ উদ্ধার না হলে, তারল্য সংকট কাটিয়ে ওঠা না গেলে এবং সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব না হলে নতুন ব্যাংকও পুরোনো সমস্যার ভারে নুয়ে পড়বে। শেষ পর্যন্ত সেই বোঝা বহন করতে হবে রাষ্ট্র, করদাতা এবং সাধারণ আমানতকারীদেরই।
‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ তাই শুধু পাঁচটি ব্যাংকের নতুন নাম নয়; এটি বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সংস্কার সক্ষমতার একটি লিটমাস পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় সাফল্য নির্ভর করবে নতুন লোগো বা প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের ওপর নয়, বরং লুট হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধার, কঠোর জবাবদিহি, স্বচ্ছতা, পেশাদার ব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংকিং সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার ওপর। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে যদি এই সংস্কার বাস্তবায়ন করা যায়, তবে এটি দেশের আর্থিক খাতের জন্য একটি নতুন সূচনা হতে পারে। অন্যথায়, এটি বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে আরেকটি ব্যয়বহুল পুনর্গঠনের উদাহরণ হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
সর্বশেষ হালনাগাদ 12 hours আগে

