অর্থকাগজ প্রতিবেদন
বাংলাদেশের বাণিজ্যিক বিমান চলাচল খাত নতুন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘদিন অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে যে শিল্পের প্রবৃদ্ধি অনেকটাই আটকে ছিল, হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালুর প্রাক্কালে সেই খাতই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বহর সম্প্রসারণের পথে হাঁটছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের মধ্যে দেশের চারটি এয়ারলাইন তাদের সম্মিলিত উড়োজাহাজের সংখ্যা ৫১ থেকে বাড়িয়ে ৯১-এ উন্নীত করবে, অর্থাৎ মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে বহর বাড়বে প্রায় ৭৮ শতাংশ।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, এই সম্প্রসারণ কেবল নতুন বিমান কেনা বা লিজ নেওয়ার বিষয় নয়; বরং এটি বাংলাদেশের বিমান চলাচল শিল্পের ভবিষ্যৎ বাজার দখলের লড়াই। নতুন টার্মিনালের অতিরিক্ত সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক রুটে দেশীয় এয়ারলাইনগুলোর উপস্থিতি শক্তিশালী করাই এখন মূল লক্ষ্য।
বর্তমানে দেশের চারটি এয়ারলাইন—বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স, এয়ার অ্যাস্ট্রা এবং নভোএয়ার—মোট ৫১টি উড়োজাহাজ পরিচালনা করছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের মধ্যে লিজের মাধ্যমে আরও ৪০টি উড়োজাহাজ যুক্ত হবে। এতে বহরের আকার দাঁড়াবে ৯১টিতে, যা দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সম্প্রসারণ।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে যাত্রী পরিবহনের দ্রুত বৃদ্ধি। যে টার্মিনালটি বছরে ৮০ লাখ যাত্রীর জন্য নির্মিত হয়েছিল, সেটি ইতোমধ্যে সেই সক্ষমতার অনেক বাইরে চলে গেছে। ২০২৩ সালে শাহজালাল বিমানবন্দর ব্যবহার করেন প্রায় ১ কোটি ১৭ লাখ যাত্রী, ২০২৪ সালে তা বেড়ে হয় ১ কোটি ২৫ লাখ এবং ২০২৫ সালে পৌঁছে প্রায় ১ কোটি ২৭ লাখে। অর্থাৎ অবকাঠামো সম্প্রসারণ এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং প্রয়োজন।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে বছরে অতিরিক্ত ১ কোটি ২০ লাখ থেকে ১ কোটি ৬০ লাখ যাত্রী সেবা দেওয়া সম্ভব হবে। পাশাপাশি প্রায় ৫ লাখ টন কার্গো পরিবহনের সক্ষমতাও যুক্ত হবে। ফলে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন—উভয় ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সুযোগ কাজে লাগাতে না পারলে বাড়তি বাজারের বড় অংশ বিদেশি এয়ারলাইনগুলোর দখলেই থেকে যাবে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক রুটে পরিচালিত যাত্রীদের প্রায় ৬৫ শতাংশই বিদেশি এয়ারলাইন্স বহন করছে। দেশে ৩৮টি বিদেশি বিমান সংস্থা কার্যক্রম পরিচালনা করলেও দেশীয় এয়ারলাইনগুলোর অংশীদারিত্ব তুলনামূলকভাবে সীমিত।
এভিয়েশন বিশ্লেষক কাজী ওয়াহিদুল আলমের মতে, আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থা (আইএটিএ)-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী এক দশকে ঢাকাকেন্দ্রিক যাত্রী চলাচল প্রায় দ্বিগুণ হয়ে আড়াই কোটিতে পৌঁছাতে পারে। তাই বহর সম্প্রসারণ এখন আর কৌশলগত বিকল্প নয়; এটি ব্যবসায়িক প্রয়োজনীয়তায় পরিণত হয়েছে।
এই সম্ভাবনাকে সামনে রেখে দেশীয় অপারেটররা বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার, বোয়িং ৭৭৭, বোয়িং ৭৩৭-৮ এবং এটিআর ৭২-৬০০ টার্বোপ্রপের মতো আধুনিক উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়েছে। তাদের লক্ষ্য দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং ধীরে ধীরে ইউরোপের বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করা।
রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সও বড় ধরনের সম্প্রসারণ পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। ২০২৭ সালের মধ্যে বহর ১৯টি থেকে ২৯টিতে উন্নীত করতে ১০টি উড়োজাহাজ লিজ নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সংস্থাটি। এটি ভবিষ্যতে বোয়িংয়ের ১৪টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের বাইরে একটি পৃথক অন্তর্বর্তী পরিকল্পনা, যার উদ্দেশ্য নতুন উড়োজাহাজ হাতে পাওয়ার আগ পর্যন্ত সক্ষমতা ধরে রাখা।
