অর্থকাগজ প্রতিবেদন
দেশের ব্যাংকিং খাতে লাগামহীনভাবে বাড়তে থাকা খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে এবার আরও কঠোর তদারকির পথে হাঁটছে বাংলাদেশ ব্যাংক। উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ব্যাংকগুলোর জন্য পৃথক কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—নির্ধারিত সময়ের মধ্যে খেলাপি ঋণ কমাতে না পারলে সংশ্লিষ্ট ঋণ অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির (এএমসি) কাছে হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুযায়ী, যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ১০ শতাংশের বেশি, তাদের জন্য বিশেষ নজরদারি কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এ তালিকায় রয়েছে শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক এবং ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার বর্তমানে ১০ থেকে ২০ শতাংশের মধ্যে রয়েছে, তাদের আগামী ছয় মাসের মধ্যে তা ১০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হলে খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনায় আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
খেলাপি ঋণ কমানোর এই কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে ১২ থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। বৈঠকে তিনি নতুন করে কোনো ঋণ যাতে খেলাপিতে পরিণত না হয়, সেটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশ দেন।
এ ছাড়া পুনঃতফসিল করা ঋণের ওপর নিবিড় নজরদারি, বড় ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে বকেয়া আদায় ত্বরান্বিত করা এবং কৃষি ও এসএমই খাতের ঋণগ্রহীতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোকে সতর্ক করা হয়েছে, টক্সিক অ্যাসেট ব্যালান্সশিটে রেখে অনাদায়ী সুদকে আয় হিসেবে দেখিয়ে কোনো ধরনের লভ্যাংশ বিতরণ করা যাবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, বারবার পুনঃতফসিল হওয়া ঋণ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর), এক্সিট সুবিধা কিংবা প্রয়োজন হলে আইনি প্রক্রিয়া ব্যবহার করতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে শ্রেণিকৃত অবস্থায় থাকা ঋণ নীতিমালা অনুযায়ী অবলোপনের উদ্যোগ নেওয়া, বিদ্যমান বিধিমালার আওতায় খেলাপি ঋণ কমানো এবং ব্যাংকগুলোর মূলধনভিত্তি শক্তিশালী করতে প্রয়োজনীয় মূলধন বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকায়, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। একই সময়ে ব্যাংক খাতের প্রভিশন ঘাটতি প্রায় ২ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা। বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বর্তমানে বাংলাদেশের খেলাপি ঋণের হার সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই কঠোর তদারকি কেবল খেলাপি ঋণ কমানোর উদ্যোগ নয়, বরং ব্যাংকিং খাতের আর্থিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
সর্বশেষ হালনাগাদ 8 hours আগে