এরই মধ্যে তিনটি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার ড্রাই লিজে নেওয়ার আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সরকার আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারের মতে, রাষ্ট্রীয় সংস্থার বিমান লিজের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ২২টি আন্তর্জাতিক গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। ভবিষ্যতে পূর্ব এশিয়া, ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার আরও কয়েকটি গন্তব্যে সেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
বেসরকারি খাতেও চলছে বড় প্রস্তুতি। বর্তমানে ২৫টি উড়োজাহাজ নিয়ে দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি এয়ারলাইন ইউএস-বাংলা আরও ২১টি বোয়িং ৭৩৭-৮ উড়োজাহাজ লিজে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। প্রায় ১.১১ বিলিয়ন ডলারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে এটি হবে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বেসরকারি বিমান বহর সম্প্রসারণ।
প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য শুধু ঢাকা নয়; চট্টগ্রাম ও সিলেটকেও আন্তর্জাতিক সংযোগের আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা। পরিকল্পনায় রয়েছে জেদ্দা, মদিনা, বাহরাইন, হংকং, কলম্বো, কাঠমান্ডু ও জোহর বাহরুতে নতুন ফ্লাইট চালুর পাশাপাশি আগামী কয়েক বছরে ইতালি, কানাডার টরন্টো এবং অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে সেবা সম্প্রসারণ।
অন্যদিকে এয়ার অ্যাস্ট্রা বর্তমানে চারটি এটিআর পরিচালনা করলেও ২০২৭ সালের মধ্যে বহর ১০টিতে উন্নীত করতে চায়। শুধু টার্বোপ্রপ নয়, প্রথমবারের মতো চারটি বোয়িং ৭৭৭ যুক্ত করে ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজ পরিচালনায়ও প্রবেশের পরিকল্পনা রয়েছে। নেপাল, কুয়ালালামপুর, ব্যাংকক ও সিঙ্গাপুরে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালুর প্রস্তুতিও চলছে।
এয়ার অ্যাস্ট্রার মতে, তৃতীয় টার্মিনাল চালু হওয়ার ফলে বহর সম্প্রসারণের সবচেয়ে বড় বাধা দূর হয়েছে। অতীতে পার্কিং ও টার্মিনাল সক্ষমতার সীমাবদ্ধতায় নতুন উড়োজাহাজ আনা কঠিন ছিল। এখন সেই সুযোগ তৈরি হওয়ায় দেশীয় এয়ারলাইনগুলোর সামনে নতুন বাজার ধরার বাস্তব সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে।
কয়েক বছর ধরে বহর সংকটে থাকা নভোএয়ারও নতুন করে প্রবৃদ্ধির পথে ফিরতে চায়। চলতি বছরের শেষ নাগাদ দুটি এবং পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে আরও একটি লিজের উড়োজাহাজ যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংকক, কুয়ালালামপুর, সিঙ্গাপুর, দুবাই, শারজাহ ও মাস্কটের মতো আন্তর্জাতিক গন্তব্যে ফ্লাইট চালুর জন্য বোয়িং ও এয়ারবাসের বিভিন্ন মডেল মূল্যায়ন করছে প্রতিষ্ঠানটি।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, বৈশ্বিক উড়োজাহাজ লিজদাতাদের দৃষ্টিভঙ্গিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশের কোনো উড়োজাহাজ আন্তর্জাতিকভাবে বাজেয়াপ্ত হওয়ার নজির না থাকা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি শক্তিশালী হওয়া এবং কেপটাউন কনভেনশনের কার্যকর বাস্তবায়নের ফলে আন্তর্জাতিক লিজদাতারা এখন বাংলাদেশকে তুলনামূলক নিরাপদ বাজার হিসেবে দেখছেন। এর ফলে প্রতিযোগিতামূলক শর্তে নতুন উড়োজাহাজ সংগ্রহের সুযোগও বাড়ছে।
তবে এই উচ্ছ্বাসের মধ্যেও ভবিষ্যতের বড় চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট। নতুন টার্মিনাল যাত্রীসেবা সক্ষমতা বাড়ালেও পুরো বিমানবন্দর এখনো একটি মাত্র রানওয়ের ওপর নির্ভরশীল। যাত্রী ও ফ্লাইটের সংখ্যা আগামী দশকে বর্তমানের তুলনায় বহুগুণ বাড়লে এই রানওয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। ফলে বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে শুধু নতুন টার্মিনাল নয়, দ্বিতীয় রানওয়ে কিংবা সম্পূর্ণ নতুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক এভিয়েশন শিল্প এমন এক সময়ের মুখোমুখি, যেখানে অবকাঠামো, বহর সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে এগোচ্ছে। পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশীয় এয়ারলাইনগুলো শুধু যাত্রী পরিবহনেই নয়, আঞ্চলিক বিমান চলাচলের মানচিত্রেও আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে বহর বাড়ানোর পাশাপাশি অবকাঠামো, দক্ষ জনবল, নিরাপত্তা ও সেবার মান উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সর্বশেষ হালনাগাদ 21 hours আগে

